আমার সংগ্রাম কাহিনি। সেটাই আমার জীবনের চরম এবং পরম সার্থকতা।
বলতে ভুলে গেছি তার নাম ভাগ্য। আমার সবচেয়ে বড় যে শত্রু। মূর্খ জানে না আজই আমি একখানা চিঠি পেয়েছি। যে চিঠি পাবার পর ভাগ্যের মাথায় মুখে সজোর পদাঘাত করে বলে দেওয়া যায় জীবনের সব পরাভবকে লাথি মেরে আজ আমি জয়ী হয়েছি।
চিঠিখানা এসেছে সাহিত্য সংস্কৃতির সর্বমান্য প্রতিষ্ঠান বাংলা আকাদেমির পক্ষ থেকে। তাদের অনুষ্ঠানে আমার লেখা থেকে পাঠ করার আমন্ত্রণ জানিয়ে। অনুষ্ঠানের নাম আত্ম/আখ্যান/সময়ের সন্ধানে। গদ্যের গল্পসল্প। উপস্থিত থাকবেন পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির সভাপতি শাঁওলী মিত্র। এই সম্মানীয় মঞ্চে স্থান পাওয়ার অর্থ পশ্চিমবঙ্গের নয় কোটি জনগণের মতদানে নির্বাচিত সরকারের লেখক হিসাবে স্বীকার করা–মান্যতা দেওয়া। খুবই ছোট তবু একটা খিড়কি খুলে যাওয়া।
গেলাম নির্ধারিত দিনে সেই অনুষ্ঠানে। আমি জানতাম আমার দুপাশে দুজন পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক থাকবেন। একজন সুনন্দা শিকদার যিনি বঙ্কিম পুরস্কার পেয়েছেন, পেয়েছেন আনন্দ পুরস্কার তার “দয়াময়ীর কথা” বইয়ের জন্য, আর একজন সদানন্দ পাল–যিনি তার “এক মাটিমাখা কুমোরের আত্মকথা” বইয়ের জন্য পেয়েছেন আকাদেমি পুরস্কার। এই নিরিখে আমি নিম্নশ্রেণির লেখক–যে কোনো পুরস্কার পায়নি।
হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগের প্রধান টুটুন মুখার্জি আমার সবিশেষ পরিচিত। যিনি বলেন–মনোরঞ্জন তুমি আমার ভাই, আমি তোমার দিদি।
একদিন দিদির ফোন এল–মনোরঞ্জন, আমি কালকে কলকাতা যাচ্ছি, তুমি একটু মহাশ্বেতা দেবীর বাড়ি থেকো-ওখানেই যাবো আমি। একটু কথা আছে।
বলেন তিনি, মহাশ্বেতা দেবীকে রামারাও ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে এক লক্ষ টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে। ওরা আমাকেই ভার দিয়েছিল বাংলা থেকে লেখক বাছাই করার। তা আমি তো মহাশ্বেতা দেবী ছাড়া আর কোনো নাম খুঁজে পেলাম না।
হেসে উঠে বলি আমি–উপযুক্ত আর কাউকে পেলেন না। কেউ এমন ছিল না।
পাল্টা প্রশ্ন করেন তিনি, তুমি বলো কে ছিল?
বলি, মহাশ্বেতা দেবী সমুদ্র। ওই এক গেলাস জল তাতে ঢাললে সে জলের কোনো চিহ্ন থাকবে? যদি কোনো তৃষ্ণার্তকে দিতেন চিরকাল কৃতজ্ঞ থাকত আপনার কাছে।
একটু হেসে বলেন তিনি–তোমার কথা বুঝেছি মনোরঞ্জন। তবে কী জানো–লেখার মান যতই উন্নত হোক, ওতে পুরস্কার পাওয়া যায় না। পুরস্কার পেতে হলে আরও অনেক কিছু লাগে–সেটা তুমি বুঝবে না।
এটাই আমার পক্ষে একটা সমস্যা–”আরো অনেক কিছু নেই।” যেদিন সেটা যোগাড় হয়ে যাবে পুরস্কার হামাগুড়ি দিয়ে হেঁটে আসবে আমার কাছে। সেই অনেক কিছুর একটা হচ্ছে লিখিত বইখানি প্রকাশকের উদ্যোগে পুরস্কার কমিটির দপ্তরে পৌঁছে যাওয়া। শুনেছি বঙ্কিম পুরস্কারের দাবি পেশ করতে এগারোখানা বই দিতে হয়। এইটে প্রথম সংস্করণে তিনশো বই ছাপানো ছোট প্রকাশক পারে না। দশ জায়গায় চেষ্টা চালালে এক জায়গার মাছ বঁড়শিতে লাগে। কিন্তু দশ ঘরে বই পাঠাবার দম কোথায়!
অগত্যা মঞ্চে উঠে এক পাশে বড় কুণ্ঠা নিয়ে বসে পড়ি আমি। তাকাই সামনের দিকে–হল একেবারে কানায় কানায় পরিপূর্ণ। তবে এরা আমার লোক–আমার পাঠক। তাই বুক কাঁপে না, গলা শুকায় না। অল্প কিছু অচেনা লোক আছে বটে সে সিন্ধুতে বিন্দুর সমান।
আমার এক দাদা-চেতনা লহর পত্রিকা সম্পাদক অনন্ত আচার্য একবার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন একটা অনুষ্ঠান করবেন। আকাদেমি হল ভাড়া করে। পাঠকের মুখোমুখি মনোরঞ্জন ব্যাপারী। নানা কারণে সেটা হতে পারেনি। সেদিন তিনি যখন বললেন–বাংলা আকাদেমির নিজস্ব কোননা অনুষ্ঠানে তেমন একটা লোক হয় না। হলের তিন ভাগ ফাঁকা পড়ে থাকে। তখন তাকে বলি আমি, আপনারা তো ওই হলে আমাকে নিয়ে অনুষ্ঠান করতে চেয়েছিলেন। সেটা এবার করে দিন। মঞ্চটা ওদের, ব্যবহার করে নিন আপনারা।
কথাটা মনে ধরে তার। আর তার ফলে ফেসবুকে একটা প্রচার চালায়, মোবাইলে মেসেজ পাঠায় জনে জনে এবং যেসব গণসংগঠনের সঙ্গে অনন্তদার চেনাজানা–সবাইকে জানিয়ে দেয় সংবাদ আমাদের মনোরঞ্জন বাংলা আকাদেমির মঞ্চে ছাব্বিশে জুন। ওই মঞ্চে যেসব বক্তা বসেন-তাদের জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা শোনবার জন্য খুব স্বাভাবিক নিয়মে শ্রোতাও হয় ধোপদুরস্ত শিক্ষিত জনেরা। কিন্তু এইবার নোনাডাঙা বস্তি থেকে এসেছিল একদল ময়লা পোষাক হাওয়াই চটি পরা সেই সব মানুষ, যাদের কেউ রিকশা চালায়, কেউ জনমজুর খাটে কেউ রাজমিস্ত্রির কাজ করে। যেসব মানুষের জীবন সংগ্রাম হাসি কান্না প্রেম প্রতিবাদ নিয়ে আমার সাহিত্যকর্ম। সব যেন বইয়ের পাতা থেকে নেমে হেঁটে হেঁটে পৌঁছে গিয়েছিল শিল্প সাহিত্যের পীঠস্থানে।
যাদবপুর কফি হাউস–যে হাউসের সামনে একদা আমি রিকশা চালাতাম। সেই কফি হাউসে এখন যারা বসেন তার মধ্যে আজ আছেন একদল আমার পাঠক। যেসব পাঠক পাওয়া যে কোনো লেখকের গর্বের বিষয়। কারণ তারা সেইসব ব্যক্তিত্ব–যাদের লেখা পড়বার জন্য কথা শোনবার জন্য হাজার লোক হাঁ করে থাকে।
আমি সাধারণত বুদ্ধিজীবী সংস্পর্শ এড়িয়ে চলি। এদের সামনে এলে নিজের খর্বতা বড় বেশি অনুভূত হয়। আমি কত কম জানি–জেনে কষ্ট পাই। আগে কলেজ স্ট্রিট কফি হাউসে এক একদিন যেতাম। তখন চারদিক থেকে ঘিরে ধরত বিদ্যার জাহাজরা-প্রশ্নের পর প্রশ্নের বাণে বিদ্ধ করত। হবসম পড়েছ? দেরিদার নাম শুনেছো? নোয়াম চমস্কির কথা জানো? এ্যাঃ বাবা ফুঁকো পড়নি? নিজের অজ্ঞতা আড়াল করতে বর্জন করেছিলাম কফি হাউসের ব্ল্যাক কফি আর বিদ্বান সংস্রব।
