আমার এক দাদা–যার সঙ্গে পথেই পরিচয় সে এসে একদিন বলে–এবার আপনার মনোবাসনা পূর্ণ হবে। ব্যাঙ্গালোর থেকে একটা আমন্ত্রণ এসেছে। আপনাকে সেখানে যেতে হবে।
নেচে উঠি আমি–প্লেনে যাব?
না, ট্রেনে।
যাব না।
আগে পুরো ব্যাপারটা তো শুনুন।
বলুন।
ব্যাঙ্গালোর থেকে আর একটা অনুষ্ঠানে যাব। সেটা হবে দিল্লিতে। জে.এন.ইউতে আর একটা অনুষ্ঠান আছে।
ব্যাঙ্গালোর থেকে দিল্লি নিশ্চয় প্লেনে যাব?
না, ওটাও ট্রেনে যেতে হবে।
তাহলে আমার আশা পূরণ কোথায় হবে?
দিল্লি থেকে কলকাতা ফেরার সময়। এটাই হবে প্লেনের যাত্রা। সব কথা ফাইন্যাল হয়ে গেছে। যাবার জন্য রেডি হোন।
তার কথায় বিশ্বাস করে বুকের গনগনে আশায় বৈশাখের ঘূর্ণি বাতাস লাগে। কাজের জায়গা থেকে দিন সাতেকের ছুটি নিই। বাড়িতে পাড়াতে কর্মস্থানে সবাইকে ডেকে বলি সুসংবাদের বার্তা–-শোন হে মানুষজন এবার বেড়ালের ভাগ্যে শিকে ছিঁড়েছে।
কাছে কোনো টাকা পয়সা ছিল না। এক বন্ধুর কাছে কিছু টাকা ধার করে কিনে আনলাম একটা বড় ব্যাগ। সাত আট দিনের যাত্রা, যেমন তেমন ব্যাগ হলে তো চলবে না। সাত-আট দিনের জামা প্যান্ট তো আটা চাই। সাড়ে বারোশো সেই ব্যাগে গচ্চা গেল। কিনতে হল কয়েকটা পাজামা পাঞ্জাবি গেঞ্জি জাঙ্গিয়া তোয়ালে আর দাড়ি কামাবার সাজসরঞ্জাম। পথে যদি শরীর খারাপ হয় সে জন্য কিছু ওষুধ। অনু বড় হিসেবি–সে হিসেব করে তেল সাবান শ্যাম্পু যা যা লাগবে বলে তার ধারণা–সব গুছিয়ে ব্যাগে ভরে দিল।
যেদিন যাব তার দুদিন আগে থেকে শুরু হয়েছিল গোছগাছ। সে কি গোছগাছ! যেন যুদ্ধ যাত্রা। আমাদের পাড়ায় কোনো জুতো সরাইয়ের লোক নেই। অনু দশ আর দশ কুড়ি টাকা শাল ট্যাক্সি ভাড়া দিয়ে দু ঘন্টা সময় নষ্ট করে মুকুন্দপুরে গিয়ে ছেঁড়া জুতো সারিয়ে পালিশ করে নিয়ে এল। তার কঠোর নির্দেশ–যখন প্যান্ট পরব তখন যেন বুট পায়ে দিই। পায়জামা পাঞ্জাবির বেলা চটি।
অনু যখন ছত্তিশগড় থেকে কলকাতা চলে আসে শিলনোড়া পর্যন্ত বয়ে নিয়ে এসেছিল। মুড়ো আঁটাখানাও ফেলে আসেনি। যদি জানত ব্যাঙ্গালোর দিল্লি গিয়ে রান্না করে খেতে হবে আমার ব্যাগে হয়তো শিল নোড়া দা বটি সব ভরে দিত। তবু একটা ছোট, একটা বড় দুটো ব্যাগে যা মাল ভরেছে ওজন বারো চৌদ্দ কিলোর কম নয়। সব গুছিয়ে নির্দিষ্ট দিনে বসে থাকি সেই দাদার একটা ফোনের অপেক্ষায় ফোন আসবে–আমি রওনা দেব হাওড়ার উদ্দেশ্যে। গিয়ে দাঁড়াব বড় ঘড়ির নীচে। দাদা এবং তার সাথে আসবে অন্য একজন তিনজনে গিয়ে চাপবো ব্যাঙ্গালোরগামী ট্রেনে।
কিন্তু কোথায় সেই কাঙ্ক্ষিত ফোন। সকাল গড়িয়ে দুপুর–দুপুর গড়িয়ে বিকাল, বিকেল গিয়ে নামল রাত। ফোন আর এল না। সেদিন, তারপরের দিন–তারও পরের দিন–কোনো খবর নেই। কী হল লোকটার তা কে জানে!
তার সম্বন্ধে সবিশেষ কিছু জানি না। বাড়ির ঠিকানা, সন্তান সন্ততি কে কী করে, তিনি কী করেন–সংসার কী করে চলে কোনোদিন কিছু বলেননি তিনি। আমার অভ্যাস কারও কোনো ব্যক্তিগত ব্যাপারে কৌতূহল না প্রকাশ করা। যে কারণে তার সাথে আমার পরিচয় শুধু সেই ব্যাপারটায় সব প্রশ্ন উত্তর সীমাবদ্ধ রাখা। যদি সে কোনো সময় নিজের কথা বলে–শুনব। আগ বাড়িয়ে জানতে চাইব না।
তাই সেই দাদা বিষয়ে খুব বেশি কিছু জানি না। একটি অনুষ্ঠানে পরিচয়। তখন থেকে সে আমার বাড়ি আসে। ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকে। চা খায় সিগারেট খায় গল্প করে। গল্প দেশ নিয়ে–সমাজ সাহিত্য রাজনীতি নিয়ে।
যেমন সে হঠাৎ করে এসেছিল, আবার নিখোঁজ হয়ে গেল হঠাৎ করে। আগে ভেবেছিলাম কোনো বিপদ হয়েছে। বার বার ফোন করছিলাম আমার মোবাইল থেকে। রিং হয়ে যাচ্ছিল কেউ সে ফোন রিসিভ করেনি। যখন আমার স্ত্রী অনুর মোবাইল থেকে ফোন করলাম সে ফোন রিসিভ করলেন। গলা শুনে বুঝলাম সুস্থ আছেন। তবে আমি কিছু বলার চেষ্টা করতেই ফোনটা কেটে গেল।
একটা মানুষ একটা দমকা হাওয়ার মতো জীবনে এসেছিল। মাত্র কয়েকদিন–তারপর কোনো দাগ চিহ্ন না রেখে মিলিয়ে গেল হাওয়ারই মতো। না, দাগ একটা বোধ হয় একটা থেকেই গেল যা কোনোদিন মুছে যাবার নয়। হতে পারে কোনো এক মহল থেকে চাপ এসেছিল–যেন আমাকে নিয়ে যাওয়া না হয়। সে চাপ তার পক্ষে না মেনে কোনো উপায় নেই। এমন তো সব মানুষের বেলাই হতে পারে। তাহলে উনি যদি একটা ছোট্ট ফোন করে আমাকে বলে দিতেন–”না দাদা, আপনাকে নিয়ে যাওয়া যাবে না, কিছু অসুবিধা ঘটে গেছে। শেষ মুহূর্তে উদ্যোক্তারা কেন কে জানে বেঁকে বসেছে। কারণটা ঠিক যে কি আমি জানি না।” এক ফোনে সব ব্যাপারটা মিটে যেত।
আমি তো জানি–শুধু পশ্চিমবঙ্গে নয়, সারা ভারতবর্ষে আমার অগণন বিরুদ্ধপক্ষ গজিয়ে উঠেছে। লক্ষণটা খুব একটা খারাপ নয়। এটা নিউটনের সূত্র–বন্ধুর সংখ্যা যত বেড়ে যাবে–সমান অনুপাতে শত্রুর সংখ্যাও বাড়বে। এখন শত্রুর ভয়ে যদি বন্ধু বৃদ্ধির পথে পাথর ফেলে দিই সেটা অনুচিত হবে। তাই বন্ধুর মতো শত্রুও স্বাগতম, এসো শত্ৰু হানো আঘাত আমি বুক পেতে দিয়েছি।
কেন উনি ফোন করলেন না? তবে কী ওনার নিজেরই মোহভঙ্গ ঘটে গেছে আমার বিষয়ে। এই দুদিনে চিড় ধরেছে কোনো পুরানো ধ্যান ধারণায়। কাল আমাকে যা ভেবেছিলেন আমি আজ আর সেই মানুষ নেই? পদস্খলন ঘটে গেছে আমার। বের হয়ে পড়েছে কোনো গোপন দোষ।
