তা সেই মহাপণ্ডিত আম্বেদকর যখন রেহাই পায়নি শ্লেষ ঘৃণা বিদ্রূপ-বিরোধ থেকে আমি আর কোনো ক্ষেতের মুলো! না হয় লিখি দু-এক লাইন, তবে জাতে তো চাড়াল–ওই যাদের নমঃ বলে। আর করি তো রান্না বাসন মাজার কাজ। এসব মানুষ আবার মনুষ্য পদবাচ্য হয় নাকি। তাই অতিথিকে নিয়ে বড় সমস্যায় পড়ে যাই। কোথায় বসাবো।
আগে দু একবার দু একজন আমার অতিথিকে নিয়ে কর্মস্থলের মধ্যে কোথাও একটা কোণ খুঁজে নিরিবিলিতে বসেছি কোনো দরকারি কথা সেরে নেবার জন্য, আর তখনই কেউ একজন মোবাইল কানে দিয়ে উচ্চনাদে বার্তালাপ করতে করতে আমাদের পাশে পিছনে এসে দাঁড়িয়ে পড়বে। আর আমাদের অস্তিত্ব উপেক্ষা করে ফোনের অপর প্রান্তে থাকা ব্যক্তিটির সাথে খিস্তি খামারি শুরু করে দেবেন। সেই বচন কে শুনছে না শুনছে, ফোনের অপর প্রান্তে কেউ আছে কি না আছে, সেটা অন্য প্রসঙ্গ–তবে আমরা তো শুনি। কান ঝালাপালা করে বিরক্তি ধরে, আলোচনায় মনঃসংযোগ করতে পারি না। মনটা বিক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে, অতিথির সামনে লজ্জা লাগে।
আমি বলছি না যে ওরা পরিকল্পিতভাবে ঐসব করে। কেন করবে! করে কী লাভ। হতে পারে অকারণে আমি সন্দেহ করছি। তবে করে এবং সেটা ক্লান্তিহীন নিরবচ্ছিন্নভাবে। যেমন আমার সাইকেলের টায়ারে ব্লেড চলে পিন ফোটে, নজেল খুলে কোথায় চলে যায়। জলের বোতলটা হাত পা হয়ে হেঁটে চলে যায়। বাড়ি থেকে যে জামা প্যান্ট পরে এসেছি খুলে রেখে অন্য পোষাক পরে কাজে লেগেছি–সেই খুলে রাখা পোষাক হলুদ তেলে মাখামাখি হয়ে যায়। এই রকম কত কিছু যে হয় একটু চোখের আড়াল হলে।
তাই সেই সুবেশ তরুণকে বলি, কোথায় তোমাকে বসাবো ভাই। চলো গাড়ির মধ্যে বসেই কথা বলি।
বলে যে–আপনার বাড়ি এখান থেকে কতদূর? বাড়ি যাওয়া যায় না? বাড়িটাও একটু দেখার ইচ্ছা ছিল।
আমার সাইকেল সেখানে রেখে চেপে বসি তার মোটরকারে। মুকুন্দপুর থেকে আমার বাড়ি মাইল তিনেক দূরে। পথ বড় উবর খাবর। বর্ষায় এই পথের বড় বড় গর্তে জল জমে। বৃষ্টির সময় রাত সাড়ে দশটায় কাজ থেকে ফেরার পথে কতবার যে আছাড় খাই। তবে এক আধদিন লাভও হয়, একটা দুটো কইমাছ পাওয়া যায়। পাশের খাল থেকে কানে হেঁটে উঠে আসে রাস্তার মাঝের পুকুর ডোবায়।
এখন গর্ত আছে জল নেই। সেই শুকনো গর্ত ডিঙ্গিয়ে দুরমুশ করে গাড়িখানা কাতরে কাতরে পৌঁছাল আমার বাসস্থানে। বসতে দিলাম সেই কোর্টপ্যান্ট নাদুস তরুণ সম্পাদককে। পথে আসতে আসতে নাম জেনে নিয়েছি–রাতুল। বাড়ি তার বর্ধমানে।
বলে সে, মলয় চৌধুরির নাম শুনেছেন? দিল্লিতে থাকেন, উনি একটা টেকনিক্যাল কলেজ চালান। ভারতবর্ষে আঠারোটা কলেজ আছে বিভিন্ন প্রদেশে। এখানকার সল্টলেকেও আছে একটা। সম্প্রতি উনি একটি পত্রিকা বের করেছেন, যা দুই মেদিনীপুরে এখন বিনামূল্যে বিতরণ করা হচ্ছে। পোস্টারের মতো লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে দেওয়ালে। মূলত গ্রামীণ এলাকার পত্রিকা। আপনাকে লিখতে হবে এই পত্রিকার জন্য। এর জন্য কিছু পারিশ্রমিকও পাবেন।
কথায় কথায় সে জানায়–মলয় চৌধুরী টি একজন সাহিত্যপ্রেমী মানুষ। তিনি সাহিত্যিক রমাপদ চৌধুরিকে তার সাহিত্যকৃতির জন্য এক কোটি টাকা পুরস্কার দিয়েছেন। আফগানিস্থানের কোন এক লেখককে দিয়েছেন ছাব্বিশ লক্ষ টাকা আর মণিপুরের লৌহ মানবী শর্মিলা চানুকে দিয়েছেন একান্ন লক্ষ টাকা। জানাল রাতুল-স্বনামধন্য বিশাল বিত্তবান মলয় চৌধুরির পুত্রের নাম অরিন্দম চৌধুরি, যার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ইংরাজি ম্যাগাজিন সানডে টাইমস।
কিছুক্ষণ পরে জানতে চায় সে, বর্তমানে আপনি কি কাজ করেন? বলি–সেটা তো আমার ইতিবৃত্তে চণ্ডাল জীবন বইয়ে লেখা আছে।
অক্ষম গলায় জানায় রাতুল–বইটা আমি এখনও পাড়তে পারিনি, স্যার পড়েছেন। স্যারই আমাকে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পাঠিয়েছেন। আমি কালকেই দিল্লি থেকে ফিরেছি। উনি বলেছেন এইটা আর্জেন্ট তাই।
স্যার কে? মলয় চৌধুরী, না অরিন্দম চৌধুরী?
বাবা ছেলে দুজনের আলাদা আলাদা ব্যবসা। আমি মলয় চৌধুরীর প্রাইভেট সেক্রেটারি। ওনার সব কাজ আমিই দেখাশোনা করি। তাছাড়া উনি আমার মামা হন।
বইটা ওনার হাতে পৌঁছাল কী করে!
সে তো আমি বলতে পারব না। তবে ওনার খুব ভালো লেগেছে আপনার লেখা। উনিই চাইছেন আপনি আমাদের সাথে যুক্ত হোন।
বলি–আমি এক বোবাদের আবাসিক স্কুলে রান্নার কাজ করি। সকাল ছ’টায় কাজে যাই ফিরতে ফিরতে কোনো কোনোদিন দুপুর দুটো হয়ে যায়। আবার যাই সন্ধে ছ’টায়–ফিরতে কোনোদিন সাড়ে দশটা কোনদিন এগারোটা।
অবাক হয়ে বলে সে, তাহলে লেখেন কখন?
হেসে হেসে বলি–শিব্রাম চক্রবর্তীকে একবার এক সাংবাদিক ঠিক এই প্রশ্ন করেছিল। সকাল নটায় ঘুম থেকে উঠে শিব্রাম ভাত খাচ্ছেন দেখে বলে সাংবাদিক এত সকালে খাচ্ছেন? জবাবে বলে শিব্রাম সারারাত ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে খিদে লেগে গেছে। জানতে চায় সাংবাদিক খেয়ে কী করবেন? বলে শিব্রাম–খেয়ে ক্লান্ত হয়ে যাব তত তাই ঘুমিয়ে পড়ব। বলে সাংবাদিক ঘুমিয়ে উঠে খাওয়া–খেয়ে উঠে আবার ঘুম, সারাদিন যদি এই করেন তো লেখেন কখন? বলে শিব্রাম তার স্বভাব সিদ্ধ ভঙ্গিতে–কেন! তার পরদিন। আমারও সেই জবাব–লিখি পরের দিন।
