২০১১ সালের জুন মাসে যেদিন প্রথম বর্ষার আগমন ঘটল, দারুণ দাবদাহের পর নামল শান্তির বারিধারা–সেদিনই পা পিছলে পড়ে গেলাম আমি। আমার কর্মস্থলে রান্না ঘরের তিনদিক খোলা। একটু বৃষ্টি সাথে একটু হাওয়া থাকলে আর কথা নেই, জলে ভিজে চুপচুপে। তাই পা হড়কে গেল, আর পড়বি তো পড় উনুনের পাশে। ধাক্কা লেগে কড়াই উল্টে গেল। ডিম সেদ্ধ হচ্ছিল শ দেড়েক। সব গরম জল ছলকে পড়ে গেল পেটের উপর। ফুট খানেক লম্বা ফুট খানেক চওড়া জায়গার চামড়া সেদ্ধ হয়ে খসে গেল। ফলে ভর্তি হতে হল মেডিকা হাসপাতালে।
এমনিতে আমার কর্মস্থলের যা লোকজন, এত ব্যয়বহুল চিকিৎসালয়ে আমাকে নিয়ে আসার কথা নয়। যতটুকু তাদের জানি, কোনো সরকারি হাসপাতালে নিয়ে ফেলে আসার কথা। কিন্তু তখন পশ্চিমবঙ্গে পরিস্থিতি বড় ভয়াবহ। চারদিকে পরিলক্ষিত হচ্ছে একটা পরিবর্তন। লোকসভার ভোটে পরিবর্তনপন্থীদের বিরাট বিজয় ঘটে গেছে। সেই পরিবর্তনের পক্ষের বহু বিদ্বৎজন–গণসংগঠন আমাকে চেনে, জানে। অনেকে এটাও জানে যে আমার বিরুদ্ধবাদীরা আমার ক্ষতি করার চক্রান্তে লিপ্ত হয়েছে। এই অবস্থায় আমি মারা গেলে একটা ঝড় উঠবে। সে ঝড় সামলানো মুশকিল। আমার যারা বিরুদ্ধ পক্ষ–তারা বোকা নয়। তারা সবটা না জানলেও এটা জানে–আমার শেকড় অনেক শক্ত। তাই তারা ধাক্কা মেরে তাড়িয়ে দিতে পারেনি।
আর তাই ওই আতঙ্ক থেকেই মেডিকায় ভর্তি করে দেয়। প্রতিদিনকার চিকিৎসায় ব্যয় যেখানে প্রায় দশ হাজার। নয় দিন থাকতে হয় আমাকে ওখানে।
এরপর বাড়ি এসে আরও দেড় মাস। এই দেড় মাসকেও কাজে লাগাই আমি। লেখা সম্পূর্ণ হয়ে যায় আমার আত্মজীবনী পৃষ্ঠার সংখ্যা দাঁড়ায় সাত আটশো। ফোন করে সেই প্রকাশককে জানাই–দাদা লেখাটা শেষ করে ফেলেছি। ভেবেছিলাম সংবাদটা জেনে উনি আনন্দে উদ্বেল হয়ে উঠবেন, হল উল্টো। একেবারে নিরাসক্ত নিস্পৃহ গলায় জবাব দিলেন–দেখছি কী করা যায়। আমি যেদিন বলব পাণ্ডুলিপি দিয়ে যাবেন। পড়ে আপনাকে জানাব।
দিন যায় মাস যায় তিনি কোনো উদ্যোগ নেন না। মাঝে মাঝে ফোন করি, একই জবাব পাই, কবে পাণ্ডুলিপি দিয়ে যাবেন আমি আপনাকে বলব। লেখাটা লিখেছি জয়ন্তদার কথায়, ওনাকে ফোন করি–কী হবে দাদা, লেখাটা কী ছাপা হবে না? কুণ্ঠিত গলায় বলেন তিনি–উনি তো আর আগের মতো ‘অধীর’ নেই। বিশ্বাস হচ্ছে না যে ছাপবেন।
জয়ন্তদার কথায় আমার এতদিনকার সব আশা যেন ‘গাঙচিল’ হয়ে উড়ে পালায়।
.
পাঁচ ছয় মাস কেটে গেল-বিশ্বাসী প্রকাশকের কোনো সাড়া না পাওয়ায় মনটা ভেঙেচুরে খানখান হয়ে গেল। জীবনের প্রতি পদে মানুষের বিশ্বাসহীনতা অসহযোগ দেখে দেখে মনে যে ধারণা গড়ে উঠেছিল আর একবার যেন সেটাই প্রমাণিত হল–মানুষকে বিশ্বাস করা পাপ যদি নাও বা হয়–অবশ্যই বোকামো।
মানুষ আমাকে সহযোগিতা দেবে না, সাহায্য করবে না এগিয়ে যেতে, তাহলে আমি কী করব? বসে বসে কাঁদব? ছিঁড়ব মাথার চুল? না, এসব করলে তো হেরে গেলাম। আমার যুদ্ধ তো এই সামাজিক অবজ্ঞা অসহযোগিতা–এই সবের বিরুদ্ধেই। হারা আমার চলবে না।
আবার আগুন হলাম আমি–নিশ্চিন্ত পরাজয়ের বিরুদ্ধে। যেভাবেই হোক আগামী বইমেলায় অবশ্যই প্রকাশিত হবে ইতিবৃত্তে চণ্ডাল জীবন। আমার আত্মজীবনী। এখন এটাই আমার লড়াই। এক মাত্র লড়াই। সামনে আছে তিরিশ চল্লিশ দিন। এর মধ্যে সব কিছু করে ফেলতে হবে….।
আমার তিনখানা বই যিনি ছেপেছেন কথা বললাম সেই প্রিয়শিল্প প্রকাশনার মনোজদার সাথে। বলেন তিনি পারি, পারব। অবশ্যই বইমেলায় বই বের হবে। তবে আর্থিক দিক থেকে আমি খুব দুর্বল, টাকার দায়ভার আপনাকেই বহন করতে হবে। যা পাণ্ডুলিপি হিসাব করে দেখলাম কমপক্ষে পঞ্চাশ ষাট হাজার দরকার। এত টাকা যোগাড় করা কঠিন। তাই লেখাটাকে দুভাগ করে ফেললাম। জন্ম থেকে নানান পথ ঘুরে বহু ঘটনা দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে দুহাজার সালের দোরগোড়ায় অর্থাৎ শেষবার ছত্তিশগড় ঘুরে এসে প্রতিবন্ধী স্কুলের কাজে ঢোকার ঠিক আগের মুহূর্ত–এইটুকু থাকে প্রথম ভাগে।
মূল বিষয় ওটা-তবে শেষ ভাগ থেকে সংক্ষিপ্তাকারে কিছু তথ্য বক্তব্যও ওতে রেখে দেওয়া হয়। ভয় ছিল প্রথম ভাগ কোনোভাবে কষ্টেসৃষ্টে বের হবার পর যদি আর শেষভাগ বেরই না হয়। মানুষের জীবন অনিশ্চিত, কত কী ঘটে যেতে পারে। যদি আমার কিছু হয়ে যায়।
ইতিবৃত্তে চণ্ডাল জীবন, আমার লেখা আমারই জীবনী বটে তবে বইটি প্রকাশিত হবার পর আর আমার থাকেনি। এটা যোগেশচন্দ্র চৌধুরী কলেজের অধ্যাপক জয়দীপ ষড়ঙ্গী, চেতনা লহর পত্রিকা সম্পাদক অনন্ত আচার্য আর আমার বন্ধু বাপ্পাদিত্য ভট্টাচার্য এদের হয়ে যায়। বইটির শুভাশুভ বিষয়ক সব দায় দায়িত্ব এই তিনজন ভাগ করে নেয়।
জয়দীপবাবু নিয়ে নেন প্রচারের দায়িত্ব। ওনারই উদ্যোগে ইংরেজি স্টেটসম্যান, টাইমস্ অফ ইন্ডিয়া, হিন্দি পত্রিকা প্রভাত খবর ‘ইতিবৃত্তে চণ্ডাল জীবন’ এবং তার লেখককে নিয়ে সংবাদ পরিবেশন করে বিশালাকারে। টিভি চ্যানেল এন.ই. বাংলা স্টুডিওতে নিয়ে গিয়ে আধ ঘন্টার এক অনুষ্ঠান করে।
আর অনন্ত আচার্য এই বইকে ব্যাগে ভরে কাঁধে করে পৌঁছে দিতে থাকেন ভারতবর্ষের এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্তে। আনন্দবাজার পত্রিকার গৌতম রায়ের কাছে তিনি বই পৌঁছে দেন। তার ফলে গৌতমবাবুর লেখা “চণ্ডালের চোখে চণ্ডাল জীবন” প্রতিবেদন লেখা হয়। ওনারই প্রচেষ্টায় দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে যায় আমার জীবন কাহিনী।
