অতএব গুনে গুনে সাড়ে তিনশো বই দিয়ে দিল আমাদের। আর বই নেই? প্রশ্নের জবাবে হেসে সভাবে জানান–দু দশ খানা আছে। এটা তো সব প্রকাশকই করে..। আপনার সাড়ে তিনশো পেয়ে গেছেন তো! আমার কাছে কী আছে কী নেই সে দিয়ে আপনি কি করবেন!
ঠিকই তো। গৃহকর্তা রাখালকে গরু চরাতে দেয় মাস শেষে মাইনে দেবার চুক্তিতে। সে সারাদিন গরুকে ঘাস জল খাইয়ে দিনের শেষে গোয়ালে তুলে দিয়ে যাবার আগে মাঠের এক কোণে বসে খানিকটা দুধ যদি দুয়ে নেয় এতে অন্যায় হয় নাকি। যেমন গরু নিয়ে গেছে তেমনই তো ফেরত দিয়ে গেল। তবে ওই যে–জানলে গৃহকর্তার মনে কষ্ট হয়। পারলে রাখাল বদলে দেয়।
আমি আর বাপ্পা কলেজ স্ট্রীটে যাই–দেজ-এ বইয়ের গাদা দেখি আর অগুনতি পাঠকের ফোনে জানতে পারি রোজ বেশ কিছু বই বেচাকেনা হচ্ছে যার সিংহভাগ দেজ থেকে–যা আমাদের কাছে গোপন করে একা সব মধু খেয়ে নিচ্ছে মনোজদা। তখন আমরাও ভাবনা চিন্তা করতে থাকি কি করে তার হাত থেকে ওই সুযোগটা কেড়ে নেওয়া যায়।
এর একমাত্র উপায় সুন্দর শোভন স্বল্প দামে নির্ভুল একটা দ্বিতীয় সংস্করণ করে ফেলা। তাহলে প্রথম সংস্করণ আর এত বিক্রি হবে না যা এখন হয়ে চলেছে। এই বই নিয়ে চারদিকে যা মাতামাতি হয়েছে প্রকাশক পেতে আর কোনো অসুবিধা হবে না। আর এবার আমাদের টাকাও দিতে হবে না। পুঁজি লাগাবে প্রকাশক, লাভ ঘরে তুলবে সে। আমি পাবো শুধু রয়ালটি।
সেইভাবে চুক্তি করে দ্বিতীয় সংস্করণ করার ভার কলকাতা প্রকাশনকে দেওয়া হয়।ওরা বই ছাপে আর দেশ পত্রিকা আনন্দবাজার সহ নানা কাগজে বিজ্ঞাপন দেয়। ফলে নিম্নগামী বই বিক্রি আবার কিছু উর্ধমুখী হয়। বাংলাদেশ থেকেও বইয়ের অর্ডার আসে। যে দেজ পাবলিশার্স এন্ড বুক সেলার্স-এর সঙ্গে মনোজদার সুসম্পর্ক–সেই দেজ ফোন করে কলকাতা প্রকাশনের মানিক ফকিরকে বইয়ের অর্ডার দেয়।
সেই সময় একদিন মনোজদার স্ত্রী নন্দিতাদির ফোন এল আমার কাছে। এই সেই নন্দিতাদি–যার নামে ইতিবৃত্তে চণ্ডাল জীবনের পাতায় পাতায় সুখ্যাতি করেছি আমি। উৎসর্গেও তার নাম রয়েছে।
রাগত গলায় বলে সে-কাজটা কি ভালো করলেন মনোরঞ্জনদা।
–কোন্ কাজটা! অবাক গলা আমার।
–বইটা আমাদের কাছ থেকে তুলে নিয়ে অন্যকে দিয়ে দেওয়া?
বলি–আমি তো দিতে চাইনি। মনোজদা ছাপলেন না বলেই তো অন্য প্রকাশক খুঁজতে হল।
সে কি ছাপবে না বলেছিল?
না, তো বলেনি। বলেছিল টাকা দিলে ছাপবে। এখন যে বই এত ব্যাপক বিক্রি হল–সেই বই যদি এবারও লেখককে টাকা দিয়ে ছাপতে হয়–যখন বহু প্রকাশক বিনা টাকায় ছেপে দিতে উদ্গ্রীব–আমি কি করব বলেন তো? আবার দেনা করব?
গলায় একরাশ বেদনা ফুটে ওঠে। বলে নন্দিতাদি–আজ আপনার যে নাম খ্যাতি যশ–সে সব তো আমাদের জন্য। কুড়ি হাজার আপনি দিয়েছিলেন–কত টাকা আমরা বাকি রেখেছিলাম বলেন। যদি আমরা এই বই না ছাপতাম–কে আপনাকে চিনত। হাজার হাজার বই আপনার আমরা বিক্রি করে দিয়েছি। সে সব আপনি মনে রাখলেন না।
বেশ কৌতুক লাগে আমার। শোকে দুঃখে আনন্দে মানুষ প্রগলভ হয়ে ওঠে। বাক্ সংযম থাকে না। পেটের গোপন কথা বমি করে দেয়। যেমন এখন নন্দিতাদি দিলেন।
বলি তাকে–কুড়ি নয়, দু খেপে চল্লিশ হাজার টাকা দিয়েছি আমরা। আর হাজার হাজার নয়–আপনারা বই বিক্রি করেছেন একশোর কিছু বেশি–দেড়শোর কিছু কম।
কী বলছেন আপনি মাত্র দেড়শো!
মনোজদার হিসাবে তো তাই হয়। প্রথমে যে তিনশো ছাপা হয়েছিল তার একশো বত্রিশখানা আমাকে দিয়েছেন। পরের সাড়ে তিনশো তো সবটা আমরা নিয়ে আসি। ওনার কাছে বই থাকে হিসেব মতে একশো আটষট্টি খানা। তা থেকে কিছু যদি বিনা পয়সায় চলে যায় বাকি আর কত থাকে।
ট্রেড সিক্রেট বলে একটা কথা আছে। ব্যবসায়ীর সব গোপন কথা বউকেও বলে না। তাই হয়তো মনোজদা সব কথা নন্দিতাদিকে বলনি সাবধান করে দিলে ভালো করত। তা না করায় এখন গলগল করে সে যা বলে দিল–এতে ব্যবসার ওকে কি বলে–রেপুটেশান খারাপ হয়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে। সততা শব্দটার উপর ভুযোকালি পড়ে যায়।
মনোজদা পাশেই ছিলেন। তিনি নন্দিতাদির হাত থেকে মোবাইল নিয়ে আমাকে বলেন–পরের সব বই আপনারা নিয়ে গেছিলেন! আমার তো মনে হয় কিছু ছিল।
কত ছিল?
হিসেব করলে বলতে পারব।
বলি–আপনার হিসাব আপনার কাছে, আমার হিসাব আমার কাছে। দুই হিসাব কোনোদিন মিলবে না। আর এই অমিল হিসাব নিয়েই তো পৃথিবী জুড়ে এত সমস্যা। এই হিসাব নিকাশ নিয়েই তো আমার লেখালেখি।
ফোন কেটে গেল।
***
একটি সুবেশ যুবক একখানা দামি গাড়ি চেপে এক বিকেলে এসে উপস্থিত আমার কর্মস্থল–মুকুন্দপুরে। আসবে সেটা জানতাম। ফোনে কথা হয়েছিল। তাই কাজের সময়ের দুঘন্টা আগে বেলা চারটেয়, আমার ভাঙা সাইকেল চালিয়ে আমিও চলে এসেছি। বলেছিল কী যেন একটা পত্রিকা চালায়। লেখা চায়। এমনতো আজকাল কতই আসে। আর একজন আসবে–আসুক। লেখা একটা নেবে–দিয়ে দেব। তখন ঠিক জানতাম না–যে আসছে সে এত সুন্দর, এত দামি গাড়িতে চেপে এমন রাজবেশে আসবে। সরস্বতীর সাধক যে এমন লক্ষ্মীর বরপুত্র ভাবতে পারিনি।
এখন আমি তাকে নিয়ে বিষম বিব্রত, কোথায় বসতে দেব। আছে, আমার কর্মস্থলে সম্মানীয় মানুষদের বসার জন্য সুন্দর ব্যবস্থা আছে। গদি আঁটা চেয়ার, বনবন পাখা, ঠাণ্ডা জল, গরম চা সব কিছু আছে তবে তা ওই যে “সম্মানীয় অতিথিদের জন্য।” আমার অতিথি যে সেই মাপে ফিট বসে না। আম্বেদকর হতে পারে ডক্টরেট–তবু মাহার তো! তার যে আত্মীয়-অভ্যাগত সে আর কী হবে ছোট কোনো জাত ছাড়া? বর্ণবাদী দেশে এই যে মনোবৃত্তি আজও তার পরিবর্তন ঘটেনি। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতায় বুঝি এ মনোবৃত্তির বদল-মোলায়েম সাহিত্য দিয়ে হবে না। বর্ণবাদের কোমর ভাঙা মাওবাদী লাথি মারা দরকার। সে আর কে মারবে। বুদ্ধ, শ্রীচৈতন্যের মতো মার্কসবাদ লেনিনবাদকেও ব্রাহ্মণ্যবাদগিলে নিয়েছে। ফলে–ওই! অকারণ কান্না, হা-হুঁতাশ, আর ঘাড়গুঁজে কলম পেষা।
