সব কিছু শেষ হবার পরে হিসেব করি কতটা গেল আর বিনিময়ে কী এল। দেখলাম সারা বছরের সব সি.এল., মেডিকেল লিভ আমার খতম। দু তিন দিনের পুরো ইউনিটের চা টিফিন সে খরচা আর অনুর কয়েক দিনের হাড়ভাঙা খাটুনি সেটা হল আসলের সাথে ফাউ। বিনিময়ে পাওয়া গেল পরিচালক জয়দীপ ঘোষের-থ্যাংক ইউ। শালা–একজন জুনিয়র আর্টিস্ট সারাদিনে মাত্র একটা শট দিয়ে দুটো সংলাপ বলে পাঁচশো টাকা পকেটে গুঁজে হাসতে হাসতে চলে যায়, একটি মেয়ে আমার বই দেখে বিভিন্ন চরিত্রের মুখের সংলাপগুলো খাতায় লিখেছিল–সে পেয়ে যায়। পাঁচ হাজার। আর আমার হাতে পাঁচটা পয়সাও কেউ ঠেকায় না–মুখ ফুটে একদিন বলে বসি জয়দীপ ঘোষকে–কী দাদা আমাকে কিছু দেবেন না? জবাব দেয় তার এক সহকারি–আমাদের বইয়ে যে প্রথম হিরো হয় সে আমাদের টাকা দেয়, এই বইয়ের হিরো তো আপনি। আপনার উচিত আমাদের কিছু টাকা দেওয়া। ছোট দেখে একটা চেক দিন না।
আমি আর কোনো জবাব খুঁজে পাই না।
কারও দোষ নয়, দোষ আমার এই চার আঙুল নসিবের। শালা এমন কিসমত নিয়ে পয়দা হয়েছি যে–যে পারে সে ইচ্ছেমতো আমাকে জবাই করে ফুটে যায়।
তবে একটা লাভ আমার হয়েছিল সেটা হচ্ছে–এই ছুতোয় একবার মধ্যপ্রদেশের এক টুকরো ছত্তিশগড়ে ঘোরা হয়ে গেল। তা না হলে আর হয়তো কে যাওয়া হতো না। কার টানে যাব? সে রামও নেই আর সে অযোধ্যাও নেই।
আমরা দ্রুগ স্টেশনের সন্নিকটে এক সরকারি বিশ্রামাগারে থাকার সুযোগ পেয়েছিলাম। জয়দীপ ঘোষ ‘উঁচা পঁচবালা আদমি’। সে তার যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে এই ব্যবস্থা করেছিল। সেখান থেকে ভাড়া করা জিপে প্রথম দিন পৌঁছেছিলাম দল্লী-রাজহারায়। শহিদ হাসপাতাল তখন আকারে প্রকারে বিরাট হয়ে গেছে। নতুন নতুন বিভাগ খোলা হয়েছে বসেছে দামি দামি যন্ত্রপাতি। চিকিৎসা কর্মীর সংখ্যা বেড়ে গেছে। বেড়েছে রুগির সংখ্যাও। স্বল্প ব্যয়ে সুচিকিৎসা পেতে দূর দূরান্ত থেকে রোগী আসছে। সেসব তো ঠিক আছে, কিন্তু সেই প্রাণচাঞ্চল্য কই! ইউনিয়ন অফিসে সর্বক্ষণ গমগম করত লোকে, সেসব আর নেই। যেন এক পরিত্যক্ত নগরীর মতো দাঁড়িয়ে আছে খাঁ খাঁ দালান। সামনের মাঠটা–যাকে মজুররা নাম দিয়েছিল লাল ময়দান–সেটা একবুক রিক্ততা নিয়ে পড়ে আছে। যেন প্রিয়জনকে দাহ করে চলে যাওয়া নিস্তব্ধ শ্মশান।
ইউনিয়ন সচিব সহদেব সাউ এখনও আছে। সে যেন এই মহাশ্মশানের নিঃসঙ্গ পাহারাদার। কাছে পিঠে আর কেউ নেই। আছে স্মৃতি আছে শূন্যতা! সাতাত্তর থেকে দুহাজার তেরচল্লিশ বছরের এক বোবা ইতিহাস বহনকারী এক জীবন্ত লাশের মতো পড়ে আছে সে। ইউনিয়ন অফিসের দলিল দস্তাবেজ চেয়ার টেবিল জুড়ে।
সে একদিন স্বচক্ষে দেখেছে সমুদ্র তরঙ্গের মতো ফুঁসে ওঠা শ্রমিক আন্দোলন। দেখেছে হাতুড়ি শাবল গাঁইতি ধরা-বজ্রগর্ভ মুষ্টিবদ্ধ হাত। সে হাত যেন আকাশ থেকে সূর্যকে ছিঁড়ে আনবার অসীম স্পর্ধায় উত্তোলিত হচ্ছে। ভেঙে ফেলে দিতে চাইছে শোষণ আর শাসনের বুহ্যচক্র। ইনকিলাব হুঙ্কারে কেঁপে যাচ্ছে ছত্তিশগড়ের পাহাড় অরণ্যং ভয়ে কাঁপছে শ্রেণিশত্রুদের সুরক্ষিত দূর্গ। বুঝি শেষের সেদিন সমাগত।
সব আজ স্তব্ধ। আর ইউনিয়ন অফিসের সামনের রাস্তা ধরে খাদানের দিকে মিছিল করে যেতে দেখা যায় না মজদুর নারী পুরুষকে। যাদের কাঁধের শাবল গাইতিতে পড়ে ঠিকরে যেত সকাল বেলার রোদ। পেশিবহুল পায়ের আঘাতে উড়তে ধুলো, থরথর করতো মেদিনী। সব নিঃ ঝুম হয়ে গেছে খুনি মালিক শ্রেণির দেশী কাট্টা’র একটা গুলিতে। শঙ্কর গুহ নিয়োগীর ঝাঁঝরা বুকের মতো ছিন্ন ভিন্ন হয়ে গেছে সংগঠন। এখন ছত্তিশগড় মুক্তি মোর্চা একটা নিভে যাওয়া মশাল। ধোঁয়া একটু আছে বটে কিন্তু সেই দাউ দাউ দীপ্তি আর নেই।
নিয়োগীজি মারা যাবার সময়ে তার দু মেয়ে এক ছেলে ছিল ছোট ছোট। শুনলাম বড় মেয়ে ক্রান্তি নাকি এল.এল.বি পাশ করে এখন রায়পুর কোর্টে প্র্যাকটিশ করছে। ছোট মেয়ে মুক্তি দল্লী নগর পালিকা পরিষদের অধ্যক্ষ হয়েছে। তারই উদ্যোগে নিয়োগীজি এবং সাতাত্তরের এগারজন শহিদের শহিদ বেদী ঘিরে নির্মিত হয়েছে উঁচু প্রাচীর, লোহার গেট। লাগানো হয়েছে নানাবিধ ফুলের গাছ। একজন কর্মী রাখা হয়েছে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য।
ছোট ছিল মুক্তি তবু আমাকে চিনতে পারল। আর তাই মনের ক্ষোভ উগরে দিল আমার সামনে। ‘হামনে পর্ষদ চুনাবমে খাড়ে হোনেকে লিয়ে মুক্তি মোর্চা সে টিকট মাঙা থা। নেহি দিয়া। কংগ্রেসকো পাতা চলা, হাম চুনাম লড়না চাহতে হ্যায়, তো উনহোনে কহা, হাম দেতে হ্যায় টিকিট–তোম লড়ো। লড়া আউর জিত গ্যায়া। উনহোনে হামে অধ্যক্ষ বনা দিয়া। দেখতে হ্যায়–আগে ক্যায় হোতা হ্যায়।’
আশা দিদিও চিনল আমাকে। চিনল ফাগুরাম যাদব, জনক লাল ঠাকুর, ছবিলাল সাউ। ডাঃ শৈবাল জানা সে তো চিনবেই। সবাই স্মৃতিচারণ করল অতীত দিনের। বলল সেই আন্দোলনে আমার কী ভূমিকা ছিল। ভূমিকা তো সেই রামচন্দ্রের সেতুবন্ধে কাঠবেড়ালির। দেখলাম সেইটুকুও তারা আজও মনে রেখেছে।
এরপর গেলাম কাঁকেরে। কাঁকের শহরটা এখন দৈর্ঘ্য প্রস্থে চারগুণ বেড়ে গেছে। দল্লী যদি আমার হৃদয় হয় কাঁকের আমার ফুসফুস। এই শহরের গলি-মহল্লা-পথের বাঁকে বাঁকে পড়ে আছে। অসংখ্য স্মৃতিচিহ্ন। আমি ভালোবাসতাম দল্লীকে, এই শহর ভালোবাসতো আমাকে। ছোট্ট প্রাণবন্ত কাকের শহরের নৈঃসর্গ অকৃত্রিম সৌন্দর্য আমার কাছে যেন সেই অঞ্চল যা দেখে মুখ থেকে বের হয়ে আসে–আহঃ স্বর্গ যদি কোথাও থাকে তা এইখানেই। এইখানে, এইখানে।
