সেদিন দুপুরবেলা স্টেশনময় ঘুরে বেড়াচ্ছিল জীবন। এ সময়ে স্টেশনে খুব একটা ভিড় থাকে না। লাল জামা পড়া রেলের কুলিরা এখানে সেখানে শুয়ে পড়েছে গামছা বিছিয়ে। কেউ কেউ বসে গেছে তাস নিয়ে। শহর কলকাতার অরাজকতা এখানে তেমন একটা প্রভাব ফেলতে পারে নি। স্টেশনের প্লাটফর্মের বাইরে ইটের উনুনে কাঠপাতার জ্বালে কালো কালো হাড়িতে ভাত রান্না করছেন কয়েকজন মহিলা। তাদের আশেপাশে ঘুরঘুর করছে বোগা, উদোম কিছু বালক বালিকা। মানুষের হাড়ি কুড়ি সংসারের কাছাকাছি ঘুরে বেড়াচ্ছে কতগুলো ছাল ওঠা নেড়ি কুকুর। তারা বর্তমান সময়ের মানুষের মতই মারামারি কামড়া কামড়ি করছে।
বেশ কিছুক্ষণ এদিক ওদিক ঘোরার পর ক্লান্ত হয়ে খানিকটা কলের জল খেয়ে একটা ফাঁকা বেঞ্চিতে বসে পড়ে জীবন। এমন সময়ে পাশে এসে বসল ওর চেয়ে দু-তিন বছরের বড় একটা ছেলে। একটু লম্বাটে ধরনের চেহারা। গায়ের রঙটা কালো। মাথায় উস্কোখুস্কো লম্বা চুল। পরিধানে একটা বেমানান ফুল প্যান্ট। গায়ে একটা স্যান্ডো গেঞ্জি আর মুখে জ্বলন্ত বিড়ি। ছেলেটা এখানে নতুন আমদানি। জীবন আগে কখনো দেখেনি তাকে। পাশে বসে সে জীবনকে অতি পরিচিতের মত বলে, এই তোর নাম কি রে?
–মোর নামে তোমার কি কাম?
–নাম না জানলে তোকে কি বলে ডাকবো।
–আমায় ডাকবা ক্যান?
–এক সাথ এক জায়গায় থাকলে ডাকা লাগবে না। মানুষ মানুষের কত সময় কত দরকারে লাগে। আমি কটা দিন তোদের এখানে থাকব ভাবছি তো। সেই জন্য নামটা জানতে চাইলাম।
ছেলেটার গলার স্বরে সারল্য এবং সত্যের সংমিশ্রণ। মনে হয় জীবনের একে নিজের নাম পরিচয় দেওয়ায় কোন সমস্যা হবে না। বলে, মোর নাম জীবন।
বলে সে, আমার কী নাম জানিস? শুনলে চমকে যাবি। রাজা, আমার নাম রাজা। তোর চেয়ে বয়সে চার পাঁচ বছরের বড়ো হব আমি। তবে তোকে দাদা ফাদা বলে ডাকতে হবে না। নাম ধরেই ডাকিস।
তাকে রাজা বলে মেনে নিতে কোন আপত্তিকরে না জীবন। কষাইয়ের নাম যদি দয়াময় হতে পারে তাহলে এক পথ বালকের নাম রাজা মহারাজা সম্রাট কেন হতে পারে না।
জীবন চা দোকানে রেল স্টেশন ফুটপাতে অনেক দিন কাটাচ্ছে। লোকমুখে গল্পকথায় জেনেছে কোন কোন সময় রাজারাও রাজত্ব হারিয়ে ভিখারি হয়ে যায়। যেমন হরিশচন্দ্র যেমন নবাব সিরাজ। আবার কোন কোন সময় নিজেরাই ভিখারি ফকির সন্ন্যাসী সেজে বের হয়ে পড়ে ভ্রমণে। এই রাজাটি কোন কারণে এখানে এসেছে সেটা এখনো জানা যায়নি। এক গাল হেসে সেই খবরটাই পরিবেশন করে সে–আমি আসামে যাবো। বলতে পারিস, আমার হচ্ছে আসামে যাওয়া আসার কারবার। বছরে একবার যাই একবার আসি। আমার এক বন্ধু এবার আমার সাথে যাবে বলেছে। সে যতক্ষণ বাড়ি থেকে পালিয়ে না আসতে পারছে আমাকে এইখানে অপেক্ষা করতে হবে। তারই জন্য বসে আছি। না হলে কি আর আমাকে এখানে দেখতে পেতিস। কবে ফুরুত হয়ে উড়ে যেতাম। অনেক দূরের পথ তো। কেউ একজন সাথে থাকলে গল্প গাছা করতে করতে যাওয়া যায়। একা একা বোকা হয়ে ঠিক ভালো লাগে না।
আসাম নাম জীবনের অজানা নয়। যাদবপুর স্টেশনে একজন লোক মাদুলি বেচতে আসে। মাটিতে শুইয়ে সে একটা ছেলেকে মন্ত্রের সাহায্যে মাটি থেকে শুন্যে তুলে দেয়। একটাকা হাতের তালুতে নিয়ে দশটাকা বানাতে পারে। তার এসব মন্ত্র নাকি আসাম গিয়ে শেখা। আসাম হচ্ছে পাহাড় জঙ্গল ঘেরা অতি দুর্গম একটা স্থান। যেখানে আছে দেবী কামাক্ষ্যার মন্দির। সেখানে নাকি কোন পুরুষ লোক সহসা যেতে পারে না। যদি যায় সেখানকার জাদুকরী মেয়েরা তাকে ধরে জাদুমন্ত্র বলে ভেড়া বানিয়ে ফেলে।
কিন্তু রাজা নামের এই ছেলেটা এ নাকি অনেক বার আসাম গেছে। তবু এ ভেড়া না হয়ে ফিরে এল কেমন করে? বলছে আবার নাকি যাবে। ধাপ্পা দিচ্ছেনা তো?কিছু বিশ্বাস কিছু অবিশ্বাস নিয়ে জানতে চায় জীবন, তুমি কামরূপ কামাক্ষ্যার মন্দিরে গেছো?
অনেক বার।
সত্যি কইতে আছো?
তোর কাছে মিথ্যা বলে আমার কি লাভ?
মাইনষে যে কয় ওইখানে কেউ যাইতে পারে না। গেলে মাইয়ারা ধইয়া ভেড়া বানাইয়া দেয়।
গুল দেয়। বলে রাজা—সব মিথ্যা কথা। এই তো আমি তোর সামনে বসে আছি। বললাম না অনেকবার আসাম গেছি, তা আমি কি ভেড়া হয়েছি? দেখাচ্ছে আমাকে ভেড়ার মতো?
মোনে কয় ওরা তোমারে দেখতে পায় নাই।
বলিস কি। আমার এত বড় শরীরটা দেখতে পায়নি। দেখা কি রে, কত জনার সাথে কথাও বলছি। এক জনের হাত ধরেছি।
সেই হাত ধরার পুরাতন স্মৃতি মনের দরজায় ধাক্কা মারায় কিছুক্ষণের জন্য অন্যমনস্ক হয়ে যায় রাজা। তারপরে বলে ওই দেশের মেয়েগুলোকে কে জানে ভগবান কি দিয়ে তৈরি করেছে, যদি একবার ছুঁয়ে দেয়, সারা শরীর অবশ হয়ে যাবে। জাদু যদি বলিস, তবে তা ওদের আছে। যদি কোন বাঙালীর ভাগ্যে ও রকম একটা মেয়ে জুটে যায়, ভেড়া কি রে! একেবারে পায়ের জুতো হয়ে যাবে।
মেয়ে বিষয়ক গল্প বেশিদূর এগোয় না। একা রাজা কতক্ষণ বা বলবে! জীবন এখনো এতটা সাবলীল হয়ে ওঠেনি। মেয়ে দেখতে তার ভালোই লাগে, তবে তা আড়চোখে। সরাসরি কারও চোখে চোখ পড়লে কেন কে জানে পা থেকে মাথা অবধি কেঁপে ওঠে। একে শিহরণ বলে।
কিছুক্ষণ পরে জীবনের কাছে জানতে চায়–বিড়ি খাবি?
