আমার আগে দুজন বক্তা ছিলেন শেষ বক্তা আমি।বলার বিষয় আমার জীবন এবং সাহিত্য। বক্তৃতা শেষ করার পর অমলেন্দুবাবু আমার হাতে ধরিয়ে দিলেন একটা খাম। বললেন–আপনার সাহিত্য সাধনায় আমাদের ছোট্ট একটা সহযোগ থাকল। ইতিবৃত্তে চণ্ডাল জীবনের দ্বিতীয় খণ্ড যাতে সত্বর প্রকাশ হয়। কত ছোট সহযোগ? কুড়ি হাজার। টাকার খামটা ছুঁয়ে চোখে জল এসে গেল আমার। লিখে টাকা পাই না, এখন লেখবার জন্য টাকা। টাকা নয়–এটা একটা তাগাদা আমার উপর চাপ সৃষ্টি করা। এরা আমার পাঠক–প্রথম খণ্ড পড়ে মন ভরেনি তাই জানতে চায় আরও কী আছে জীবন চণ্ডালের জীবনের পরতে পরতে। লেখাতে চায় তাই দ্বিতীয় খণ্ড। লেখ লেখ–আর তোমার বই ছাপাবার ভাবনা ভাবতে হবে না। সে দায় আমাদের। এই নাও আগাম–বলো বই কবে দেবে। একটা খামে এত ভালোবাসা ভরা থাকে আগে জানতাম না।
এই অনুষ্ঠানে পরিচয় হল হিমাংশু বিশ্বাস নামে একজন দরদী মানুষের সাথে।ইনি ব্যবসায়ী মানুষ। পয়সা কড়ি খুব একটা কম নেই। তিনি আমাকে খান কয়েক বই দিলেন, যার একখানা, তারক সরকার লিখিত হরি লীলামৃত। বইটা দিয়ে বলেন তিনি, হরিচাঁদ ঠাকুরের জীবন কাহিনি এতে যেমন লেখা আছে তা ভাববাদ আশ্রিত একটা অবাস্তব কল্পনা বিলাস। যদি সম্ভব হয় এটা পড়ে একটা উপন্যাস লিখুন। যাতে হরিচাঁদকে মানুষ বলে চেনা যায়। দলিত মানুষের মধ্যে যিনি কাজ করেছেন তাদের সঠিক দিশায় চালিত করবেন বলে।
পরিচয় হলো সুরেশ বিশ্বাস নামে একজন সমাজদরদীর সাথে। তারও ইচ্ছা তাই। আর সেই আবেদন আমাকে বাধ্য করেছে ‘মতুয়া এক মুক্তি সেনা’ উপন্যাসটি লিখতে। যেটি বর্ধমান থেকে প্রকাশিত হাটেবাজারে পত্রিকা-র ১৪২০ শারদ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে। তারপরে পুস্তকাকারে প্রকাশ হয়েছে ২০১৪ বইমেলায়। প্রকাশক কলকাতা প্রকাশন। সেটি খুব একটা খারাপ লিখিনি বলে আমার বিশ্বাস। কিছু পাঠক ফোন করে জানিয়েছে–ভালো লেগেছে।
এরপর ইচ্ছা আছে অনুরূপ একটা উপন্যাস হরিচাঁদ পুত্র গুরুচাঁদ ঠাকুরকে নিয়ে লেখার।
***
সমসাময়িক পত্রিকাটির আবির্ভাব ২০১২ সালে। আত্মপ্রকাশের প্রায় সাথে সাথে সায়নদেব বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় এটি পাঠক মহলে একটি বিশিষ্ট স্থান গ্রহণ করেছে বিষয়বস্তু নির্বাচন এবং উপস্থাপনার নিজস্ব শৈলির কারণে। এই পত্রিকা আমার কাছে যে কারণে আরও বেশি বৈশিষ্ট্যতার দাবিদার–সেটা হচ্ছে এরা আমার লেখার যে একটা বাজারমূল্য আছে সেইটের স্বীকৃতি দিয়েছে। আমার পাঁচ পাতা একটা লেখার জন্য পারিশ্রমিক ধার্য করেছে এক হাজার টাকা। প্রতিক্ষণ দিয়েছিল দেড়শো, মনোরমা সাড়ে চারশো এরা হাজার। দাম একটু বেড়েছে আমার।
সমসাময়িক পত্রিকার পক্ষ থেকে ২০১২ বইমেলায় আমাকে একটা সংবর্ধনাও দেয় শাল ফুলের তোড়া মিষ্টির প্যাকেট দিয়ে। বলতে গেলে কলকাতা বইমেলা আর আমার লেখক জীবনের বয়স প্রায় সমান। কলকাতার বাইরে যে কবছর ছিলাম সে ক বছর বাদে প্রতি বছরই মেলায় যাই। সে শুধু পরিচিত লেখক বন্ধুদের সাথে বাৎসরিক সাক্ষাৎকারের জন্য। বই কেনবার ইচ্ছা থাকলেও সামর্থ ছিল না।
তবে এবার কিছু বই কিনতে পেরেছি। মহাশ্বেতা দেবীর রচনা সমগ্রের পুরো সেট ছয় হাজারে, হাজার দুয়েক টাকার অন্য বই। এত টাকা পাগলের মতো খরচ করায় পরে অবশ্য সংসার চালাতে কিছু অসুবিধা হয়েছিল, মুদিখানায় ধার বৃদ্ধি পেয়েছিল। এমনটা যে হবে তা তখন তো বুঝিনি। সে সময় তো আমি হাওয়ায় ভাসছি। এই প্রথম কলকাতা বইমেলায় সম্মাননা পরিচিতি পেলাম। সে কি কম আনন্দজনক ব্যাপার। কতবার মনে ভেবেছি সবাই পায়–আমি কবে পাবো মেলার নেক নজর। ছোট হোক তবু পেলাম তো! সেটা ঘটল এই সমসাময়িক পত্রিকার সৌজন্যে।
বায়োর পরে এল দুহাজার তের। শিক্ষিত লোকেরা বলে আনলাকি থার্টিন। তবে এই আনলাকি বছর এল আমার জীবনে সৌভাগ্যের প্রতীক হয়ে। এই বছরের মাঝামাঝি জুন মাসের ছাব্বিশ তারিখটা লিখিত হল স্বর্ণাক্ষরে–মাইল ফলক হিসাবে, জীবনের যাত্রাপথের পাশে।
***
একজনের সঙ্গে বহুদিন পরে দেখা। গলায় গরম ভাপ তুলে বিকৃত স্বরে জিজ্ঞেস করে সে-কীরে! কেমন আছিস?
বুক টান-মাথা উঁচু করে স্বগর্বে বলি ভালো আছি। তার চোখে কুঞ্চন মুখে বিরক্তি–ভালো আছিস! কী করে ভালো আছিস রে! আমি তো তোর ভালো থাকার পথে হাজার কাঁটা বিছিয়ে দিয়েছি। পেট ভরে খেতে দিইনি, অপমান অত্যাচারে জর্জর করেছি জীবন। তবু বলছিস ভালো আছিস।
বলি, শুধু ভালো নয়–খুব ভালো আছি। যে জীবনকে তুমি অক্ষম অথর্ব পঙ্গু করে দিতে চেয়েছিল আমি তাকে সফল আর সার্থক বানিয়ে দিয়েছি। আমার দুর্বলতাকে আমি বানিয়েছি আমার অস্ত্র।
মুখে তাচ্ছিল্য এনে বলে সে তার মানে তুই বলতে চাইছিস আমি তোর কাছে পরাজিত? পরাজিত-পদদলিত-হেরে ভূত।
বলে সে শ্লেষের হাসি হেসে, তুই বোকা তাই জানিস না আমাকে কেউ হারাতে পারবে না, শেষ পর্যন্ত আমারই জয় হয়।
বলি আমি–তুমি বোকা তাই জানো না শেষ পর্যন্ত জয় আমারই হবে। আমার জয়গান গাইবে সবাই। তোমাকে চিহ্নিত করবে খলনায়ক হিসাবে। মহাভারতের বীর বালক অভিমন্যু সপ্তরথী ঘিরে তাকে মেরে ফেলেছে। কিন্তু হারাতে পারেনি। তুমি বড় জোর আমার বিনাশ করে দিতে পারো, হারিয়ে দিতে পারবে না। বহু বহু বছর মানুষের গল্প গাথায় স্মৃতিকথায় উঠে আসবে
