আমার আগে এক বক্তা সুপ্রসিদ্ধ লেখক অসগর বজাহত। আজ নিয়ে তিনদিন উনি মঞ্চে বসলেন। প্রতিদিনই ওনার কিছু না কিছু প্রোগ্রাম রেখেছে সঞ্চালন সমিতি। যা যা বলার সম্ভবত গত দুদিনে বলে দিয়েছেন তাই আজ বেশি সময় নিলেন না। মিনিট পাঁচেকে সেরে দিলেন শেষ কথা বলে–দলিতদের শুধু আত্মজীবনী লিখলে চলবে না, গল্প উপন্যাস কবিতা–সব লিখতে হবে।
এইবার আমার পালা। নিয়ম অনুসারে সঞ্চালক আমাকে প্রশ্ন করলেন বা সূত্র ধরিয়ে দিলেন একটা, কোন খাতে তিনি আলোচনাকে প্রবাহিত করতে চান। আমি কি সেই বান্দা যে ওনার গয়ে গাইব। আমি সবদিন যা করেছি নিজের গতি পথ নিজে বানিয়ে নিয়েছি, আজও তাই করার উদ্দেশ্যে তার কথা কানের এক ছিদ্র দিয়ে ঢুকিয়ে আর এক ছিদ্র দিয়ে বের করে দিই। মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে বিহার সরকার দৈনিক জাগরণ পত্রিকা, উপস্থিত জনতা সবাইকে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে শুরু করি আমার নিজস্ব ঘরানার আলাপ।
সুধী সজ্জন, বজরঙজিকা সওয়ালকা জবাব হাম কুছ বাদমে দেঙ্গে। পহেলে আপলোগ সে কুছ বাত করেঙ্গে। ফির এক লেখ পড়েঙ্গে। ফির বজরঙজি আউর আপ সবকা সওয়ালকা জবাব দেঙ্গে।
হিন্দি মোটামুটি খুব একটা খারাপ বলি না। বলে চলি সেই ভাষায়। আমি যা বলতে চাই বলার জন্য একটা ছোট্ট গল্প দিয়ে শুরু করব। গল্পটা হচ্ছে একবার সংসদে কোনো একটা বিষয় নিয়ে জোরদার কোনো বিতর্ক চলছে। তখন এক সাংসদের কোনো একটা মন্তব্যে অধ্যক্ষ মহোদয় কিছু বিরক্ত হয়েছেন, অপমান বোধ করেছেন। তখন তিনি সাংসদকে বলেন–আপনি নিশ্চয় জানেন, আমি কে? জবাব দেয় সাংসদ–জানি তত আপনি কে। তাহলে এটাও জানেন বোধহয় যে আপনার সাথে আমার কী পার্থক্য? বলে সাংসদ সেটাও জানি। তাহলে বলুন তো কী সেই পার্থক্য! হেসে জবাব দেয় সাংসদ, পার্থক্য একটাই–ব্যাস মাত্র একটাই পার্থক্য, আপনি ওখানে বসে আছেন আর আমি এখানে বসে আছি।
শ্রোতার আসনে উপবিষ্ট সুধী সজ্জন, আপনাদের সঙ্গেও আমার এইটুকু মাত্র তফাৎ–আপনারা ওখানে বসে আছেন, আমি এখানে বসে আছি। আমি জানি-যারা ওখানে বসে আছেন যে কেউ মঞ্চে উঠে আমার চেয়ারে বসে পড়ার মতো যোগ্যতা রাখেন। শিল্প সাহিত্য বিষয়ে তিনি আমার চেয়ে অনেক ভালো জানেন–বলতে পারেন।
তবে একটা তফাৎ আছে আপনার সাথে আমার। সেটা হচ্ছে ওই চেয়ার থেকে এই মঞ্চে আসতে আপনার সময় লাগবে মাত্র কয়েক মিনিট। আর আমার সময় লেগে গেল–তেত্রিশ বছর। যাদবপুর রেল স্টেশনে গামছা বিছিয়ে ইট মাথায় দিয়ে শূন্য পেটে শুয়ে থাকতাম। সেই অবস্থায় ১৯৮১ সালে বর্তিকা পত্রিকার মাধ্যমে যাত্রা শুরু করেছিলাম–এই সম্মানীয় মঞ্চের দিকে। আজ এসে পৌঁছেছি।
তালি তালি তালি তালি। বুঝতে পারলাম না এ তালি কীসের জন্য। শ্রোতার সামনে বসে থাকা বিদগ্ধ-বিদ্বৎ সমাজ তবে কী স্বীকার করে নিল আমাকে। ঘায়েল হয়ে পড়ল আমার শব্দ-শরে! সেই কবে যেন শুনেছিলাম যেটা যার দুর্বলতা সেটাই তার অস্ত্র। আমার কর্মস্থলে তিন ফুট এক মাংসপিন্ড বিশেষ কর্মচারি আছে। সে যাকে তাকে যখন তখন যাতা বলে গাল দেয়, মেরে বসে। সে অক্ষম দুর্বল প্রতিবন্ধী। সেটাই তার সাহসের উৎস। কেউ তাকে কিছু করতে পারবে না। তাহলে জন-ভাবাবেগ আইন সব তার পিছনে দাঁড়িয়ে পড়বে।
আমার শক্তির উৎস–আমার থেতলানো জীবন। পড়ে আছি একদম নিচের সিঁড়িতে। আর নিচে কে নামাবে! হারাবার কিছু নেই তাই আমি নির্ভয়। বলি তাদের –ওপার বাংলা থেকে আসা দলিত-দরিদ্র-সরকারি সহায়তা বঞ্চিত এক রিফিউজি পরিবারের সন্তান আমি। বাল্যকাল কেটেছে গরু ছাগল চরিয়ে। একটু বড় হয়ে চা দোকানের টেবিল বয়। আর একটু বড় হয়ে মুটে মজুর রিকশা চালক ডোম সুইপার ট্রাকের খালাসি নাইট গার্ড আরও কত কিছু পেশা–খিদের জ্বালায় পেটের মধ্যে নাড়িভুঁড়িগুলো পোড়া অজগরের মত মোচড় মারা যন্ত্রণা থেকে নিষ্কৃতি পেতে চুরি ছিনতাইও করেছিদুচারবার। জীবন আমাকেইসকুলে যাবার সুযোগ দেয়নি, নিয়ে গেছে জেলখানার কালো কুঠুরিতে। সেই জেলখানার মাটিতে কাঠির আঁচড়ে শিখেছি বাংলা বর্ণমালা। তারপর ঘটনাচক্রে লেখক হয়েছি। দশ বারোখানা উপন্যাস শ’খানেক গল্প বিশ পঁচিশখানা প্রবন্ধ গোটা পাঁচ সাত কবিতা প্রকাশিত হয়েছে এ পর্যন্ত। তবে সবচেয়ে খ্যাতি পেয়েছি আমার আত্মজীবনী-ইতিবৃত্তে চণ্ডাল জীবন প্রকাশিত হবার পরে। সাহিত্য এতে কতটা আছে জানি না–তবে সত্য আছে। বড় নির্মম নিষ্ঠুর কদাকার সত্য।
তালি তালি–আবার তালি।
শুনেছি মণিরাজ নামে কোনো গাছ আছে, যার শেকড় সামনে নিয়ে গেলে ফণীরাজ নত হয়ে পড়ে। তেমন হয় কিনা আমি জানি না। তবে এখন আমি জনগণেশকে বশ করে ফেলেছি। কালীয় নাগের মাথায় মৃত্যরত বালক কৃষ্ণের মতো নাচছি। নাচাচ্ছি।
কী যেন একটা সিনেমা দেখেছিলাম।এক কংফু কিং একটা বিষধর শঙ্খচুড়কে চোখের চাউনিতে মাথার নড়াচড়ায় বাধ্য করেছিল তারই ইচ্ছানুরূপ সাপকেও মাথা নাড়াতে বেঁকে যেতে।
আমি সেই কুংফু কিং হয়ে গেছি। আমার বক্তব্য আমি শ্রোতাদের শুনতে বাধ্য করছি। এরা ততোক্ষণ শুনবে–যতক্ষণ আমি বলব। শুনছে আমার ইচ্ছায়-ভাবছে ইচ্ছাটা তার। চালাকিটা বুঝতে পারছে না আমার। মাঝে মাঝে কথা থামিয়ে শ্রোতাদের জিজ্ঞাসা করছি আমার কথা শুনে বিরক্ত হচ্ছেন না তো? আপনাদের দেরি হয়ে যাচ্ছে না তো? বলুন তাহলে থেমে যাই। শ্রোতারা সমস্বরে গর্জায়–নেহি নেহি। আপ বোলিয়ে।
