বলে চন্দ্রশেখর–কালকেই মলয় চৌধুরি ফোন করেছিলেন আমাকে। বললেন–চন্দ্রশেখর তোমার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ যে আমাকে তুমি এত ভালো একখানা বই পড়ালে। আমার লোক গতকালই দিল্লি থেকে কলকাতার দিকে রওনা দিয়েছে। সে মনোরঞ্জন ব্যাপারীর সাথে যোগাযোগ করবে। তারপর দেখা যাক কি করা যায়।
পরিশেষে বলে সে–আমার মনে হয় ওখানে চাকরি করাটা তোমার ঠিক হবে না। মলয় চৌধুরী ভীষণ মুডি লোক। কখন যে কী করবেন কোনো কিছু বোঝা যায় না। আজ যাকে কাছে টানছেন কালকে দূর করে দিচ্ছেন। আমিই ওনার চাকরি করতে পারলাম না। ধর এখন ওখানে ঢুকলে–যদি ছয়মাস পরে চাকরি চলে যায়–তখন কী করবে? দু লাখ টাকায় কদিন খাবে?
এক বুড়ি ছিল। যে মাঠের মধ্যে ঘর বেঁধে একা থাকত। খুঁটে বানিয়ে পেটের অন্ন জোগাড় করত। দম্ভ করে বলত সে, আমি চোর ডাকাত ভূতের ভয় পাই না, ভয় খালি টাপুর টুপুরের। ঘরের চালে খড় ছিল না তাই ওইভয়। সেইরকম আমিও ওবামা আলকায়দা ভূত ভগবান কিছুতেই চমকাই না। খালি বুক কেঁপে যায় অনাহারে থাকার ভয়ে। সে যে কী কষ্ট তা আমি জানি। যার পেটে পোড়া অজগরের মতো মোচড় মারে নাড়িভুঁড়ি তার কাছে নীতি নৈতিকতা ন্যায় অন্যায় সব সীমান্ত মুছে যায়। কাব্য সাহিত্য জ্ঞানবাণী সব মনে হয় অকারণ।
তাই পরের দিন গিয়ে রাতুলকে বলি-না ভাই এখনই আমি তোমাদের চাকরিটা নেব না। ছয় মাস তোমরা আমাকে দেখো, ছয়মাস আমি তোমাদের দেখি। যদি তখন মনে হয় একসাথে কাজ করা যাবে এই চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে যুক্ত হয়ে যাব তোমাদের সাথে। তোমরা বললে লেখা আমি দেব তবে এখন কোনো পয়সা নেব না।
বলে রাতুল–ঠিক আছে, তাই হবে। তবে একটা লেখা দিন।
সেটা ছিল বিবেকানন্দ জন্ম সার্ধশতবর্ষ। সেই উপলক্ষে প্রকাশিত হবে পত্রিকাখানি। জীবনভর কত বাণী দিয়েছেন বিবেকানন্দ। হিন্দুধর্মকে বিদেশে গিয়ে কী উচ্চতায় তুলে দিয়ে এসেছেন। হিন্দু দেবদেবীমুনিঋষি মনীষী নিয়ে কী সুন্দর বক্তৃতা দিয়েছেন। আমার তখন সেসব কিছুই মনে পড়ল না। মনে পড়ল সেই পেটের মধ্যে মোচড় মারা অজগর। অমনি লিখে ফেললাম বিবেকানন্দের জ্ঞানযোগ থেকে একটা কোটেশান। সেই যে তিনি বলেছেন, যারা না খেয়ে থাকে কষ্টে থাকে তারা ভরপেটা চর্বচোষ্য লেহ্য পেয় খাওয়া সুখি মানুষকে বলে–আমরা না খেয়ে আছি, দুঃখে আছি, তোমাদেরও সুখে শান্তিতে থাকতে দেব না। টেনে নীচে নামাব, আমাদের সমান বানিয়ে দেব। সেই কথাকে মূল বিষয় রেখে ধনবানদের নমনীয় মানবিক হবার উপদেশ দিই।
লেখাটা রাতুলকে দিলে সে পড়ে। ইমেল করে দিল্লিতে পাঠায় স্যারকে পড়াবার জন্য। দিন কয়েক পরে জানায় সে আপনার লেখা খুব ভালো হয়েছে। স্যারের খুব ভালো লেগেছে। তবে ওটা ছাপা যাবে না।
বুঝলাম–আমি টেস্টেই ফেল হয়ে গেছি। ফাইনাল পরীক্ষায় আর বসা হবে না। এতে আমার কোনো দোষ নেই। দোষ আমার ভাগ্যের। ভাগ্য আমাকে যে জীবনযাপন করতে বাধ্য করেছে মনে এত বিষবাষ্প জমে গেছে কিছু লিখতে বসলেই কলমের মুখ থেকে সেই বিষ বের হয়ে আসে। পুঁজিবাদ বর্ণবাদকে বিনাশ করার ‘অসৎ অভিপ্রায়’ আর গোপন থাকে না।
মলয় চৌধুরী একজন বিত্তবান। সরস্বতীর সম্পদ বিক্রি করে তিনি লক্ষ্মীর বরপুত্র হয়েছেন। হয়েছেন সৎপথে সততার উপার্জনে। সে না হলে তো আয়কর বিভাগ সিবিআই পেড়ে ফেলত। আর এদেশে তো অর্থ উপার্জন কোনো অন্যায়ও নয়। তা সে যেভাবেই হোক। উনি তো তবু সেই উপার্জন থেকে কিছু কিছু সমাজের নানা কাজে ব্যয় করেন। শোনা যায় শ্রমজীবী হাসপাতালকে কটা দামি মেশিনও দান করেছেন।
সেসব ঠিক আছে। তবে কিনা উনি মাইনে দিয়ে লোক রাখবেন আর সে–উনি যে গাছের ছায়ায় বসে আছেন তারই গোড়ায় কুড়ুল কোপাবে সেটা কী করে পারেন?
তাই রাতুলও আমাকে ডাকেনি। আমারও যাওয়া হয়নি।
ছেঁড়া বস্তা কাঁধে নিয়ে পথে পথে কাগজ কুড়াই। একদিন কুড়িয়ে পেলাম একটা লটারির টিকিট। একজন দেখে বলল–রেখে দে, খেলা বাকি আছে। খেলা হয়ে গেলে, নাম্বার মিলিয়ে দেখলাম, কোনো পুরস্কার ওঠেনি। কাল পর্যন্ত যে টিকিট ছিল লাখ টাকার আশা, আজ তা আবার ছেঁড়া কাগজ। চালান করে দিলাম ছেঁড়া বস্তায়।
আমার বস্তা আছে এটা তো কোথাও যাবে না।
***
১৪. ব্যক্তি থেকে বিষয়
প্রতিবেদক গৌতম রায় একবার আনন্দবাজার পত্রিকায় লিখেছিলেন মনোরঞ্জন ব্যাপারী এখন ব্যক্তি থেকে বিষয় হয়ে গেছে। পড়েছি বটে লেখাটা কিন্তু মানেটা বুঝতে পারিনি। সেটা বুঝেছি অনেক দিন পরে।
আমি একটা বিষয়, এমন একটা বিষয় যেটা নিয়ে গল্প উপন্যাস লেখা যায়। পত্র পত্রিকায় প্রতিবেদন লেখা যায়। যেটা দর্শক খেয়ে মজা পায়। তথ্যচিত্র বানাবার জন্য ওকে কী বলে–ফিনান্সার পাওয়া যায়। তাতে তথ্যচিত্র নির্মাতার দুটো পয়সা আসে।
যেভাবে পত্রিকা এবং টিভি সাংবাদিকরা আমাকে নিয়ে হুড়োহুড়ি করত আমি ভাবতাম যে অসম লড়াইটা আমি লড়ছি তার প্রতি একটা সহমর্মিতা থেকে এঁরা আসেন। এখন বুঝি আমরা যেরকম জঙ্গলে গিয়ে আমলকি হরিতকি বহেড়া মহুয়া ফুল কুড়িয়ে আনতাম, কারণ তার একটা বাজার মূল্য আছে। বেচে চাল ডাল কেনা যায়, এদের কাছে আমিও তেমনই একটা বিক্রয়জাত পণ্য। ঠিকঠাক বেচতে পারলে ওয়াইন আপেল খাওয়া যায়।
