দিন সাতেক পরে আবার গেলাম প্রিয়শিল্পতে। আবার সেই মিষ্টি হাসি সাথে মিষ্টি চা নোনতা বিস্কুট। বই পেলাম খান চল্লিশ। সাথে কোন এক কামচোর কর্মচারীর প্রতি অনুযোগ–এগুলোর যা অবস্থা আর বলবেন না। একদিন কাজে আসে তিনদিন আসে না। আরও তিন চারখানা বই পড়ে আছে। বাইন্ডিং হচ্ছে না। কথা দিয়ে কথা রাখতে পারছি না।
বললাম–দেজ-এ গিয়েছিলাম। দেখলাম ওখানে বই আছে।
তাড়াতাড়ি বলে মনোজদা–ওদের কটা বই দিয়েছি। ফোন করে চাইলেন। ওখান থেকে লাইব্রেরি পারচেজিং হয়। অনেক দূরে দূরে বই যায়।
আজকাল আমি দু-দশটা ইংরাজি শব্দের মানে জানি। প্রয়োজনে বলতেও পারি। তবে বলি, লজ্জা করে। লোকে কী না কী ভাববে। পারচেজিং মানে বিক্রি বোধহয়।
বলে মনোজদা দিন কয়েক পরে আসুন–বাকি বই পেয়ে যাবেন।
দিন কয়েক পরে আবার গেলাম। আরও গোটা কয়েক বই দিলেন। হিসেব করে দেখলাম সর্বমোট একশো বত্রিশখানা বই নেওয়া হয়েছে আমার। খান দশবারো বিতরণে গেছে বটে তবে বাকি বই বিক্রি করে যে কুড়ি হাজার ধার করেছিলাম শোধ দিয়ে অল্প কিছু লাভও পেয়েছি। বুকমার্ক আর দে বুক স্টোরকে তিরিশ শতাংশ কমিশন দিতে হয়েছে তবে আমি বা বাপ্পা আর অনন্তদা বিক্রি করেছি দুশো টাকা করে। এতেই টাকাটা উঠেছে।
ধরে নিচ্ছি দেজ পাবলিশার্স এন্ড বুক সেলার্স-এ আমরা কোন বইয়ের পাহাড় দেখিনি, ধরে নিচ্ছি মাঝে আর কোন বই ছাপা হয়নি। ছাপা হয়েছে মাত্র তিনশো–যা আগে কথা ছিল। তাহলে একশো বত্রিশোনা আমি নিলে বাকি একশো আটষট্টি খানা কোথায়?
খুব সুন্দর করে বুঝিয়ে বলে দেয় মনোজদা–ভবানী ভবন ন্যাশন্যাল লাইব্রেরী আর কোথায় না কোথায় আইন অনুসারে বই পাঠাতে হয়। খান তিরিশ এতে চলে গেছে। বাকি যা বই ছিল সেগুলো বিক্রি করে শোধ হয়ে গেছে সেই দেনা–যেটা আমার প্রকাশকের কাছে ছিল। মোটকথা–লাভ লোকসান সব সমান সমান। আমি তার কাছে আর কিছু পাব না, সেও পাবে না কিছু আমার কাছে। হিসাব বরাব্বর। লাখ টাকা লাখ টাকা দু কুড়ি দশ টাকা। এক কুড়ি তোর এক কুড়ি মোর, দশ গেল দশখাতে, না কিছু হাতে না কিছু পাতে।
কলেজ স্ট্রিটে বইয়ের হাহাকার তখনও চলছে। ফোনের পরে ফোন তখনও আসছে। বলি মনোজদাকে তাহলে তাড়াতাড়ি দ্বিতীয় সংস্করণ করে ফেলেন। প্রথম সংস্করণে বেশ কিছু বানান ভুল আছে। আছে দু একটা তথ্যে ভুল, সেটুকু সংশোধন করে।
বলে মনোজদা–এখন দ্বিতীয় সংস্করণ করার মতো সময় নেই। প্লেট, কভার সব রেডি আছে, যা ভুলটুল আছে–থাকুক। ওইভাবে কিছুবই ছেপেচাহিদার সামাল দেওয়া হোক। আগামী বই মেলার সময় বোর্ড বাইন্ডিং দ্বিতীয় সংস্করণ করা হবে।
ঠিক আছে, তাই হোক–
বই তো ছাপা হয়ে চলেছে, বিক্রিও হচ্ছে। লভ্যাংশ যা আসবার আসছে। বহু মানুষ আমার বই পড়ছে। শিলিগুড়ি ইন্দোর দিল্লি থেকে ফোন আসছে। পত্র পত্রিকায় আমার কথা লেখা হচ্ছে। টিভিতে অনুষ্ঠান করা হচ্ছে। এতেই আমার সন্তুষ্ট থাকা উচিত ছিল। বই ছাপা ব্যাপারটা প্রকাশকের উপর ছেড়ে দিয়ে আমার এখন লেখায় মনসংযোগ করে থাকলে ভালো হতো। সে সব না করে দ্বিতীয় সংস্করণ নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি। কী বিচ্ছিরি কাণ্ড!
বলে মনোজদা–দ্বিতীয় মুদ্রণ করার মত টাকা আমার কাছে নেই। একটা ফ্যালাট নিয়েছি সেখানে একগাদা টাকা গেছে। আমার শাশুড়ির অপারেশন হল। কী বলব। হাত একেবারে খালি। যদি আপনি কিছু টাকা দেন তাহলে পারি, নাহলে তো…।
আমার বন্ধু বাপ্পা, বন্ধু অন্তপ্রাণ। বলে সে, কত টাকা লাগবে আমি দেব। কত বই ছাপতে চান?
কম্পোজ, প্লেট সব তো করাই ছিল। হিসেব করে বলে মনোজদা কুড়ি হাজার হলে সাড়ে তিনশো বই হয়ে যাবে।
দে বুক স্টোর, আমি আর বাপ্পা এই কটা বিক্রি করে ফেলতে কোনো অসুবিধা হবে না, বুঝে বাপ্পা চেক লিখে দিয়ে জানতে চায় বই কবে নাগাদ পাবো?
বলে মনোজদা সপ্তাহখানেক লাগবে।
এরপর শুরু হল বাপ্পা আর আমার প্যারেড। পরের সপ্তাহে গিয়ে শুনি, বই হয়নি। বাইন্ডারের ঘর রিপেয়ারিং শুরু হয়েছে সেটা শেষ না হলে তো কাজ হবে না। পরের সপ্তাহে আসুন। পরের সপ্তাহে গেলে আবার সেই পরের সপ্তাহ। কাতর গলায় বলি তাকে–কী যে করি, লোকে বই বই করে আমাকে পাগল করে দিচ্ছে। সৎ উপদেশ দেয় মনোজদা-ওদের বলুন যেন দেজ থেকে বই নিয়ে নেয়। দেজে তো বই আছে।
দেজে বই আছে। কী করে? আমি ন্যাকা সাজি।
বলে মনোজদা–সেই যে দিয়েছিলাম না, সেই বই। কী মনোজদার হাতের জাদু! সেই কবে দুমাস আগে নাকি একশো মতো বই দিয়েছিল যা এখনও আছে। আর অনামা অখ্যাত বগুলার রেল স্টেশনের এক বই বিক্রেতা একাই নাকি চল্লিশ পঞ্চাশখানা বই দেজ থেকে নিয়ে বিক্রি করে দিয়েছে।
আমি আর বাপ্পা একদিন গিয়ে দেখি দেজের সেইবই পাহাড়–এখনও বিরাজমান। ব্যাপারটা কী? ব্যাপার হচ্ছে এই যে বই বাঁধাই হচ্ছে। সেখান থেকে সোজা এসে যাচ্ছে দেজ-এ। এখান থেকে চলে যাচ্ছে সর্বত্র। অনন্তদা খবর দিল শিলিগুড়ির সবচেয়ে বড় বইঘরে এখনও খান চল্লিশ বই শোভমান।
প্রায় দু আড়াই মাস ঘুরিয়ে শেষে একদিন ফোন করল মনোজদা নিয়ে যান বই। আপনার সব বই রেডি।
রাজনীতি ধর্ম সমাজ–সব কিছুতে জোয়ার ভাটা আছে। সলমান রুশদি-তসলিমার বই নিয়ে পাঠক মহলে কী উন্মাদনা হয়েছিল। এখন আর তো নেই। মানুষের স্মৃতি যেমন দুর্বল–মনও অস্থির। একটা বিষয় নিয়ে বেশিদিন ভাবতে পারে না–আটকে থাকে না। আমার বই নিয়ে যে উন্মাদনা এসেছিল সেটা এখন কিছুটা নিম্নমুখি। সেই ব্যাপক বেচাকেনায় একটু ভাটার টান। দু আড়াই মাস ধরে যে ঝড় চলেছে সেই ঝড়ের সব আম একা কুড়িয়ে ঝুলি ভরে নিয়েছে। এখন আমাকে বই দেওয়ায় বিশেষ অসুবিধা নেই। কুড়িয়ে কুড়িয়ে বই বেচে আসলটা হয়তো ঘরে আসবে লাভের গুড়ে বালি।
