আমাদের বাড়ি থেকে বাসস্ট্যান্ড আসার মতো কোনো বাহনের চলাচল নেই বাধ্য হয়ে একটা ট্যাক্সি নিতে হল। সঙ্গের দুটো ব্যাগ বেজায় ভারি। আমার স্ত্রী আর পাশের বাড়ির এক মহিলা সাবিত্রী দলুই দুজনে গেল সেই ভয়াবহ শেষ দৃশ্যের সাক্ষী থাকবে বলে।
আগে আমি যখন দুবৃত্ত ছিলাম তখন দেখেছি সত্যের চেয়ে মিথ্যার শক্তি শতেক গুণ বেশি। এখন সু-বৃত্তে এসে জেনেছি সত্যতে ঝামেলা অনেক কম। হ্যাঁ, সাহিত্য করতে হলে ভুরি ভুরি মিথ্যের মালা গাঁথতে হয়। যা হয় না হবে না, সেই হয় হবের গাথা গাইতে হয়। মানুষকে পশুত্বে অবনমন থেকে রক্ষা করতে সত্য শিব সুন্দর এসব বলতে হয়। সে সব অনেক উচ্চাঙ্গ ব্যাপার। তবে সাধারণ মানুষকে সাধারণ জীবন যাপন করতে হলে সত্য পথ ধরে চলায় প্রেসার সুগার এইসব ঝামেলা থেকে নিষ্কৃতি মিলে যায়।
তাই গাড়ি যেখানে থেমেছে ব্যাগ কাঁধে করে পৌঁছাই গেটের কাছে। বলা হয়েছিল দুঘন্টা আগে আসতে। কী সব চেকিং ফেকিং হয়। তবে অনুমতি মেলে প্লেনে চাপবার। আমি ঘড়ি ধরে দুঘন্টা আগে এসেছি গেটের সামনে। তার আগে আধঘন্টা বসেছিলাম অন্যখানে।
এবার বউ থেকে বিচ্ছেদ। সে ছল ছল চোখে বিল্টুদায় জানায়। সেই বুহ্যচক্রে প্রবেশের আগে যাত্রা দলের অভিমন্যু গান গায়–বিদায় দাও গো প্রাণেশ্বরী যেন যুদ্ধতে জয় করতে পারি গো। আমিও মনে মনে বলি–সারা ভারতের বিশিষ্ট বিদ্বানরা আসবে, সেই মঞ্চে আমি একা এক দরিদ্র দলিত। যেন ছাপ ছেড়ে আসতে পারি। যেন যতবার বিহার দিবস পালন হবে–সব অনুষ্ঠানে অনুভূত হয় আমার অনুপস্থিতি।
গেটের সামনে এক সিকিউরিটি গার্ড। প্লেনের টিকিট আর ভোটার আই কার্ড দেখাই তাকে–বলি বিশেষ পড়ালেখা জানি না।ইংরাজি তো একদম না। এই প্রথম প্লেনে যাচ্ছি। কোথায় যেতে হবে কী করতে হবে বলে দিন।
সত্যমেব জয়তে হয়। সে বলে দেয়–সোজা গিয়ে ডান দিকে ঘুরবেন। দেখবেন কাউন্টার। কাউকে জিজ্ঞাসা করলে বলে দেবে–জেট এয়ার লাইনস্ কাউন্টারে টিকিট দেবেন। এরপর কী করতে হবে ওরা বলে দেবে।
বলে দেয় তারা–ওখানে গিয়ে লাইন দিয়ে অপেক্ষা করুন। সেখানে বড় ব্যাগটা জমা করে নেয়। মেশিন দ্বারা আমার শরীরে তল্লাশি চালায়। শেষে দেখিয়ে দেয় আর একটা গেট। ওখান দিয়ে ভিতরে যান। সেই গেটে আর একজন সিকিউরিটি। সেও কিছু পরীক্ষা পর্বের পরে পৌঁছাতে দেয় প্রতিক্ষালয়ে।
এইসব করতে ঘন্টা দুয়েক কেটে গেছে। খানিকক্ষণ অপেক্ষার পর এক বাসে তুলে নিয়ে গেল প্লেনের কাছে। ছোট প্লেন তার সিঁড়িটাও ছোট। তবু সেই সিঁড়ি বেয়ে প্লেনে চড়ার সময় সাদা শরীর শিহরিত হল আমার। এ বুঝি সেই সিঁড়ি যা রাবণ বানাতে চেয়েছিল। যে সিঁড়ি বেয়ে স্বর্গে পৌঁছানো যায়। রাবণ যা পারেনি, বিজ্ঞানীরা পেরেছে। এই তো আমি স্বর্গে পৌঁছে যাচ্ছি।
মনটা এখন কেমন যেন করছে, বাবার মুখটা মনে পড়ছে। সারা জীবনে কোনদিন সে রেলের তৃতীয় শ্রেণির বগিতে টিকিট কেটে চেয়ারে বসে যেতে পারেনি। আমি কতবার জুন মাসের দুপুরে দুটো দশটা ডিউটি করার জন্য রাজডাঙ্গা খাল পার থেকে হেঁটে হিন্দুস্থান পার্কের জ্যোতি বসুর বাড়ির কাছে ভারত টিভি কোম্পানিতে গেছি মাত্র পঁচিশ পয়সা পকেটে না থাকায়। সেই আমি আজ এরোপ্লেনে চাপব। মেঘের উপর দিয়ে উড়ব। যেখান থেকে হাত বাড়িয়ে চাঁদ তারা ছুঁয়ে ফেলা যায়। আমি ধন্য। বজরঙবাবু তোমাকে ধন্যবাদ।
প্লেনে বসার পর ঘোষণা হল–এবার প্লেন উড়বে। কোমরে সিট বেল্ট বেঁধে নিন মোবাইলের সুইচ অফ করে দিন। এরপর প্লেন রওনা দিল, প্রথমে সোজা দক্ষিণ থেকে উত্তরে গেল কিছু পথ, বাসের মত গড় গড়িয়ে একটু গতি কমিয়ে ডান দিকে ঘুরল ফের ছুটল দক্ষিণ দিকে। জোরে–আরও জোরে। তারপর এক ঝকিদুঝুঁকি তিন ঝুঁকি দিয়ে মাটি ছেড়ে ক্রমে উঁচু থেকে আরও উচ্চে উঠে পড়ল। একবার বাঁ দিকে কাত হল একবার ডান দিকে কাত হল-ফের বাম ফের ডান উচ্চ থেকে উচ্চতর হল প্লেনের অবস্থান।
প্লেনে বসার আসন পেয়েছি ডানদিকের জানলার ধারে। আমার বাঁদিকের একটা সিট। সেটা খালি। কেউ বসেনি। কেন বসেনি। আমার গায়ে ঘামের গন্ধ? চেহারাটা খসখসে অ-বাবু? বসেনি তো বয়েই গেল আমার, আমি তো বসেছি। সারা দেহ মন রোমাঞ্চিত হচ্ছে আমার। সারাটা জীবন মাটি কাদায় পাঁকে পা দিয়ে কেটেছে। আমার ভাগ্য আজ আমাকে দুটো ডানা দিয়েছে। শঙ্খ চিল বানিয়ে দিয়েছে, সেই আনন্দে হাবুডুবু খাচ্ছি আমি। কেন আমার পাশের সিট খালি সে দিয়ে আমার কী দরকার।
একটু অস্বস্তি যে হচ্ছে না, তা নয়। এখানে আমি যেন বাঘের পালে এক শেয়াল শাবক। চারপাশে যে লোকজন তাদের পোষাক আষাক, চালচলন, কথা বার্তা সব কিছুতে বোঝা যাচ্ছে এরা কেউ আমার গোত্রের নয়–সব ধনবান। সেই দাপট যেন ফুটে ফুটে বের হচ্ছে। তাই তাদের দিকে না তাকিয়ে জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকাই। নিচে দেখা যাচ্ছে কলকাতা মহানগরটাকে। বিশাল বিশাল দালানগুলো যেন এক একটা দেশলাই খোলের মতো ছোট আর ক্ষুদ্র। চোখে পড়ল ইন্ডোর স্টেডিয়াম, শহিদ মিনার। কতবার ভেবেছি একদিন ওই মিনারের মাথায় চড়ে কলকাতা শহরটা কেমন দেখায়–দেখব। যারা চড়েছে সবাই বলেছে–চড়তে পারবে না খুব উঁচু। পা ধরে যাবে। সেই শহিদ মিনারকে এখন দেখাচ্ছে যেন আমারই বুড়ো আঙুলের মতো ছোট। তুচ্ছ মনে হচ্ছে তার অহঙ্কারি উচ্চতাকে–আমার অহঙ্কারের তুলনায়। তার উঁচু মস্তক এখন আমার পায়ের অনেক নিচে।
