বন্ধু বাপ্পা দায়িত্ব নেয় শহর কলকাতায়। কলেজ ষ্ট্রীট বই পাড়ায় ওঁর অনেক দিনের আসা যাওয়া, দে বুক স্টোরের মাধ্যমে কলকাতার পাঠকদের কাছে বই পৌঁছে দিতে অক্লান্ত পরিশ্রম করে সে।
সেবার কত বই ছেপেছিলেন মনোজদা? উনি নিজেই বলেছেন–“প্রকাশকরা কোনদিন সত্যি কথা বলে না, একটু এদিক সেদিক করেই থাকে।” অতি সৎ এবং সাহসী উচ্চারণ সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। তবে যদি কোনদিন এই সৎ সাহস নিয়ে সঠিক সংখ্যা বলে, জানা যাবে এই বই বিক্রির ধারে কাছে বহু পুরস্কারপ্রাপ্ত বেস্ট সেলারও ঘেঁসতে পারেনি।
বইখানা পাঠক সমাজে যে এতখানি সমাদৃত হবে প্রিয় শিল্প প্রকাশনের কর্ণধার মনোজ বন্দ্যোপাধ্যায় আগে বুঝে উঠতে পারেনি। সেটা বুঝলেন বই প্রকাশ হবার কয়েক দিনের মাথায় তিনশো কপি উড়ে যাবার পর। আগে জানলে একবারে কয়েক হাজার ছাপিয়ে ফেলত নিশ্চয়। তাতে খরচ অনেক কম পড়ল। বই প্রতি বেশি লাভ ঘরে আসত।
প্রথমবার বই ছাপা হয়েছিল মাত্র তিনশো। কুড়ি হাজার টাকা ধার দেনা করে প্রকাশকের হাতে তুলে দিয়েছিলাম আমি। কথা ছিল আর যে টাকা বাকি রইল বই পাবার পর বিক্রি করে সেই টাকা শোধ করে দেব। এক কথায় এই বই ব্যাপারে প্রকাশকের কোনো দায় দায়িত্ব থাকবে না। লাভ লোকসান সব আমার। সে পাবে শুধু তার ছাপাই বাঁধাই বাবদ ধার্য পারিশ্রমিক। আর কাগজের দাম কভারের খরচ।
প্রিয় শিল্প প্রকাশনার মনোজদা নিপাট ভদ্রলোক। কখনও রাগ করেন না। ভেবে চিন্তে ধীরে ধীরে হিসেব করে কথা বলেন। তা ছাড়া তিনি একজন সৎ মানুষ। তার একটা বড় গুণ-তিনি যে সৎ, সেটা গোপন করে রাখেন না। পাছে লোকে তার সততায় সন্দেহ করে বড় বড় অক্ষরে পোস্টার মেরে রেখেছেন প্রকাশনালয়ের দেওয়ালে–“অসৎ পথে হয়তো অর্থ উপার্জন করা সম্ভব, কিন্তু শ্ৰদ্ধা সম্মান অর্জন করা যায় না। সেই যে ব্যবসাদাররা দোকানে লিখে রাখে–সততাই মূলধন। যাতে কেউ তাকে অসৎ মনে না করে।
মনোজদা সৎ-চিরকাল তা-ই থাকতেন। তবে মানুষ তো মানুষইহয়। স্বর্গের দেব দেবতার পর্যন্ত বিচ্যুতি ঘটে যায় মানুষের ঘটবে এতে আর তেমন দোষ কোথায়? আসলে দোষ বা গুণ, সৎ বা অসৎ ভালো বা মন্দ এইভাবে মানুষকে চিহ্নিত করা দেগে দেওয়া যায় না। সব কিছু ঘটায় বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতি। পরিস্থিতির কারণে কাল যে মানুষ রত্নাকর আজ সে বাল্মীকি। কাল যে দানবীয় সুদীপ্ত আজ সে সিঁদকাটা সারদা প্রসাদ। মোজদার পা পিছলে যাবার পিছনেও রয়েছে। সেই বিশেষ পরিস্থিতি। যার সৃষ্টিকর্তা গৌতম রায়। তিনি যদি আনন্দ বাজার পত্রিকায় চণ্ডালের চোখে চণ্ডাল জীবন প্রতিবেদন না লিখতেন–এই অবস্থা আসত না।
সর্ব প্রথমে বইটা নিয়ে স্টেটস্ম্যান পত্রিকা প্রায় আধপাতা জুড়ে আমার বেশ বড় ছবি সহ প্রতিবেদন ছাপে, তারপর ছাপে টাইমস অফ ইন্ডিয়া। তবে তাতে বাঙালি পাঠক বিশেষ হেলদোল দেখায়নি। দেখালো আনন্দবাজারে প্রতিবেদন প্রকাশ হবার পর। বাপরে বনে যেন আগুন লেগে গেল। চারদিক থেকে ফোন আসতে লাগল আমার কাছে। বই চাই বই। পাঠক তো বটেই বই বিক্রেতাদেরও ফোনের বিরাম ছিল না।
এর আগে আমার যে কটা বই বের হয়েছে সব কটার যত্ন করে নাম ঠিকানা ফোন নাম্বার দিয়ে রেখেছিলাম। যদি কেউ চিঠি দেয়, ফোন করে। বইটা কেমন লেগেছে যদি বলে। ফোন বা কোন চিঠি আসেনি। কিছু কেউ বলেনি। তাই এবার রাগ করে কোন ঠিকানা কোন নাম্বার ইচ্ছে করেই রাখিনি। আর কি আশ্চর্য এবারেই অগুনতি ফোন। কী করে যে তারা আমার নাম্বার পাচ্ছে কে জানে। আমি যখন শত শত–যার নাম ঠিকানা বইয়ের পাতায় জ্বলজ্বল করে সে তাহলে কত শত ফোন পেয়েছে? দার্শনিকরা যেমন বোঝেন ধোঁয়া যখন দেখা যাচ্ছে আগুন নিশ্চয় আছে, প্রকাশক ফোনের তাণ্ডবে এমন নয় যে বুঝতে পারেনি জোয়ার আসছে।
বইখানা প্রথম প্রকাশ হয় ২০১২ বইমেলায়। মেলার প্রায় শেষ দিকে বই এবং বইয়ের লেখককে নিয়ে একটা ছোট্ট সংবাদ করে চ্যানেল টেন। তাতেই খান চল্লিশ বই হাওয়া। প্রিয় শিল্প বই মেলায় স্টল দেয় তাদের কী খবর আমি জানিনা। আমাকে তারা জানায়নি। ট্রেড সিক্রেট বলে কী একটা ব্যাপার আছে যে।
বই মেলা শেষ হবার অল্প ক’দিন পরে বোমাটা ফাটালেন সেই গৌতম রায়। অল্প কিছু বই ছিল আমার কাছে। সেক’খানা উড়ে যেতেই ছুটে গেলাম প্রকাশকের কাছে আমার বাকিবইগুলো দিয়ে দিন। সে তখন ঝড়ের আঁচ পেয়ে গেছে, আর কী দেয়? মিষ্টি করে হেসে ভদ্রভাষায় বলে–গোটা কুড়ি আছে আর তো নেই। নেই মানে বাইন্ডিং হয়নি। দিন সাতেক পরে আসুন। পেয়ে যাবেন।
এই সাত দিনের মধ্যে একদিন আমি আর আমার বন্ধু বাপ্পা কলেজ স্ট্রিটে গেছি–সে বুক স্টোরে বই দিতে। ফোনের পরে ফোন করছিল তারা–বই দাও বই দাও। দে বুক স্টোর থেকে এক একদিনে তিরিশ পঁয়ত্রিশ খানা বই বিক্রি হয়ে যাচ্ছিল। বই পৌঁছে দিতে দিতে পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম আমি আর বাপ্পা। তারা আগাম টাকা দিয়ে দিচ্ছিল। ফোন আসছিল বুকমার্ক থেকেও।
দে বুক স্টোর থেকে বেরিয়ে আমরা দুজন একটু ঢুঁ মারলাম দেজ-এ। বাপ্পার কী সব দু-একটা বই কেনার দরকার ছিল। দেজ-এ ঢুকে আমাদের চক্ষু চড়কগাছ। টাল মারা রয়েছে ইতিবৃত্তে চণ্ডাল জীবন। মনে হয় পাঁচশোর কম হবে না। এত বই। কোথা থেকে এল?
