বলি তাদের, দশ-বারোটা উপন্যাস প্রায় একশো গল্প-র একটাও আমার কষ্ট কল্পিত আখ্যান নয়। সব আমারই জীবন গাথা। সব কাহিনির মধ্যে খণ্ড খণ্ড হয়ে ছড়িয়ে আছে আমারই বিড়ম্বিত জীবন। ওই যে ছেঁড়া বস্তা কাঁধে পথে পথে খাদ্য খুঁজছে যে ছেলেটা ওই যে ডাষ্টবিন ঘেঁটে আলিবাবার গুপ্ত গুহার দ্বার খুঁজছে যে ছেলেটা, যাকে লাইট পোস্টে পিছমোড়া বেঁধে পেটানো হচ্ছে চোর বলে–কারণ সে পাউরুটি চুরি করে ধরা পড়েছে, ওই যে লোকটা হোটেলে খেয়ে পয়সা না দিয়ে পালাচ্ছে আর জনতা ডাকাত ডাকাত বলে তার পিছনে ধাওয়া করছে, কোটা পূরণ করার জন্য, ওই যে লোকটাকে পুলিশ ওয়াগন ব্রেকার বলে জেলে চালান করছে–সব আমি। এসবই আমার বহুধা বিভক্ত-সত্ত্বা। এরাই আমার কাহিনীর চরিত্র।
উদ্যোক্তারা সংকেত পাঠাচ্ছে বজরঙ বার বার ঘড়ি দেখছে। সময় হুহু করে বেরিয়ে যাচ্ছে। কথা ছিল এক ঘন্টার–এক ঘন্টা কুড়ি মিনিট হয়ে গেছে। অনুষ্ঠান শেষ করা যাচ্ছে না। যেই আমি। একটু থেমেছি সেই ফাঁকে ছুটে এল একগাদা প্রশ্ন–আপনি কী করে লেখক হলেন? দলিত সাহিত্য বলতে কী বোঝায়? বাংলায় দলিত আন্দোলন নেই কেন? আগামীর পরিকল্পনা কি? বর্তমানে কি করেন? সংসার কি ভাবে চলে? প্রেম করে ছিলেন কিনা? কত যে প্রশ্ন! প্রশ্নের তোড়ে যেন ভেসে যাব।
এসব প্রশ্নের উত্তর আমার বইয়ে লেখা আছে। সংক্ষেপে কিছু জবাব দিই। এখন বলে বজরঙ বিহারি-আপ লোগোকো উবলা দেখকে সমঝ আতা কী, সওয়াল জবাব সে জি নেহি ভরা। লেকিন হাম মজবুর হ্যায় ইস করিক্রম সমাপ্ত করনেকে লিয়ে।সিড়ল টাইম–পাছে আউরভি কারিক্রম হ্যায়। উনকা লিয়ে মঞ্চ খালি করনা হোগা। আগর আপলোগ বাত করনা চাহতে হ্যায় তো মনোরঞ্জন ব্যাপারী কো লেকে বাহার জাইয়ে। বহা ভি বইঠনে কে লিয়ে সারি প্রবন্ধ হ্যায়।
মঞ্চ থেকে নেমে বাইরে আসি। আমার পিছনে আসে জন-জোয়ার। অটোগ্রাফ-রিপোর্টারদের প্রশ্নের জবাব ক্যামেরার সামনে পোজ দেওয়া। আর আমি অখ্যাত, অবজ্ঞাত নই–হয়ে গেছি সারা দেশের দলিত-দরিদ্র-মুক মানুষের মুখর কণ্ঠ। বিহার বিজয় হয়ে গেছে আমার।
সেদিনের বিষয় নিয়ে লিখতে গিয়ে আপনা বিহার পত্রিকার প্রতিবেদক নবল কিশোর লিখেছে–”মনোরঞ্জন ব্যাপারীনে কার্যক্রম ‘অন্য কা লেখন’ কী সার্থক বনা দিয়া”। শুরুটা করেছিলেন এইভাবে–দোস্তো, পটনা লিটেরচর ফেস্টিবল ব্যক্তিগত স্তরে আমার কাছে এর কোনো মহত্ব ছিল না। কেন? কেন? এত বড় একটা ফেস্টিভ্যালের তার কাছে গুরুত্বহীন হবার কারণ?
কারণ সে এক দলিত। বিহারে সবর্ণরা কুয়ো থেকে জল তুলে খেলে যে সব দলিতদের হাতে রড পুড়িয়ে ছ্যাকা দেয়। হতে পারে এটা সরকারি অনুষ্ঠান, কিন্তু কর্তৃত্ব তো দুবে চৌবে মিশ্র তিওয়ারিদের। তারা বেছে বেছে সবর্ণ সমাজের লেখক কবি নাট্যকার চিত্র পরিচালকদের আমন্ত্রণ জানিয়েছে। শুধু নিরপেক্ষ ভাবমূর্তি তুলে ধরতে দু-চার পিস মুসলমান আর এক গাছা দলিত। একা সে কী করবে? তার কণ্ঠ ঢাকা পড়ে যাবে উচ্চবর্ণ–উচ্চনিনাদে। তাই তার কাছে এই অনুষ্ঠান একটা ঢকোসলা মাত্র। সদিচ্ছাবর্জিত নোটাক্কি।
অনুষ্ঠানে অনিচ্ছাকৃত অংশ গ্রহণের শেষে তার অনুভবের বাখান–”সবর্ণ কী ভীড় মে এক মেট ময়লা কৃর্তা-পাজামা পহনে ব্যক্তি নে ব্রাহ্মণ্যবাদী আউর পুঁজিবাদী ব্যবস্থা কী চুল্লে হিলা দি থী।”
সত্যই তাই। সেদিন ভীষণ আক্রামক আর দুঃসাহসী হয়ে উঠেছিলাম আমি। প্রতিপক্ষ শিবির লক্ষ্য করে তাদের প্রাসাদের দিকে দাগা গোলার মতো শব্দ দেগেছিলাম আমি। একজন প্রশ্ন করেছিল কেন লেখেন? আমার গলা কাঁপেনি–বলেছিলাম খুন করতে পারি না বলে লিখি। যদি খুন করার মতো শরীরে শক্তি থাকত, আর লিখতাম না। খুন করতাম।
ইচ্ছে করেই খুন বলেছি খতম বলিনি। অবশ্য দৈনিক জাগরণ সেটা লিখেছে মন হোতা হ্যায় কল কর। খুন খতম কতল বধ হত্যা হনন–মেরে ফেলা, সবগুলোই এক তবে তার নানা অর্থ। সেইক্ষণে আমার কথার কে কী মানে বুঝেছিল কে জানে নিশ্চুপ হয়ে গিয়েছিল সভাগৃহ। সে যে কী নীরবতা–যেন পিন পড়লে শব্দ শোনা যাবে।
বলি আমি–যারা ধর্মের নামে মায়ের পেট চিরে বাচ্চা বের করে মারে আমার তাদের খুন করতে ইচ্ছা করে। দুপুরের তীব্র রোদ্দুরে একজন মানুষ যাচ্ছিল পথে, সহ্য করতে পারেনি তৃষ্ণা। পথের পাশে কুঁয়ো ছিল একটু জল তুলে খেয়েছে। জাতের নামে যারা তার হাতে শিক পুড়িয়ে ছ্যাকা দেয়, আমার খুন করতে ইচ্ছা করে। ঘরে তিন চার পাঁচ বছরের শিশু কন্যা রেখে মা গেছে কাজে। ঘরের ভাঙা বেড়ার ফোকর গলে যে এসে সেই শিশুকে ধর্ষণ করে মেরে ফেলে, এক গরিব চাষি–সামান্য মাত্র জমিতে যার সংসার প্রতিপালন যে তাকে মেরে ধরে উচ্ছেদ করে শিল্পায়নের অজুহাতে জমিটা গ্রাস করে, এক সরল সোজা আদিবাসী–যার এই সভ্য সমাজের কাছে কোনো দাবি নেই সে শুধু বলে হে সভ্যতা আমাকে আমার সমাজ সংস্কৃতি নিয়ে আমার মতো বাঁচতে দাও। এই জল জমি জঙ্গল আমার। আমি এ দেশের মূল নিবাসী। এখান থেকে তোমার আগ্রাসী থাবা সরিয়ে নাও। সেই অপরাধে যারা তার ঘর পোড়ায়, বউ মেয়ের ইজ্জত নেয় হত্যা করে-সেই ঘাতকদের আমার খুন করতে হাত নিশপিশ করে।
পারি না তো! শরীরে আর সে শক্তি নেই। তাই লিখি। আমি একদল নির্মম খুনি তৈরি করতে চাই। আমি চাই, যারা আমার লেখা পড়বে তাদের মনে যেন হনন অভিপ্রায় জন্ম নেয়। আমি যা পারিনি তারা যেন তাই করে।
