মুই বিড়ি খাইনা। বলে জীবন।
অবাক হয় রাজা। এ কী করে সম্ভব! স্টেশনবাসি এই বয়সের সব ছেলেরাই মদ, গাঁজা কত কী নেশা করে। আর এই ছেলেটা নিরীহ বিড়িতেই বিমুখ? এত নিরামিষভাবে স্টেশনে টিকে আছে কেমন করে!
তাহলে তুই কি খাস? কীসের নেশা তোর!
আমি ভাত খাই। আমার একটাই নেশা। ভাত। ভাত ছাড়া আর কোনো নেশা নাই।
একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে রাজা–আগে আমারও ওই নেশা ছিল। একমুঠো ভাত সারা দিনে একবার না হলে চলতো না। এখন আর সে নেশা নেই। পেলে খাই না পেলেও কোন দুঃখ করি না। দুঃখ করেই বা কি করবো। না খেয়ে আছি বলে কেউ তো আর ভাতের থালা সামনে এগিয়ে দেবে না।
জীবনকে প্রশ্ন করে রাজা–আচ্ছা কতদিন তুই কিছু না খেয়ে থাকতে পারিস?
একদিনও পারি না। বলে জীবন–না খাইয়া থাকলে হাত পা কাপে, চক্ষু ঘোলা হইয়া যায়। কথা কান দিয়া বাইরায়।
বলে রাজা, না খেয়ে থাকা কোন ব্যাপারই না, শিখলে সব পারা যায়। বেঞ্চির পিছন দিকে শরীর হেলিয়ে দিয়ে পায়ের উপর পা তুলে রাজকীয় ভঙ্গিতে বসে ফের বলে সে–বলতো উট কতদিন জল না খেয়ে থাকতে পারে? এক মাস। মরুভূমি কত গরম জানিস? সেখানে এক মাস জল না খেয়ে থাকা কি সোজা কথা! কেউ পারবে?
মাথা নাড়ে জীবন–পারবে না।
আচ্ছা বলতো সাপ কতদিন না খেয়ে থাকতে পারে?
জানি না।
পাক্কা তিনমাস। শীত পড়া শুরু করলে একবার খেয়ে সেই যে গর্তে ঢোকে পুরো শীতকাল আর বের হয় না, কিছু খায়ও না। তাহলে বল ওরা যদি এসব পারে মানুষ কেন পারবে না।
ফের বলে রাজা—আমার এক মামা আছে তারে আমি কোনদিন ভাত রুটি কিছু খেতে দেখিনি। রোজ সকালে একমগ লাল চা দুটো নেড়ো বিস্কুট, বিকালেও তাই। কিন্তু কোনদিন কোন বিয়ে বাড়ি, যদি খাবার টাবার বেঁচে যায় আর মামাকে ডেকে নিয়ে যায় তখন দেখা যায় খাওয়া কাকে বলে। সেই মামার কাছে থেকে আমি না খেয়ে থাকার কায়দা জেনে নিয়েছি।
কী কায়দা?
একদম খিদের কথা মনে না করা। চেষ্টা করে দেখ, তুইও পারবি। সব সময় মনে করবি–এইমাত্র খেয়ে উঠেছি, পেট ভরা আছে। দেখবি মোটেই খিদে লাগবে না।
মানুষকে পাণ্ডিত্যপূর্ণ কথা বলার জন্য পণ্ডিত হতে হবে এ নিয়ম সর্বদা খাটে না। কখনো কোন মূর্খ নির্বোধ নিরক্ষর মানুষের মুখ থেকে বের হয়ে যেতে পারে এমন কোন শব্দ যা সর্বকালের পণ্ডিতদেরও জ্ঞানের অতীত। সেই কবে কত সহস্র বছর আগে একজন মানুষ যে সূর্য পৃথিবীর চেয়ে বড় না ছোট, সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে, না পৃথিবী, তা জানত না। জানত না গাছ থেকে আপেল মাটিতে কেন পড়ে, আকাশে কেন উড়ে যায় না। সেই আকাশের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলেছিলো ওখানে ঈশ্বর থাকেন। তারই কথা হাজার হাজার পণ্ডিত হাজার হাজার বছর বিনা প্রশ্নে মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে।
রাজা নামের ছেলেটা জানে না সে আজ নিজের অজান্তে অষ্টম মার্গের শেষ এবং পরম মার্গের শেষ কথা বলে ফেলেছে। বহু সাধক মুনিতপস্বী যার নাম দিয়েছে নিবৃত্তিমার্গ। এই মার্গের পথিকের বিষয় সম্পদ ভোগ বিলাস কোন কিছুতে আসক্তি থাকে না। তারা বলে গেছেন–আসক্তি অর্থাৎ কামনা বাসনাই হচ্ছে সর্বপ্রকার দুঃখের মূল কারণ। মন থেকে যদি আসক্তিকে উৎপাটন করে ফেলে তাকে জড় নির্জীব নির্বিকার করে দেওয়া যায় সেটাই হবে মোক্ষ। এই মোক্ষ প্রাপ্তি ঘটে গেলে তখন আর জীবের ক্ষুধা, তৃষ্ণা, আনন্দ বেদনা প্রেম বিরহ কোন কিছুই অবশেষ থাকে না। সব কিছুর অবসান ঘটে যায় এবং বন্ধন দশা থেকে চিরমুক্তি পায় জীব। তখন আর তার সৎ আর শঠে পুরুষ আর নারীতে পায়েস আর পান্তায় কোন প্রভেদ থাকে না। তখন সেই মুক্ত পুরুষ নেংটি পরে খালি পেটে গাছতলায় শুয়ে মিলিয়ন ডলারের মালিকের চেয়ে নিজেকে বড় ভাবতে পারে।
হাজার বছর ধরে হাজার মহাপুরুষ মানব সমাজকে সেই মোক্ষের পথে নিয়ে যাবার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছে। কোরাণ পুরাণ বেদ বাইবেল, মঠ মন্দির মসজিদ গির্জার সমবেত প্রচেষ্টায় আংশিক সফলতা এসে গেছে।কিছুমানুষকেবোঝানো গেছে। বাকি মানুষটাকে বোঝাতে পারলেই ধরণীর ধূলিতে আকাশের স্বর্গ নেমে আসবে। দ্বেষ কলুষতা হিংসা ঈর্ষামুক্ত হয়ে মানুষ মহাসুখে বসবাস করবে।
অনেকক্ষণ পরে বলে জীবন, একটা কথা কমু? তোমাগো লগে তোমরা আমারে আসাম নিয়ে যাবা?
তুই যাবি আমার সাথে!
নিয়া গেলে যাইতাম।
নিয়া যাবো কিরে, তুই কি বাচ্চা নাকি যে কোলে করে নেবো। তুই যাবি তোর পায়ে হেঁটে। তুই যদি যাস আমি আর বন্ধুর জন্য দেরি করব না। তাহলে আজই রওনা দিই কি বল?
একটু বিমর্ষ হয়ে বলে জীবন–আমার কাছেও তো টাকা পয়সা নেই।
যাবো তো ট্রেনে, বিনা টিকিটে। টাকা কি হবে?
ভাড়া না লাগুক কিন্তু পথে খাওয়া দাওয়া–
খাওয়া দাওয়ার নামে খেপে ওঠে রাজা। এই হচ্ছে তোদের দোষ। এই জন্য তোদের কোন উন্নতি হবে না। এখানে দিব্যি দিনের পর দিন না খেয়ে শুয়ে বসে কাটিয়ে দিচ্ছিস, তখন খিদের নাম মুখে আসে না। যেই এক জায়গায় যাবার কথা হল অমনি খাই খাই জুড়ে দিলি। আচ্ছা ঠিক আছে, কথা দিলাম পথে তোকে একবার গরম ভাত খাইয়ে তবেই আসাম নিয়ে যাবো। এবার আর আপত্তি নেই তো?
মানে। আমতা আমতা করে বলে জীবন—তোমার কাছে তো কইলা টাকা নাই, তয় কেমুন কইরা খাওয়াইবা। ভাত খাইতে তো টাকা লাগে।
