তবে সোজা লম্বালম্বি ভাবে নমোদের যদি দুটো ভাগ করা হয় তবে এক ভাগ মতুয়া আর এক ভাগ মতুয়া নয়। মতুয়াদের আড়াআড়ি দুভাগ করলে এক ভাগ ঠাকুরনগরপন্থী আর একভাগ বিরোধী। একদল বলে যা করবে ঠাকুর নগরের ঠাকুরেরা তাতেই আমাদের মঙ্গল হবে। আর একদল বলে–কী করেছ আমাদের জন্য ঠাকুর নগরের ঠাকুর। সব তো নিজেদের সেবায়।
আমি নমো কিন্তু মতুয়া নই। গুরুর কাছে দীক্ষা নিইনি। আমার যা রোজগার ছেলে মেয়েকে ভালোমতো রাখতে পারিনা গুরু পুষবো কী করে। একটা গুরু পোষা তত কম খরচ না, হাতি পোষার সমান। আজ টাকা দাও গুরু তীর্থে যাবে, কাল টাকা দাও মহোৎসব হবে। এত খরচা পোষাবে না।
এমনিতে আমি নিজেকে নমো না বলে–শুধু মানুষ বলতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু আমি বললে কী হবে ওরা তো আমাকে মানুষ ভেবে মানবিকতা দেখাবে না। সেই যে একটা গল্পে আছে-এক মাঠে এক স্কুলের চারটে বাচ্চা ঘোড়া ঘোড়া খেলে। একজন বামুন একজন বদ্যি একজন কায়েত একজন শূদ্র। ওদের খেলা যে দেখে সেই বলে বাহঃ কী সুন্দর মিলমিশ। কোনো ছুয়াছুত ছোটজাত উঁচু জাত নেই। সে সব যে আছে জানে শূদ্র ছেলেটা। কারণ প্রতিবার তাকেই ঘোড়া হতে হয়। বইতে হয় তিনজনকে পিঠে করে। কোনোদিন সওয়ার হতে পারে না। কেউ তাকে পিঠে তোলে না।
ওরা এই রকম। মুখে সাম্যবাদ সমাজতন্ত্র–জাতপাত বিরোধী কত কিছু বলবে। শুধু স্বীকার করবে না শূদ্রকে সমকক্ষ বলে। মিলবে মিশবে সে ওইঘোড়া গাধা বানাবার জন্য। এর সব চেয়ে বড় উদাহরণ আমি। এই বর্ণবাদী সমাজ আমাকে দিয়ে আজও বাসন মাজায় তরকারি কাটায় রান্না করায়। আর একই কর্মস্থলে একই চতুর্থ শ্রেণির উচ্চবর্ণ কর্মী? বলার কী দরকার ইচ্ছে হলে দেখে যাক যে কেউ। কী আরামের চাকরি তাদের।
এই কারণে আমি নিজেকে নমো বলে পরিচয় করাব। বলতে দ্বিধা নেই এই জাতের একদল মানুষকে আমি ঘৃণা করি ব্রাহ্মণদের চেয়ে বেশি। আমার প্রতিবেশী যে আমাকে ঠকিয়ে নিতে পারে অনিষ্টকারী হতে পারে, পারে অকৃতজ্ঞ হতে। তাবলে আমার ভাই হবে?যদিহয়, প্রতিবেশীকে পরে দেখব আগে দেখে নেব নিজের ভাইকে। তার জন্য কোনো দয়া ক্ষমা নেই।
গুরুচাঁদ ঠাকুর ভেবেছিলেন স্বজাতির মানুষকে শিক্ষিত করে তুলতে হবে। আম্বেদকর ভেবেছিলেন–নিম্নবর্ণ মানুষকে চাকরি পাইয়ে দিতে হবে। দুজনের আশা ছিল–এইসব শিক্ষিত সচ্ছল মানুষরা দরদীর ভূমিকা নেবে। সমাজটাকে টেনে উপরে তুলবে। তাদের দয়ার দানে পরিপুষ্ট হয়ে কিছু লোক তো একেবারে তাদের নাম সমাজের কথা ভুলে গেছে। সে এখন ব্রাহ্মণ্যবাদীদের অনুকরণে আরও অর্থ আরও প্রতিপত্তির পিছনে পাগলের মতো ছুটছে।
যে দল মনে রেখেছে তারা মাঝে মাঝে গুরুচাঁদ ঠাকুরের অবদানের কথা বলে, আম্বেদকরের জন্মদিবস মৃত্যুদিবস পালন করে। গল্প কবিতা লেখে। তীব্র ভাষায় সভা সেমিনারে মনুসংহিতার ব্রাহ্মণ্যবাদের মুণ্ডপাত করে। সব করে এরা। করে না, যেটা করা তীব্র জরুরি। নন্দীগ্রাম নেতাই নোনাডাঙা তো বহুদূর–বাড়ির পাশের বিপন্ন জাতভাইয়ের জন্য হাতটা বাড়িয়ে দেয় না। বাবাসাহেব যে বলেছিলেন পে ব্যাক টু সোসাইটি। সেটা আর মনে নেই।
আমি একটা লড়াই লড়ছি। লড়াই দলিত-দরিদ্র মানুষের জন্য। লড়ছি পুঁজিবাদ ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে, সমতা আর সম্মানের পক্ষে। বহু কষ্টে একটা ধাপ অতিক্রম করেছি। আমি ভেবেছিলাম ২০০০ সালে খাস খবর হবার পরে–আমাদের সমাজে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার রাজনেতা ব্যবসায়ী প্রভাবশালী এসব তো কম নেই, কত জনের নাম পত্রিকায় পড়ি। টিভিতে দেখি–এবার নিশ্চয় আমার দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে। একটু টেনে তুলবে। কিন্তু আশা অপূর্ণ রয়ে গেছে। কেউ আসেনি।
এরপর থেকে তো বিরামহীন পত্র-পত্রিকায় আমার কথা লিখে গেছে। টিভিতে কতবার যে আমাকে দেখিয়েছে। উচ্চবর্ণ সমাজ থেকে বহু সংবেদনশীল মানুষ এসে পাশে দাঁড়িয়েছে, আসেনি শুধু নমঃশূদ্রদের কেউ। অন্য কেউ না আসুক যারা লেখে তারা তো আসতে পারত।
আসবে না। বলেছিল রিকশাচালক-নাট্যকার রাজু দাস। ওরা তোমাকে ভয় পায়। ওদের কেউ শিক্ষক কেউ অধ্যাপক কেউ বড় অফিসার। তাদের লেখা কেউ ছাপে না, তুমি লিখতে পারলে পড়ে থাকে না। ওরা সেই ভয়ে কাতর। পাছে ছাড়িয়ে চলে যাও। উচ্চবর্ণের সে ভয় নেই। তারা বসে আছে একশো ধাপ উপরে। তারা জানে তুমি সারা জীবনের চেষ্টায় ওই উচ্চতা ছুঁতে পারবে না। তাই হাত ধরে টানছে। যদি পাঁচ ধাপ যেতে পারো ওদের কী ক্ষতি। ওদের আসন তো সুরক্ষিত। আর আমাদের বিদ্বানরা সব পড়ে আছে সিঁড়ির শেষ ধাপে। উপরে ওঠার জন্য যে ধৈৰ্য্য নিষ্ঠা অধ্যাবসায় দরকার তা নেই। চাকরিতে সংরক্ষণ আছে, ঘুষ চলে। যত সহজে সেটা মেলে সাহিত্য খ্যাতি মেলে না। সেটা ওরা বোঝে না। যদি বুঝত ভাবত আমি ভালো চাকরি করি, ভালো বাড়িতে থাকি, ভালো খাই ভালো পরি–পেটে বিদ্যা আছে তবু ভালো কেন লিখতে পারি না। এটা বৈশ্য ব্যবস্থা চলছে। ব্যবসায়ীরা যদি মদ বেচে লাভ পায় মদ বেচে। যদি দুধ বেচে লাভ পায় দুধ বেচে। যদি তুমি তেমন লিখতে পারো যা পাঠক পয়সা দিয়ে কিনে পড়বে-প্রকাশকের অভাব হবে না। সে চেষ্টা না করে দিনরাত ভয়ে কাঁপছে। এই বুঝি অমুক আমাকে ছাড়িয়ে চলে গেল। যে যাবার সে যাবেই। কেউ সাহায্য করুক আর না করুক।
