কাঁকেরে এককালে চেনা তো আমার অনেক ছিল, তবে তাদের খোঁজার মতো অবকাশ ছিল। সূর্য ডুবে যাচ্ছে আলো কমে আসছে, তখন ক্যামেরা ব্যবহারে লাভ হবে না। তাই একমাত্র নাজিব কুরেশি আর কাঁকেরে এলে যে হোটেলে রাত কাটাতাম কখনও কখনও, সেই পাঞ্জাব হোটেলের মালিক নাজিব এবং আমারও বন্ধু সরোজ–এই দুজনের বাইট নেওয়া হল। “বাঙালি দাদা মনোরঞ্জন বেপারির” বিষয়ে কিছু স্মৃতির জাবর কাটল তারা।
পরের দিন পাকড়াও করলাম বাঙালি উকিল বিষ্ণুপ্রসাদ চক্রবর্তীকে। সেও খানিক বকলেন। খুব বেশি নয়, তবে অল্প স্বল্প আমিও তো মানুষ চিনি। শারীরি ভাষ্য কিছুটা বুঝি। এদের মুখের কথা, এতকাল পরে আমাকে দেখতে পাবার আনন্দ আর সেই কতকাল আগে তাদের সঙ্গে যে সম্পর্ক ছিল, সব এখনও দরদের সাথে বুকের মধ্যে ধরে রেখেছে দেখে মনটা ভরে গেল আমার।
বুঝলাম–শারীরিক ভাবে আমি এখানে না থাকলেও এদের অলস আলোচনায় আমি আছি, আমি বহুকাল থাকব। ছত্তিশগড় ভ্রমণের এটা একটা বড় প্রাপ্তি।
.
আমার বাড়ির পাশের এক মার্কসবাদী পার্টির আঞ্চলিক নেতা মারা গেছে। খুব দাপুটে নেতা ছিলেন তিনি। মৎস্যজীবী পরিবারের সন্তান। প্রথম জীবনে বড় অভাব অনটনে দিন কাটিয়েছেন। নিজের মুখে বলেছেন তিনি তখন কচু ঘেঁচু খেয়ে বেঁচেছি। শেষ জীবনটা তার পার্টির দয়ায় বেশ সুখে কেটেছে। আগে পিছে দশজন চেলা ঘুরত। তাদের সব খরচা উনি চালাতেন। শুনি, দুপুর রাতে শুধু মদ্যপানেই হাজার বারোশো খরচ হতো।
ছয় ছেলে তার। মোটামুটি সবার জীবন সচ্ছল ভাবে ব্যয় করার পোক্ত ব্যবস্থা তিনি করে রেখে গেছেন। সব ভাইয়ের পাকা বাড়ি আর নানা ধরনের লাভদায়কলগ্নিকারী ব্যবসা। পুত্রবধূদের গা ভর্তি গহনা।
তিনি মারা যাবার পর প্রায় গোটা পঞ্চাশ গাড়ির মিছিল হয়েছিল। লাল কাপড়ে ঢেকে পার্টি অফিসে আনা হয়েছিল মৃতদেহ। লাল সেলাম দিয়েছিল কমরেডরা। আর বৈদিক মন্ত্র উচ্চারণে সমাধা হয়েছিল শ্রাদ্ধানুষ্ঠান। রাতের দিকে শোকগীতির আসর বসেছিল। ডজনখানেক মাইকে–এলাকার জনগণকে শোনাবার ব্যবস্থা হয়েছিল সেই গীত।
এলাকার এক সুগায়ক–ভক্ত বাউল যে প্রায়দিন সূর্য উদিত হবার সাথে সাথে দাস পাড়ার ব্রীজের সামনে চোলাই পান করে ধুলোমাটি মেখে ‘গড়াতে’ থাকে, সে বড় দরদী গলায় গাইছিল বারে বারে আর আসা হবে না। হে মানব, চুরাশি কোটি যোনীভেদ করে সর্বশেষে এই দুর্লভ মনুষ্য জন্ম পেয়েছে। এই জনম আর পাবে না। যতক্ষণ দেহে প্রাণ আছে, বুকের মধ্যে ধুকপুক শব্দ হয়, চোখের পলক, নাকের নিঃশ্বাস পড়ে–কিছু সুকর্ম করো। না হলে মরে যাবার পর হা হুতাশ করে কোনো ফল হবে না।
এই গান আমি বহু বছর ধরে বহুবার বহুজনের গলায় শুনেছি। শুধু এই গান কেন আমাদের সব ভক্তিগীতিতেই সর্বদা মানুষকে ভীত করে তোলার একটা প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। মোটমাট সব কথার এক কথা–শেষের সেদিন ভয়ঙ্কর। বেঁচে থেকে আর কী এমন যন্ত্রণা পেয়েছে, পাবে মরে যাবার পরে। রামকৃষ্ণদেবও বলেছেন–মরণটাকে মনে রেখ।
এক একটা কথা এক একজন মানুষের উপর এক এক রকমের প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। সেই যে পরমহংস বলেছেন-টাকা মাটি মাটি টাকা। সেই শুনে কেউ টাকাকে মাটি (ময়লা) মনে করে ফেলে ছড়িয়ে পথের ভিখারি হয়ে যেতে পারে, আবার কেউ মাটিকে টাকা ভেবে জমি–অর্থাৎ মাটি কিনে ইটভাটা বসিয়ে মাটিকে অনেক টাকায় বদলে ফেলতে পারে।
মহাভারত পাঠের শেষে দাদু নাতনিকে জিজ্ঞাসা করলেন–বলো এই মহাকাব্য থেকে কি শিক্ষা পেলে? নাতনি বলল–দেখা যাচ্ছে একটা মেয়ে পাঁচটা পতি নিয়েও সতী থাকতে পারে। এতে কোনো অন্যায় হয় না। ওই একই প্রশ্ন নাতিকে করার পর সে জবাব দিল–রাজত্ব অধিকার করার জন্য আত্মীয়স্বজন যদি বাধার সৃষ্টি করে যুদ্ধ করা–প্রয়োজনে হত্যা করায় কোনো পাপ হয় না। না আমার উপর–বারে বারে আর আসা হবে না–কথাটা অন্য কোনো রকম অর্থে নয়, সরাসরি ওই ভাবেই আঘাত করে–আর আসা হবে না। দিনে দিনে গোনা দিন তো হল অবসান। আর–সাধ না মিটিল, আশা না পুরিল সকলি ফুরায়ে যায়।
তেমন কোনো বড় আশা কি আমার কোনদিন ছিল? পেট ভরে দুটো খেতে চাওয়া, মাথার উপর একটা ছাউনি, সস্তার এক দুটো বস্ত্র, অসুখে একটু চিকিৎসা আর অবমাননামুক্ত একটু জীবন। এ যদি কোনো বড় চাওয়া হয়–হতে পারে।
ইদানিং মানুষের দরবারে আমার খানিকটা কদর বেড়েছে। ব্যক্তি থেকে বিষয় হয়ে গেছি যে। ভারতবর্ষের নানা প্রান্ত থেকে বিদ্বজ্জন আমাকে আদর করে নিয়ে যাচ্ছে–কাক কেমন করে কোকিলের ডাক ডাকে–দেখার জন্য। দিল্লি, মহারাষ্ট্র, হায়দ্রাবাদ ঘুরে এসেছি। শুনেছি বাংলাদেশ আর অস্ট্রেলিয়াও আমাকে ডাকবে। তবে যাওয়া যাবে না হয়তো, আমার যে পাসপোর্ট নেই।
সে যা হয় হবে–তবে ইদানিং মনের মধ্যে বড় সাধ আঁকুপাঁকু হচ্ছে একবার জীবনে অন্তত একটা বার এরোপ্লেনে চড়বার। একবার আকাশে ওড়বার। আমি নিঃস্ব, আমার নিজের ক্ষমতায় এই বিলাস কখনই সম্ভব হবার নয়। কিন্তু যারা আমাকে হেতা হোত নিয়ে যায় তারা তো মর্তের কুবের। টাকার পাহাড়ে বসে আছে, তাদের কাছে একটা প্লেনের টিকিট-সে তো হাতির মুখে জিরে। তাই এবার ভীষ্মের প্রতিজ্ঞা করি–এবার যদি কেউ বাংলার বাইরে কোথাও কোনো অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানায়–প্লেনে নিয়ে গেলে যাব। নচেৎ নট।
