শহর শেষ হলে শুরু হল সেই আদিগন্ত গ্রামীণ ভারত। সব সবুজ আর সবুজ। যার মাঝে মাঝে না চিনতে পারা কোনো লম্বা নদী, নদী আর পাহাড় শ্রেণির নীচে যে সমতল–সব চৌকা মাপের। যেমন ভাবে বালকেরা দাড়িয়াবান্ধা খেলার খোপ কাটে অনেকটা সেই রকম। ওই এক একটা খোপ বুঝি এক একটা জেলার সীমানা!
সেই কবে কতকাল আগে যাযাবরের বই দৃষ্টিপাত-এ পড়েছিলাম বিমান দিয়েছে বেগ, কেড়ে নিয়েছে আবেগ, সেদিন সে কথার মর্ম বুঝিনি–আজ বুঝলাম। প্লেনে উঠলাম সময় লাগল এক ঘন্টা কুড়ি মিনিট–হুঁস করে চলে এলাম কলকাতা থেকে পাটনা। এতে সেই ভালো লাগা কোথায়? যেমন ট্রেন বা বাস যাত্রায় থাকে। এটাই হচ্ছে মাটি ছুঁয়ে থাকার মজা–স্বাদ-আনন্দ। এক এক স্টেশনে দীর্ঘ দৌড় শেষ করে ট্রেন এসে থামে। চা-অলা ফল্লি অলা সবার সমবেত কোরাসে যেন আবহ সঙ্গীতের সুরধ্বনি শোনা যায়। যেন সেই স্বর সুর শব্দে প্রাণ ফিরে পায় রাত গভীরে-মৃত কোন নগরী প্রাণে প্রবাহিত হয় নব, নবতম জীবনী শক্তি। কত বড় এই দেশ, কত রকমের ভাষা–পোষাক পরিচ্ছদ সমাজ সংস্কৃতি, ট্রেন বাসের যাত্রায় অল্প হলেও সব কিছু ছুঁয়ে যাওয়া যায়। প্লেনে সে আনন্দ পাওয়া যাবে না।
অবশেষে এসে নামলাম পাটনার হাওয়াই আড্ডায়। সময় লেগেছে মাত্র এক ঘন্টা কুড়ি মিনিট। আমার বাড়ি থেকে যাদবপুর স্টেশনে যেতে এর চেয়ে সময় বেশি বই কম লাগে না। আমার সামনে চলমান যাত্রীদের মিছিল। তাদের পিছু পিছু হেঁটে আমিও বাইরে বের হয়ে আসি। দেখি একটা টেবিল পেতে তার উপর ফুলের তোড়া জলের বোতল নিয়ে বসে আছে একজন লোক। তার হাতে একটা প্ল্যাকার্ড মনোরঞ্জন ব্যাপারী ওয়েলকাম। তার সামনে যেতেই সে আমার হাতে একটা ফুলের তোড়া জলের বোতল ধরিয়ে দেয়। অন্য একজন পথ দেখায়, আইয়ে–গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে একখানা গাড়ি। সেটার দরজা খুলে বলে যাইয়ে। সে গিয়ে বসে ড্রাইভারের পাশে। আমি এক কেউকেটা লোক, আমার পাশে বসার মতো যোগ্যতা তার কোথায়!
গাড়ির দরজা খোলার সময় চোখে মুখে যে ঠাণ্ডা বাতাস লেগেছিল তাতেই বুঝেছিলাম–যা তা গাড়ি নয়। এখন ভিতরে ঢুকে সারা শরীর শীতল হয়ে গেল। এসি চলছে। পাটনা শহরের আজ চল্লিশ-বেয়াল্লিশ ডিগ্রি তাপমান এই গাড়ির মধ্যে ঢুকতে পারছে না।
যারা এই রকম গাড়িতে চড়ে এই রকম শীতল বাড়িতে থাকে তাদের কী যায় আসে বিশ্বের তাপ বাড়ছে না কমছে সেই হিসেব দিয়ে। তারা অক্লেশে হাজার মাইল অরণ্য ধ্বংস করে দিতে পারে নিজস্ব প্রয়োজনে।
গাড়ি মিনিট কুড়ি পরে পৌঁছাল অতিথিশালার দরজায়। এখানেও আমার জন্য প্রস্তুত আছে সাদর অভ্যর্থনা। এখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে বিহার সরকারের কয়েকজন পদস্থ অফিসার। যাদের চেহারা পোষাক, চলন বলন সব কিছুতে শিক্ষা এবং সচ্ছলতার সাথে পদমর্যাদার প্রভাব বেশ স্পষ্ট। বাড়িটা ক’তলা গুনে দেখেনি তবে আমাকে রাখা হল দশতলার সুসজ্জিত সর্ব সুবিধাযুক্ত একটা রুমে। আমি গেছি ২২ মার্চ ২০১৩। সেই দিনই বজরঙ বিহারি এসে গেলেন দিল্লি থেকে। আমার পাশের কামরায় রইলেন তিনি।
এখানে আমার পরিচিত আর কেউ নেই। এই একজন মাত্র। খানিকক্ষণ বিশ্রাম করে মুখ হাত ধুয়ে চা ফা খেয়ে আমরা গেলাম স্থানীয় তারামণ্ডল সভাগৃহে–যেখানে বিহার সরকারের কলা এবং সাংস্কৃতিক বিভাগ নিবরস’ এবং দৈনিক জাগরণ পত্রিকার যৌথ প্রয়াসে শুরু হয়েছে। সাহিত্য মহোৎসব। পাটনা লিটরেচার ফেস্টিভ্যাল। তারামণ্ডলের বিশাল হল এখন পরিপূর্ণ সারা ভারত থেকে আগত তারকা সমাবেশে। আছেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমারও। এই বিদ্বজ্জনের মাঝে আমারও একটা পরিচয় আছে-দৈনিক জাগরণ লিখেছিল–”শ্রমশীল সংস্কৃতিকে লিয়ে ভারত কা নির্মাণ করনেবালো কা প্রতিনিধি মনোরঞ্জন ব্যাপারী।”
আজ ঠিক মনে নেই, কোথায় যেন পড়েছিলাম কোনো এক কবিতার একটা লাইন-”যদি জ্বল জ্বল করো, লোক হাসাতে সভায় যেও না।” ২২ আর ২৩শে মার্চ দুদিন আমি ছিলাম নিষ্প্রভ। শ্রোতা দর্শকের ভিড়ে মুখ লুকিয়ে বসে থাকা একজন সাধারণ মানুষ। বিহারের কেউ যাকে চেনে না। ২৪শে মার্চ সকাল সাড়ে নটায় থেকে সাড়ে দশটা তারপর আর অপরিচিত ছিলাম না। দৈনিক জাগরণ হিন্দুস্থান টাইমস প্রভাত খ, আপনা বিহার পত্রিকা আর বহু টিভি চ্যানেল আমাকে নিয়ে যা ক্ষেপে উঠেছিল–আর অপরিচিত থাকার উপায় ছিল না। জ্বল জ্বলে হয়ে উঠেছিলাম আমি। আমার নাম প্রস্তাব করা বজরঙ বিহারি অনুষ্ঠানে শেষে শ্রোতাদের প্রতিক্রিয়ায় সন্তুষ্ট হয়ে বহুবার শোনা সেই শোলে সিনেমার সঞ্জীব কুমারের সংলাপ আবার বলেছিলেন–বাঙাল সে আপকো বিহার বুলাকার হামনে কোঈ গলতি নেহি কি।
২৪শে মার্চ ২০১৩, টিক টিক করে ঘড়ির কাঁটায় এগিয়ে চলেছে সময়। স্নান টান করে আমি প্রস্তুত–যেতে হবে যুদ্ধভূমিতে। নির্ধারিত সময় ৯.৩০। দুদিন ধরে নিবিড় পর্যবেক্ষণ করেছি প্রতিপক্ষ সেনাদলের গতিবিধি আর অস্ত্র ভাণ্ডার। চারু মজুমদার বলেছিলেন–সঠিক তদন্তই একটা সফল অ্যাকশনের প্রাণ। তাই দুদিন ধরে জেনে বুঝে নিয়েছি কী ধরনের মারণাস্ত্র আমার দিকে ধেয়ে আসতে পারে–তখন আত্মরক্ষা কোন্ অস্ত্রে সম্ভব হবে।
এই অনুষ্ঠান অংশের সঞ্চালক বজরঙ বিহারি তিওয়ারি। বসেছিলাম দর্শকাসনে, তিনি নাম ধরে ডাকতে দৃঢ় পায়ে হেঁটে উঠলাম মঞ্চে। ইংরাজিতে যাকে এরিনা বলে-বুনো মোষকে ছেড়ে দিয়ে চারদিক থেকে লোকে যাকে খোঁচায়, খেপায়, রক্তপাত ঘটিয়ে আনন্দ পায়। তাকালাম সামনের অক্ষৌহিনী নারায়ণ সেনার দিকে। “আমি এক অঙ্গহীন অস্ত্রহীন” একা-একলব্য।” যদি ওই বাহিনীকে বিধ্বস্ত করতে পারি সসম্মানে চক্রব্যুহ থেকে বের হয়ে যেতে পারব। যদি না পারি ওরা পেড়ে ফেলবে। নাচবে আমার মৃত দেহের উপর। বলবে–যোগ্যতমের জয়। এরা অযোগ্য তাই নিম্নে পড়ে আছে। যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল তবু হেরে ভূত। অতএব–প্রমাণিত হল এরা পারে না, পারবে না। কী দরকার তোদের এসব সাহিত্য ফাহিত্য করে। যা, গিয়ে চাষ কর রিকশা চালা মোট ব। যা তোরা পারিস।
