হয় এমনটা হয়। যে ছেলেটা যে মেয়েটাকে পাগলের মতো ফটো দেখে ভালোবাসত, পরিচয় হবার কয়েক দিন পরে সে প্রেম ধুয়ে যায়। তখন সে সেই মেয়ের মুখোমুখি হবার ভয়ে পালাতে থাকে।
বিহারের পাটনার বুড়োনাথ তলার বসাক কুটীর ঠিকানা থেকে বর্ণালী বসাক নামে একটি মেয়ে আমাকে চিঠি লিখত। প্রতি সপ্তাহে একটা দীর্ঘ চিঠি। আবেগ আর আন্তরিকতায় মাখামাখি সে চিঠি–বহুকাল আমার মনের শান্তি ও প্রাণের আরাম–গর্বিত হবার রসদ জুগিয়েছে।
একদিন একটা ভুল করে ফেললাম। সেই যেবার ডাক্তার পিটিয়ে জেলে যাই–সেটা আমার ছবিসহ অমৃত সন্দেশ পত্রিকায় সংবাদ হয়েছিল। সেই পেপার কাটিংতাকে পাঠিয়ে দিই। ভাবনাটায় আমার ছেলেমানুষি ছিল। আমি চেয়েছিলাম সে জানুক, আমি কত সাহসী, সমাজ সেবক। কিন্তু সে দেখল এক মাঝবয়সী জেল ফেরত আসামির অনাকর্ষক চেহারা। চিঠি আসা বন্ধ হয়ে গেল বর্ণালী বসাক নামের সেই কবি কল্পনায় গড়া মানসী প্রতিমার।
হতে পারে আমার উপর কোনো কারণে মোহভঙ্গ ঘটে গেছে তার। সে তো হতেই পারে। তবে সেটায় এমন মোটা দাগের নিষ্পত্তি না ঘটিয়ে একটা শিল্পীসুলভ তুলির টানে ইতি টানতে পারতেন। সেটা যে তিনি পারতেন না তেমন না, তাতে শ্যাম কুল দুটোই রক্ষা পেত।
কেন সেটা করলেন না, কোথায় তার অনীহার উৎস?
দিল্লিতে থাকেন এক ভদ্রলোক। নাম বজরঙ বিহারী তিওয়ারি। ইনি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং লেখক। লেখার বিষয় দলিত সমাজ এবং সাহিত্য। এঁরই একটা লেখা দিল্লির কথাদেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হবার ফলে সারা ভারতের হিন্দি পাঠক আমার বিষয়ে অবগত হয়েছেন। একদিন সেই বজরঙ বিহারির ফোন এল–ব্যাপারীজি নমস্তে। কেইসে হ্যায় আপ?
বলি–ব্যাস্—চলারহা__
বলে সে–বিহার মে বিহার সরকার দৈনিক জাগরণ পত্রিকা আউরভি কুছ সংস্থায়ে মিলকর বিহার দিবস নাম সে এক কারিক্রম মানানে জা রহা। উনমে পাটনা লিটারেচর ফ্যাস্টিবল নাম কা এক কারিক্রম রাক্ষা গয়া। তিন দিন চলনে বালা উস প্রোগ্রামমে দিল্লি বিহার কলকাতা–প্রায় দেশকে সভি প্রদেশসে ডেলিগেট আয়েঙ্গে। আয়েঙ্গে পাকিস্তান সে ভি।
বলি–বহুত বড়া কারিক্রম।
হ্যা বহুত বড়া। বলে সে–উনহোনে মেরে উপর এক জিম্মেদারি সোপা হ্যায়। ম্যায় সারা দেশ মে সে স্রেফ এক দলিত লেখক কো চুন সকতা। ম্যায় তো দুবিধা মে পড় গয়া থা–কিসকো চুনু।
হেসে হেসে বলি আমি–কিউ! সারা দেশমে দলিত লেখক মে সে কিসিকো উস কারিক্রম কা যোগ্য মিল নেহি রহা?
বলে সে–মিল তো বহুত রহা, মহারাষ্ট্র, গুজরাত, দিল্লি মেভি বহুত বড়া বড়া দলিত রাইটার ভরা পড়া হ্যায়। লেকিন–
বলিয়ে!
মেরে হিসাব সে ইনমে কোঈ ভি সহি মাইনেমে দলিত সমাজকা প্রতিনিধিত্ব নেহি কর রহা। এ লোক সব কোঈ অধ্যাপক, কোঈ বড়া সরকারি নোকর ভুখ-দলন জানতাই নেহি। মেরে কহনেকা মতলব এ লোগ সামাজিক রূপ মে দলিত জরুর লেকিন আর্থিক রূপ মে বহুতহিসচ্ছম। হ্যাঁ আগার দশ কো চুননেকা মওকা হোতা তো জরুর ম্যায় ইনমেসে চুনকো লিয়ে মজবুর হো যাতা। লেকিন চুন না থা এক-তো ম্যায় আপকো চুনা। না নেহি বোলিয়ে গা। ম্যায় আপকা নাম প্রস্তাব করা চুকা। ও লোক আপকো ফোন করে গা, এ মেরা ইজ্জত কা সওয়াল।
না, আর কিছু বলার মতো নেই। বজরঙ বিহারির চয়নের যে যুক্তি সেটা অকাট্য। আর্থিক এবং সামাজিক দিক থেকে দলিত লেখক-আর কেউ নেই। এটা তো দলিত বুদ্ধিজীবী কবি লেখক শিক্ষক সমাজ সেবক সবারও একটা সমস্যা। যে লোকটা ইসকুলে গেল না, বড় হল গরু চরিয়ে, এখন বাসন মাজে রান্না করে–তার এসব লেখালেখির কি দরকার ছিল। তা আবার এমন লেখা যা ই.পি.ডব্লু. ছাপে! সুযোগ পেয়ে তখন বলি বজরঙ বিহারিকে–যাব। না বলব না। তবে আমাকে প্লেনে নিয়ে যেতে হবে। ফেরবার সময় না হয় ট্রেনে ফিরব। জীবনে কখনও প্লেনে চড়িনি। আপনার সৌজন্যে একবার চড়ে দেখতে চাই।
শর্ত মেনে নিল তারা। আর তাই একবার পাখি হয়ে উড়ে নিচের ঘর বাড়ি পাহাড় নদী মানুষ কেমন দেখায়–দেখে নিতে পারলাম! বলেছিলাম ডান দিকে জানালার পাশে সিট চাই। সেই সিটই পেয়েছিলাম। আকাশে মেঘ থাকায় হিমালয় দেখতে পাইনি। খুব ইচ্ছে ছিল দেখার।
আমি প্লেনে চড়ব এটা আমার পরিবারের কাছে যেমন, দরিদ্র গ্রাম ক্ষুদিরাবাদের কাছেও একটা আশ্চর্য ঘটনা। পাশের বাড়ির অজিত দলুইয়ের বুড়ি মায়ের ভয়ে বুক কাঁপছে। সে এসে আমার বউকে বলে–ছেলেরে মানা কর বউমা অত উপর দিয়ে যাবে যদি পড়ে যায় তেখন কী হবে!
সত্যি বলতে কী প্লেন উঁচুতে ওঠার পর মৃত্যুভয় আমার যে আসেনি তা কিন্তু নয়। ভয়ের সাথে কিছু আশাও এসেছিল। অহো, এই মৃত্যু কত না মহান যদি আসে তো আসুক না। যার বাস লরি চাপা পড়ে মরার কথা, যার চাকু বোমা গুলি খেয়ে মরার কথা, যার কিছু না খেয়ে মরার কথা সে যদি প্লেন দুর্ঘটনায় মরে—সে মৃত্যু জগন্নাথের রথের চাকায় পিষে মরার মতো পুণ্যের মরণ। বউ বাচ্চার জন্য কিছু করে রাখতে পারিনি। কাল না হয় কদিন পরে তারা পেয়ে যাবে বীমা কোম্পানির দশ না পনের লক্ষ টাকা। খেয়ে পরে বাঁচবে। তবে তা চাইলেইকী পাওয়া যায়?শালা এমন একটা ছিঁবড়ে জীবন আমার ভালোভাবে যে বাঁচবো সেও পারব না, ভালো ভাবে যে মরব সেও ভাগ্যে নেই।
