আমি হাসাতে চেয়েছিলাম রাতুল হাসে না। এদের হাসতে নেই। এরা ইংরাজি যে সব স্কুলে পড়াশোনা করেছে সেখানে শুনি হাঁটা, হাসা, কথাবলা এমনকি জামা প্যান্ট পরা, চুল আঁচড়ানো সব শেখায়। মানুষকে একটা নিয়মনিষ্ঠ মেশিনী জীবনশৈলীতে অভ্যস্ত করে দেয়। চেয়ার টেবিল কাটা চামচ ছাড়া খায় না, চায়ে চুমুক দিলে শব্দ হবে না, হাসলে যেন দাঁত না দেখা যায়। কাঁদলে যেন চোখের জল গড়িয়ে না নামে।
বলে সে আপনাকে লিখতে হবে। ওখানে মাইনে কত পান? আপনি ওই কাজ ছেড়ে দিন। আমাদের পত্রিকায় যোগ দিন। এখন যা মাইনে পাচ্ছেন সেই মাইনেটা আমরা আপনাকে দেব! রাজি আছেন?
বলি–মাইনে হাজার পনের ষোল পাই।
মাত্র পনের হাজার। কিছুক্ষণ গুম মেরে থেকে বলে রাতুল–বেশ, এখন আমরা আপনাকে ওই মাইনেই দেব। পরে দেখব কতটা বাড়িয়ে দেওয়া যায়। কাল থেকে আপনি আমাদের অফিসে আসুন। কালকেই আমরা আপনার নামে এক লক্ষ টাকা সিকিউরিটি মানি জমা করে দেব। যদি আপনি আমাদের চাকরি ছেড়ে দেন তাহলে ওই এক লক্ষ টাকা আপনাকে ফেরত দিয়ে দিতে হবে। আর আমরা যদি আপনাকে ছাড়িয়ে দিই ছয় মাসের একটা নোটিশ দেব এবং আরও এক লক্ষ টাকা দেব। বলুন কী বলছেন?
বুক লাফাচ্ছে আমার। এতকাল ধরে তো এমনই একটা সুযোগের জন্য হা পিত্যেশ করে বসেছিলাম। আমি আর কিছু চাই না, শুধু দুবেলা পেট ভরে খেতে চাই, পরতে চাই দুএকটা সস্তার জামা কাপড়, আর চাই অসুখ হলে একটু সাধারণ চিকিচ্ছার মতো কিছু পয়সা। যে কাজ এখন করি এতে এসব হয়ে যায়। তবে কাজটা আর করতে পারছি না। শরীর আর দুবেলা অত আগুন তাপ কাজের চাপ নিতে পারছে না। অসুস্থ হয়ে পড়ছে। হাঁটু দুটো বড় বেগ দিচ্ছে। আট দশ ঘন্টা দাঁড়িয়ে কাজ করতে হয়। ব্যথায় হাঁটু বেঁকে আসে। সারারাত কনকন করে।
সবচেয়ে বড় কষ্ট লিখতে পারি না। মোটেই সময় পাই না। দুপুরে ঘন্টা খানেক রাতে ঘন্টা খানেক–এই মাত্র সময়। কোনো একটা লেখা শুরু করেছি কথারা মনে মাথায় গজগজ করছে। খাতার পাতায় নামার জন্য প্রসব বেদনায় ছটফট করছে–সেই সময় কলম নামিয়ে রেখে দৌড় মারতে হয় কর্মস্থলের দিকে। আগুনে ঝলসে পরিশ্রমে বিধ্বস্ত, বসের বাক্যবাণে বিদ্ধ ঈর্ষাতুর সহকর্মীদের নানাবিধ আক্রমণে আহত দেহ মন নিয়ে বাড়ি ফিরে তালাশ করে দেখি–সেইমনের মধ্যের কথারা মরে গেছে। কিছুতেই সেই ভাব-ভাবনা আসছে না, যা না এলে লেখাটায় প্রাণ প্রতিষ্ঠা হবে না।
সৌভাগ্যের দুয়ার খুলে গেছে। লক্ষ্মী সরস্বতী দু-বোন এসে দাঁড়িয়েছে দরজায়। ডাকছে আমাকে–আয় বাছা আয়। তোকে দত্তক নিলাম। আর তোর কোনো চিন্তা নেই।সব চিন্তা আমাদের। তুই শুধু লিখে যা নিশ্চিত মনে।
মনের আবেগ সংযত রেখে বলি রাতুলকে–আমাকে একটু ভেবে দেখতে সময় দাও ভাই। কয়েকটা দিন পরে তোমাকে জানাব।
পরের দিন দেখতে গেলাম ওদের অফিস। রুবি হাসপাতালের কাছে একটা অফিস–এটা ছোট, এখান থেকে পত্রিকা সংক্রান্ত সব কাজ করা হয়। দোতলার একটা ঘর দেখিয়ে আমাকে বলা হল–যেদিন যেদিন আপনি অফিসে আসবেন এইখানে বসবেন। এটা আপনার রুম।
যেদিন যেদিন আসব মানে! রোজ আসতে হবে না?
নিরাসক্ত গলায় বলে রাতুল–রোজ আসার কী দরকার! আপনি তো লিখবেন! বাড়ি বসেও লিখতে পারেন। লেখা শেষ হলে দিয়ে যাবেন। অসুবিধা থাকলে ফোন করে দেবেন, ড্রাইভার গিয়ে নিয়ে আসবে।
ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করি–কত লিখতে হবে মাসে?
বলে রাতুল–মাসিক পত্রিকা, মাসে একটা লেখা দেবেন। বিষয় আপনি নির্বাচন করবেন। তবে শব্দ সংখ্যা যেন পাঁচ ছশোর বেশি না হয়।
আমি কী এখন ধেই ধেই করে নাচব। মাসে মাত্র পাঁচশো শব্দ। এক একটা শব্দের দাম তিরিশ টাকা। তিরিশ টাকা। পাগল হয়ে যেতে ইচ্ছে করছে আমার। এমন জোরে চিৎকার করতে মন চাইছে যেন জীবনের সব ব্যর্থতা-উপহাস-অবজ্ঞার কানে তালা লেগে যায়। বোবা বধির হয়ে যায়। রাতুল আমাকে গাড়ি করে নিয়ে গেল সেক্টর ফাইভে ওদের সেই আই. আই. পি. এম. কলেজে। বিশাল এলাকা জুড়ে এগারোতলা ভবনের সবকিছু ঘুরে ঘুরে দেখাল। এতবড় প্রতিষ্ঠানের সম্মানীয় কর্মচারী হতে যাচ্ছি। ভেবে মনে দারুন গর্বের ঢেউ লাগল। আজ আমি এক রন্ধনশালার তুচ্ছ কর্মী। কেউ যাকে সাধারণ সৌজন্যটুকু পর্যন্ত দেখায় না। কাল থেকে আর তা থাকব না। আমিও হয়ে উঠব সম্মান আর সমাদরের পাত্র। গায়ে চিমটি দিলাম যা দেখছি যা শুনছি স্বপ্ন নয় তো!
বাড়ি ফিরে এসে সেদিন আমার সে কী উত্তেজনা। আনন্দে মনে হয় বুক ফেটে যাবে। নাহ? আর পিছনে ফিরে তাকাব না। চুলোয় যাক স্কুলের চাকরি পেনশন গ্র্যাচুইটি। সাতদিনের মধ্যে ইস্তফা দিয়ে দেব।
পরের দিন আমার এক দাদা শঙ্কর রায়কে বললাম যা যা ঘটেছে। সব শুনে সে বলে–দাঁড়াও চন্দ্রশেখরকে ফোন করি। চন্দ্রশেখরকে মলয় চৌধুরী ছেলের মতো ভালোবাসে। সব সে বলতে পারবে।
জানা গেল ইতিবৃত্তেচণ্ডাল জীবন বইখানা চন্দ্রশেখরকে দিয়েছে আমার বন্ধু বাপ্পা। চন্দ্রশেখরই সেখানা পৌঁছে দিয়েছে মলয় চৌধুরির কাছে। তার ভাবনায় ছিল মলয় চৌধুরি সাহিত্যের সমঝদার পাঠক। যদি বইখানাকে কোনো ছোটখাটো একটা পুরস্কার দিয়ে দেন লেখকের কষ্টকর জীবনের কিছু পরিবর্তন আসে। লোকটা বেঁচে যায়। বড় মানুষের ছোটটাও ছোট মানুষদের কাছে বিরাট বিশাল। জানত না চন্দ্রশেখর যে, পুরস্কার নয়, লেখককে চাকরি করতে বলবে সে।
