এইসব কারণে আমাকে হিন্দুস্থান টাইমস প্রথম পাতায় ছবি দিয়ে সংবাদ প্রকাশিত করে। করে প্রভাত খবর পত্রিকায় সাংবাদিক প্রভাতরঞ্জন।
.
আমরা যা করার ছিল, করা হয়ে গেছে। অনুষ্ঠান এখনও চলবে। আমি থাকতে পারি না থাকলেও ক্ষতি নেই। ফিরব কাল বেলা বারোটায়। কথা ছিল একবার প্লেন একবার ট্রেনের। এক উদ্যোক্তা গদগদ হয়ে বলে গেল, এক নেহি, দোবার আপকো হাওয়াই সফর করা দেঙ্গে। প্লেনমেই আপ বাপস যায়েঙ্গে।
হাতে আমার বেশ খানিকটা অবসর। চাইলে নিজের কাজে খরচ করতে বাধা নেই। তখনই টের পাই বুকের বাঁদিকে চিনচিনে ব্যথা। ব্যথাটা বহু পুরানো কিছুতে সারছে না। আমার কাছে কিছু ওষুধ আছে। সে ওষুধ কোনো কাজে আসবে না। কী যে করি। ব্যথাটা ক্রমে বাড়ছে।
নিরুপায় হয়ে ছুটে যাই আমার জন্য বরাদ্দ গাড়ির ড্রাইভারের কাছে। বলি, তুমি তো গাড়ি নিয়ে চারদিকে ঘোরো। জানলেও জানতে পারো। এখানে বুড়োনাথতলাটা কোথায়?
মাথা নাড়িয়ে বলে সে, পুরো ঠিকানাটা কী?
বর্ণালী বসাক, বসাক কুটীর, বুড়োনাথতলা রোড, পাটনা, বিহার এই তো চিঠিতে লেখা থাকত বলে মনে আছে। আর কিছু তো জানা নেই।
বলে সে–আমি তো জানি না এই ঠিকানা কোথায়!
কে জানতে পারে বলো তো?
পোস্টাপিসে খোঁজ নিলে তারা বলতে পারবে।
খোঁজ নিয়ে আমাকে সেখানে একবার নিয়ে যাবে?
ওখানে কে থাকে আপনার?
কে থাকে আমার। সত্যি তো কে থাকে আমার। ব্যথার ওষুধ থাকে?বুঝতে পারি না কিছুই। বুঝতে পারি না মনের মধ্যে কিসের অনুসন্ধান।
বলি–কেউ থাকে না।
তবে কেন যাবেন!
কেন যাবো? বলি–এমনি।
এমনি এমনি নিয়ে যেতে ড্রাইভার উৎসাহ পায়নি। আমারও আর যাওয়া হয়নি–উপশমের ঠিকানায়। ব্যথাটা আছে থাক।
***
আমি দলিত সমাজের মানুষ এই কথা বললে আমার পরিচয় সম্পূর্ণ হবে না। দলিতদের মধ্যেও বহু ভাগ-বিভাগ। শুনি, সেই সংখ্যাটা নাকি প্রায় ছয় হাজার। সেই যে বিভেদ করে শাসন করো, এইনীতিটা ইংরেজ আসার বহু পূর্ব থেকে এদেশে বিদ্যমান। তবে ইংরেজরা একে সার্থকভাবে প্রয়োগ করেছে এই কারণে দোষের দায়ভার তাদের ঘাড়ে চাপানো হয়। এই চতুবর্ণ প্রথা তো তারা সাথে করে নিয়ে আসেনি। এই প্রথা তো এদেশীয় ব্রাহ্মণ বুদ্ধিমানদের অবদান।
সে যাইহোক, আমি সেই ছয় হাজার ভাগের এক ভাগ নমঃ জাতির সন্তান। নমোদের মধ্যেও দু-ভাগ। একভাগ মাছ ধরে বিক্রি করে। আর এক ভাগ খায়। যারা খায় আর যারা বিক্রি করে দুদলের মধ্যে কোনো বৈবাহিক সম্বন্ধ হয় না। যেমন হয় না কাওরাদের সাথে বাগদির, বাগদির সাথে পৌ ক্ষত্রিয়ের।
এরপর আছে কিছু গুরু গোঁসাই, তারা আবার এই বিভাজনের মধ্যে কিছু ছোট ছোট নিজস্ব বিভাজন বানিয়ে ফেলেছে। আমার জ্যাঠতুতো এক ভাই কেশব ব্যাপারী। সে অনুকূল ঠাকুরের শিষ্য হয়ে জাতে উঠে গেছে। গুরু তার গলায় পৈতে ঝুলিয়ে দিয়েছে। বামুন তো হয়নি তবে নমঃ আর নেই। সে এখন আর আমাদের রান্না খায় না।
নিম্নবর্ণের কিছু মানুষের মধ্যে পৈতে পাবার কী হাস্যকর প্রয়াস। আমার যেখানে বাড়ি সেটা গত বারো চৌদ্দ বছরে গড়ে ওঠা একটা গরিব জনবসতি অঞ্চল। এখানে মজুর খাটতে প্রতি বছর সুন্দরবনের দিক থেকে লোক আসে। গ্রীষ্ম-শীত এখানে থাকে বর্ষায় ফিরে যায়। এক শীতকালে ভোর বেলায় হুম হাম শব্দে ঘুম ভেঙে গেলে বাইরে বেরিয়ে দেখি লরি করে নিয়ে এসে ফেলে যাওয়া মাটি বইছে ঝুড়িতে তুলে পাঁচ ছয় জন মজুর। সূর্য তখন সবে উঁকি দিচ্ছে, বাতাসে কনকনে ঠান্ডা। সেই ঠান্ডায় সবার উধ্বাঙ্গ উদোম। আর একটু লক্ষ্য করে দেখি সবার গলায় ধবধবে পৈতে। মাটি বওয়া লোকের জামা গেঞ্জি যেমন মেটে রঙের হয় তেমন নয়–একেবারে চকচকে। যেন কালো মেয়ের মুখে শ্বেতীর দাগের মতো পৈতে বিদ্রুপের হাসি হাসছে। দেখে মনে হয় এই পৈতে কাঁধে উঠেছে সদ্য সদ্য। পৈতেধারীর দেহের উপর মানানসই হয়ে সেঁটে বসার সময় পায়নি।
প্রথমে তো আমি চমকাই, ধাঁধায় পড়ে যাই। এতগুলো বামুন মাটি বইছে! তবে তো ওদের শ্রম বিমুখ পরস্ব অপহরণকারী এসব অপবাদ ঘুচে গেল। এখন থেকে তো শ্রমজীবী শ্ৰমপুত্র এইসব অভিধায় অভিহিত হবে।
পাশে একটা চায়ের দোকান। সবে উনুনে জল বসিয়েছে। সেখানে গিয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকি লোকগুলোকে। কালো কালো দুর্ভিক্ষপীড়িত চেহারা। তবে পৈতে বিষয়ে ব্যাপক সচেতন, ওটা যেন সাত রাজার ধন। আমার তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ধরা পড়ে ওরা মাত্র গলার পৈতেটা দেখনদারি করে রাখার কারণে এই শীতে অঙ্গটি উদোম করে রেখেছে। ওইসুতো ক’গাছার দৌলতে বোঝাতে করুণ প্রয়াস করছে আমরা এক ধাপ উপরের জীব।
কাছে যাই তাদের, কথা বলি। তখনই জানতে পারি এটি এক গুরুর। তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করলেই মিলে যাচ্ছে মন্ত্রপুত ব্রহ্মসূত’! শুনে আমি হাসব না কাঁদব বুঝতে পারি না। সেই আমি প্রথম জানাম–ব্রহ্মসূত মানে পৈতা।
কথায় কথায় আমি অন্য প্রসঙ্গে চলে গেছি। কথা হচ্ছিল নমো নিয়ে। এমনিতে তো সিপিএম কংগ্রেস তৃণমূল বিজেপি এসব ভাগ আছে, যে দলের এখানে একটা পঞ্চায়েত সিটও দখলে নেই সেই বিএসপি দলেও কিছু লোক যুক্ত। আছে মায়াবতী বিরোধী বি.এস.পিও। তারা আম্বেদকর কাশীরামের নামে জয় দেয়। সহ্য করতে পারে না মায়াবতীর পাঁচ কোটির গলার মালা–ব্রাহ্মণ তোষণ।
