সবাই হয়তো আপেল ওয়াইনের জন্য নয়–বসের হুকুমে চাকরির জন্য আসে। তারা তাদের কাজটাকে ভালোবাসে। তাই যে আন্তরিকতায় আমার কথা শোনে ছবি তোলে সেই একই আন্তরিকতায় সাপ বাঘ হাতি ঘোড়ার ছবি তোলে, গর্জন রেকর্ড করে। কেউ কেউ নিপুণ দক্ষতায় শব্দ সাজিয়ে লেখে।
আজকের সমাজ কেউ কেউ যাকে বলে বৈশ্য সমাজ, এই সমাজে যে বেচতে জানে সবকিছু বেচতে পারে–হাসি কান্না রাগ দুঃখ দরিদ্রতা–সব। একবার আমি আর আমার এক ফটোগ্রাফার বন্ধু দাঁড়িয়ে ছিলাম এক রেল স্টেশনে। এক ভিখারিণী বাচ্চা কোলে ভিক্ষে চেয়ে বেড়াচ্ছিল। “সারাদিন খাইনি দশটা পয়সা দাও বাবু”। কেউ তার কান্নায় কান দেয়নি।
এক সময় সে ক্লান্ত হয়ে বসে পড়ল মুত্রালয়ের পাশে দেওয়াল ঘেষে। তারপর সে তার ক্ষুধার্ত বাচ্চার মুখে গুঁজে দিল স্তনের বোটা। ঠিক সেই মুহূর্তে বন্ধুর ক্যামেরা ক্লিক করে উঠল। এক ভিখারি মা তৎক্ষণাৎ হয়ে গেল একটা শিল্প। একটা বিক্রয়জাত পণ্য।
কিছুদিন পরে এক পত্রিকায় সেই অনবদ্য চিত্রশিল্প দিয়ে বন্ধুটি পেয়ে গেল অনেক টাকা। যা সেই ভিখারির কল্পনায়ও আসবে না।
আমিও আজ একটা পণ্য, তাই কেউ আমাকে উপন্যাসের চরিত্র করে। কেউ পত্রিকায় প্রতিবেদন লেখে আর কেউ ফোটো তোলে, হাঁটায় বসায় কথা বলায়। তাদের যেটুকু কাজ–সারা হয়ে গেলে আর আমার কোনো সংবাদ রাখে না। ধাওয়া করে অন্য আর একটা বিষয়ের দিকে।
অমিত ঘোষ নামের এক চিত্র পরিচালক যে আমাকে নিয়ে “সাধারণ অসাধারণ” নামে একটা আধঘন্টার তথ্যচিত্র করেছিল সেটা পরপর কয়েকবার আকাশ বাংলা চ্যানেলে দেখানো হয়েছিল। সে আবার ফোনে জানাল আর একটা তথ্যচিত্র করতে চায়। এটা হবে দুঘন্টার। দেখানো হবে ফেস্টিভ্যালে।
যেবার সাধারণ অসাধারণ হয় চারদিন শুটিং হয়েছিল। দুদিন আউটডোর দুদিন আমার বাড়িতে। চারদিন কাজে কামাই হয়েছিল আমার। বাড়িতে বড় বড় আলো আর ক্যামেরা সব চলেছিল আমার কারেন্ট পুড়িয়ে। ওরাই বলেছিল দুতিনশো টাকার বিল বাড়বে। দশ বারোজন লোকের বার বার চা বিস্কুট সব খরচ ছিল আমার। মনে ভীষণ আনন্দ হচ্ছিল তাই এসব নিয়ে কোনো মাথা ঘামাইনি।
শুটিং শেষ হল, বললাম ওদের–আর কিছু নয় আমাকে একটা সিডি করে দেবেন। কথা দিল তারা–দেব। প্রোগ্রাম টেলিকাস্ট হয়ে যাক। দু-তিনদিন পরে চ্যানেলে যাবেন। দিয়ে দেব। টেলিকাস্ট হয়ে যাবার দুদিন পরে গেলাম চ্যানেল এইট-এ। সেটা ওই মধ্য কলকাতায়। বলল তারা আজ তো হবে না, কাল আসুন। গেলাম পরের দিন। বলে আজকেও হবে না। দিন তিনেক পরে আসুন। তিনদিন পরে বলল–এক সপ্তাহ পরে পাবেন। এক সপ্তাহ পরে-একমাস। একমাস পরে বলল–চ্যানেল থেকে সিডি দেবার কোনো নিয়ম নেই। ওটা দেওয়া যাবে না।
লোকে বলে–তুমি একবার ঠকতে পারো। যদি দুবার ঠকে তবে বুঝতে হবে তুমি আস্ত বোকা। দশবার ঠকেছি, তবু আমার শিক্ষা হয়নি। এবারও তাই সেই অমিত ঘোষকে মুখের উপর না বলতে পারলাম না।
এবার প্রথমে তো বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় আমার উপর যেসব লেখা প্রকাশিত হয়েছে, যা আমি ভবিষ্যৎকালের জন্য গুছিয়ে রেখেছি–সেই ফাইলটা চেয়েছিল–পড়ে দেখবে বলে। ভরসা। করে দিতে পারিনি। যদি হারিয়ে ফেলে। ওর তো কিছু যাবে না। সর্বনাশ হয়ে যাবে আমার। তাই সেগুলো ফোটোকপি করে দিয়েছিলাম। এই একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম বুদ্ধিমানের মতো। কারণ সেগুলো আর ফেরত দেয়নি। তাতে খরচ গেল পঁচাত্তর টাকা। দুখানা ইতিবৃত্তে চণ্ডাল জীবন বই চেয়ে নিয়েছিল পরে দাম দেবে বলে। দাম দেয়নি। তাতেও গেল কিছু টাকা। আর শুটিং চলাকালে পুরো ইউনিট সারাদিন ধরে চা বিস্কুট যা খেল এছাড়া একদিন দুপুরে ভাত, মাছের মাথা দিয়ে মুগ ডাল, ঝিঙে পোস্ত, আর রুই মাছের ঝোল দ্বারা ভোজন সারল আমার ঘাড় ভেঙে। তারপর তারা গেল–। গেল যে গেলই–। আর কোনো খবর নেই। কোনো ফোনও করে না। আমি ফোন করলে দেখি সুইচ অফ।
এই কারণে আর আমি তথ্যচিত্রের নামে আগের মতো আনন্দে উদবেল হতে পারি না। যথেষ্ট হয়েছে আর না। তবে ওই যে বললাম–আমার শিক্ষা হয়নি। আমার মতো বোকা পাঁঠার জন্যই যে কিছু লোকের নাম চালাক চতুর। মালের ঠেকে বসে আমাদের জন্যই দাঁত বের করে বলতে পারে–গাণ্ডুকে যা একখানা টুপি দিয়েছি না। একদম ধরতে পারেনি।
এবার এলেন আর এক ঘোষ। এক ঘোষ আমাকে দুয়ে গেছে এবার ইনি দোহন করবেন। ইনি সেই জয়দীপ ঘোষ যে মায়া বাজার’ সিনেমাটা করেছিল এন এফ ডি সি-র অর্থানুকূল্যে। বইটা তেমন ভালো ব্যবসা করতে পারেনি। নামি পরিচালক দেখে মাথা ঘুরে গেল আমার মনেও রইল না আবার মুরগি হবো। আমাকে বধ করে ভরে নেবে একজন প্রাপ্তির ঝুলি থলি বস্তা।
আবার শুরু হল সেই হাঁকাহাঁকি–সাইলেন্ট, লাইট, সাউন্ড, এ্যাকশান। যার আর এক নাম শুটিং। আমার বাড়ি, কর্মস্থল, জয়দীপ ঘোষের বাড়ি, শিয়ালদহ স্টেশন, যাদবপুরের নানা স্থান, গঙ্গার ঘাট, প্রেসিডেন্সি জেলের ভিতরে আরো বহু জায়গায় মাসাধিক কাল চলল সেই শুটিং। পঞ্চাশ ষাট জন অভিনেতা, সহ-অভিনেতা আর অন্যসব লোকজন নিয়ে সে এক মহা যুদ্ধ। এইসব শেষ করে যাওয়া হল ছত্তিশগড়। তিনচার দিনের শুটিং চলল–ভিলাই দল্লী-রাজহারা আর কাকেরে।
