বারো বছর কেটে গেল। বারো বছর পরে দূরভাষে প্রথম পেলাম এক স্বজনের আন্তরিক গলার স্বর। ফোন এসেছে উত্তর ২৪ পরগণার বগুলা থেকে হরিগুরুচাঁদ আম্বেদকর চেতনা মঞ্চের পক্ষ থেকে। ফোন আসতে রইল বগুলা বিরাটি হৃদয়পুর বহু জায়গা থেকে। আমন্ত্রণ আসা আরম্ভ হল নানা অনুষ্ঠানে অতিথি হবার। মালা-মানপত্র-সাম্মানিক দিয়ে দুহাত ভরে দিল প্রিয়জনেরা। এইসব প্রাপ্তি ইতিবৃত্তে চাল জীবনের জন্য একখানা বই–একখানা বইয়ের কারণে বাংলার পাঠক–আর নমঃশূদ্র মানুষের বুকের ভিতর স্থান হয়ে গেল আমার।
এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা–বর্ধমান বইমেলার অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ। যে মঞ্চের সঞ্চালক বড় আবেগঘন গলায় বার বার ঘোষণা করেছিল আমাদের সৌভাগ্য আমরা এক মঞ্চে গুরু এবং শিষ্যকে পেয়েছি এক সাথে। হ্যাঁ, ওই অনুষ্ঠানে মহাশ্বেতা দেবী প্রধান অতিথি ছিলেন, উনি জানতেন না আমিও এক অতিথি। বিশিষ্ট অতিথি। পাশাপাশি বসেছিলাম দুজন। একটু অস্বস্তিও লাগছিল। আমি যেন হিমালয়ের পাশে এক উই টিপি। তবে সেটা আমার জীবনেতিহাসে একটা স্মরণীয় ঘটনা তো বটে। একটা বৃত্ত সম্পূর্ণ হয়েছিল। মহাশ্বেতা দেবীর জীবনী যে লিখবে এই দিনের কথা না লিখে কি পারবে।
এরই কয়েক দিন পরে একটা আমন্ত্রণ এল বজবজের মাঝের হাট থেকে। অমলেন্দু সমাদ্দার নামে এক ভদ্রলোক ফোনেই আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। আমার এটাই বাজে স্বভাব যে ডাকে চলে যাই। সেই যে বলে না পাগলা ভাত খাবি?হাত ধোব কীসে? আমার সেই দশা। কেউ তো কোনোদিন আদর করে কাছে ডাকেনি। সবাই দূর দূর করেছে। তাই এখন কেউ ডাকলেই পড়ি মরি করে ছুটে যাই। আগপাছ না ভেবে।
এক বিরক্ত বন্ধু বিকৃত গলায় বলেছিল–যে ডাকে অমনি চলে যাও, কেন? তুমি কি কুকুর নাকি! কুকুরেরাই অমন ‘আতু’ করলে দৌড়ে যায়–।
বলেছিলাম–হ্যাঁ, আমি কুকুর। আমি আমার দরিদ্র দলিত ও সর্বহারা শ্রমজীবী মানুষের পাহারাদার। যদি কেউ সেই শ্রেণীর ক্ষতি করতে চেষ্টা করে, আমি তার দিকে ঘেউ ঘেউ করে তেড়ে যাব। তেমন মনে করলে কামড়ে গলার নলিও ছিঁড়ে দিতে পারি।
.
একদিন একটা ফোন এল দুর্গানগরের এক ডাক্তারের যার মোবাইল নম্বর ৯১৮৬২১০০১৫২২ বলল–রায়পুরের বিধায়িকা ‘মায়াবতীর বোন’ কলকাতায় আসছে। আপনি আসুন। আমাদের লোকজন থাকবে। পরিচয় করিয়ে দেব। আর কিছু বই নিয়ে আসবেন বেচে দেব।
কোথায় যাব?
এয়ারপোর্টে আসুন। সাড়ে বারোটায় মায়াবতীর বোন’ প্লেন থেকে নামবে। ওখান থেকে আপনাকে গাড়ি করে নিয়ে যাব।
একদিন কাজ কামাই করে দশখানা বই ব্যাগে ভরে পৌঁছে গেলাম এয়ারপোর্টে। সাড়ে বারোটায় নয়, মায়াবতীর বোন এল পরের ফ্লাইটে বেলা দুটোয়। উদ্যোক্তারা তোক এসেছে জনা কুড়ি। এখন ফেরার সময় গাড়ি মাত্র দুটো। যে গাড়িতে মায়াবতীর বোন চাপল হুড়োহুড়ি করে জন আটেক উঠে পড়ল সেই গাড়িতে। বাকি সব কজন পরের গাড়িতে। আমার কোনো বসার জায়গা নেই। আমি কীভাবে যাব সেদিকে কেউ দেখছে না। যে ফোন করে নিয়ে গেছে সে তো সবার আগে গিয়ে মায়াবতীর বোনের পাশের সিট দখল করেছে। সেখান থেকে ফোন করে একজনকে বলে–লেখককে তুলে নিস।
তুলবে তো তুলবে কোথায়। বলে সে আপনে আমার কোলে বসেন। তাই করি কোলেই বসি। সে এক কঠিন পরিস্থিতি, মাথা সোজা হচ্ছে না। ছাদে ঠেকে যাচ্ছে। বসতে হল বেঁকে আধশোয়া অবস্থায়। এইভাবে ঘন্টাখানেক চলে পৌঁছলাম বিরাটি। যে গাড়িতে মায়াবতীর বোন সেটা গিয়ে থামল এক তিনতলা বাড়ির সামনে। সেখানে তিনি ভোজন করবেন, একটু বিশ্রাম নেবেন। তারপর আসবেন আর এক তিনতলা বাড়িতে যেখানে মিটিং হবে।
আমাদের গাড়ি এসে থামল সোজা মিটিং স্থলের সামনে। নামলাম গাড়ি থেকে, উঠলাম তিনতলায়, কাঁধে সেই বইয়ের ব্যাগ। এখানে কেউ আমাকে চেনে না। যে চেনে সে মায়াবতীর বোনের সাথে। সকালে টিফিন করে বের হয়েছি এখন খিদেয় পেট চিনচিন করছে। ভাত তো বহুদূর জল এক গেলাসও কেউ দিল না।
চারটে নাগাদ মায়াবতীর বোন এল। এসেই শুরু করে দিল বক্তৃতা। আমাকে যে নিয়ে গেছে বক্তৃতায় এমন মশগুল হয়ে গেছে আমার কথা তার মনে নেই।
ঘন্টা দেড়েক বক্তৃতা দিয়ে থামল সে। মিটিং শেষ। আর আমি কী করব এখানে বসে। নেমে এলাম নিচে। হাঁটা দিলাম রেল স্টেশনের দিকে। একটা ফোনে সারাটা দিনের রোজগার গেল উপবাস গেল একফেঁটা তৃষ্ণার জলও মিলল না। এই যে মানুষ এরাই দলিত সমাজের হিত করতে কোমর বেঁধে নেমে পড়েছে, সেই বিশ্বাসে অটল থাকা খুব কঠিন। তবে ওই যে–দুর্জনের কারণে যদি দুয়ার এঁটে দিই যদি কোনো সুজন আসে-প্রবেশ করবে কোন্ পথে? তাই মনের দরজা বন্ধ করতে পারি না।
তাই অমলেন্দু সমাদ্দারের ফোন পেয়ে আনন্দে উদবেল হয়ে না উঠতে পারলেও না বলতে পারি না। পরে জেনেছি উনি রাজার হাটের বিডিও। আমাকে ওনার গাড়িতে বাইপাশ থেকে তুলে নিয়ে গেলেন সেই অনুষ্ঠানে।
গিয়ে দেখি একবাড়ির ছাদে চট কাপড় ঘিরে বানানো হয়েছে অনুষ্ঠান মঞ্চ। কী অনুষ্ঠান? সাহিত্যিক মনোরঞ্জন ব্যাপারীর সম্মাননা। সে বড় নিষ্প্রভ অনুষ্ঠান। কোনো চাকচিক্য আলোর ঝিকিমিকি নেই। নেই মাইক, ক্যামেরার ক্লিক ক্লিক। খান পঞ্চাশেক চেয়ারের অর্ধেক দখল করে বসে আছে কিছু বালক বালিকা আর তাদের মায়েরা। পুরুষ আছেন দশ বারোজন, সব বয়স্ক। অবসরপ্রাপ্ত।
