আমাদের অসহায়তার কথা শুনলেন ডাক্তার জয়ন্ত দাশগুপ্ত। বুঝলেন এক দরিদ্র কলমকারের অক্ষমতা। আর সেই সদ্য চেনা ডাক্তার শোনা যায় ডাক্তারেরা রোগী দেখেন ফিস্ এর জন্য, উনি এক রোগীকে ফিস্ দিলেন। পাঁচশো টাকা।
পরে সে টাকা ফিরিয়ে দিতে চেষ্টা করেছিলাম। উনি নেননি। বাধ্য হয়ে কটা বই দিয়েছিলাম আমার লেখা না কোনো ঠুনকো কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ওই মানুষটির মহত্বকে ছোট করব না। এই সব মানুষ আছে বলেই আমি আমরা বেঁচে আছি এইহিংস্র মানব সমাজে।না হলে কবেই ‘ছিলাম’ হয়ে যেতাম।
এই রোগটির ফলে প্রায় দেড় দুমাস পড়ে ছিলাম বিছানায়। এই সুযোগে আমার লেখাটাকে অনেকটা এগিয়ে নিয়ে যেতে পারলাম। সেটাই আমার একটা বড় কাজ হয়ে গেল।
এরই কিছুদিন পরে আমার ডান চোখে সমস্যা দেখা দিল। চশমা তো দশ বছর আগে ধারণ করেছি, মনে হল চোখটা একবার পরীক্ষা করিয়ে চশমাটা বদলে নিলে সমস্যাটা কেটে যাবে। আমার স্ত্রী অনু সেক্টর ফাইভে শঙ্কর নেত্রালয়ে তখন কাজ করত এক ঠিকেদার সংস্থার অধীনে।
তখন ওর নাম শঙ্কর নেত্রালয়ই ছিল। শঙ্কর নারায়ণ নেত্রালয়। পরে নারায়ণ ওখানে রয়ে যায় শঙ্কর চলে আসে মুকুন্দপুরে।
অনু বলল–এই শঙ্কর নারায়ণ নেত্রালয়ে গিয়ে চক্ষু পরীক্ষা করাতে। সে সাথে নিয়ে যাবে সাথে নিয়ে আসবে। চক্ষু পরীক্ষা আর ডিউটি একসাথে হয়ে যাবে। তাই গেলাম সেখানে।
অনু ওখানে কাজ করে। কোন্ ডাক্তার কেমন সে তা জানে। বলে সে, ভিনিত স্যারকে দিয়ে চোখটা দেখিয়ে নেব। একজন দু’জন নয়, দশজন পুরানো রোগী বলল-ভিনিত ডাক্তার মানুষ নয়-ভগবান। যদিঅন্ধকে ছুঁয়ে দেয় তো চক্ষুস্মান হয়ে যায়। পৃথিবীতে এমন ডাক্তার দু’দশজনের বেশি নেই।
তীর্থস্থানে গেছি, মন্দিরে গেছি। কোনদিন ভগবান দেখিনি। কী করে দেখব! উনি যে শঙ্কর নারায়ণ নেত্রালয়ে এসে বসে আছেন। ভগবান আমার চক্ষু পরীক্ষা করে বলে দিলেন–ছানি পড়েছে। অপারেশন করতে হবে এবং সেটা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব?বললেন তিনি–আমি আগামী মাসে ক্যালিফোর্ণিয়া চলে যাব। তাই কাল অথবা পরশু করিয়ে নাও।
অনু এই হাসপাতালের কর্মী। খোঁজ নিয়ে কথা বলে জানল সে–অন্য কেউ হলে যত কম হোক হাজার তিরিশ লাগবে। তার বেলা সেটা কমে পনের হাজার হতে পারে। এর কমে কিছুতে হবে না।
দুদিন কেটে যেতে তৃতীয় দিন ডাক্তার ভিনিত লোক পাঠিয়ে আমার স্ত্রীকে ডাকিয়ে আনলেন–কী হল ‘বেটা’। অপারেশনটা করিয়ে নিলে না! আই হেল্থ তো ভালো নেই।
বলে অনু, কী করে করব স্যার। হাসপাতাল যে টাকা চায়।
তোমার কাছে টাকা চেয়েছে!
হ্যাঁ স্যার।
কত?
পনের হাজার। এত টাকা কোথায় পাবো!
কিছুক্ষণ ভেবে নিজের পকেট থেকে এক হাজার টাকার একটা নোট বের করে অনুর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলেন তিনি–এটা কাউন্টারে জমা করে দিয়ে বলবে, আমি আর দিতে পারব না। ওরা কী বলে আমাকে এসে জানাও।
একটু দ্বিধা নিয়ে বলে অনু–আপনার টাকা নেব না স্যার। আপনি কেন দেবেন! যদি পারেন একটু ওদের বলে দিন। কিছু কম করুক। ডাক্তার স্যার কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ফের বলেন-কাল পেসেন্ট নিয়ে এসে নাম লিখিয়ে দাও। অন্য যা আমি বুঝে নেব।
পরের দিন গিয়ে ভর্তি হলাম শঙ্কর নারায়ণ নেত্রালয়ে। দুপুর দুটো নাগাদ অপারেশন হয়ে গেল। ও.টি-তে যেসব আয়া কাজ করে আমাদের পরিচিত। বলে তারা ভিনিত স্যার কী যত্ন নিয়ে যে অপারেশনটা করল কী বলব। শুনলাম, যে লেন্সটা লাগানো হয়েছে আমার চোখে, ওটার দাম বারো হাজার। কিন্তু কী কারণে জানি না আমাদের একটাও পয়সা লাগল না।
কয়েকদিন পরে আবার আর একবার গিয়ে চক্ষুর ব্যান্ডেজ খুলিয়ে চক্ষু পরীক্ষা করিয়ে আসতে হল। পরীক্ষা ওই ভিনিতস্যারই করলেন। বললেন–ও,কে। তারপর পাঠালেন আর এক অন্য ডাক্তারের কাছে। তিনি চক্ষু পরীক্ষা করে চশমার পাওয়ার দিলেন। সেই কাগজখানা আমাদের কাছ থেকে চেয়ে নিলেন ভিনিত স্যার আর অনুকে বললেন–চশমা হাম লেকে রাখেংগে, তোম হামসে লে জানা বেটা।
দিন কয়েক পরে সেই চশমা অনু নিয়ে আসে। অপারেশন ওষুধ চশমা—সব ব্যাপারটাই হয়ে গেল বিনামুল্যে—ভগবানের দয়ায়। সেই ভগবানের নাম ভিনিত স্যার।
চোখ অপারেশন হয়ে বাড়ি এসে শুয়ে বসে সময় কাটানো–এই সময়কালটার মেয়াদ এক মাসের কিছু বেশি। ডান চোখে পট্টি কিন্তু বাঁ চোখ তত ভালো। সেই চোখে পুরাতন চশমা বেঁধে লিখতে শুরু করি আত্মজীবনী। যেখানে থেমে গেছিল সেইখান থেকে। অনু চেঁচায়–কঁচা চোখ। ঘাড় গুঁজে লিখছো, চোখে রক্ত উঠে যাবে।কানা হয়ে যাবে তুমি। সারা জীবন তো লিখছো। ওসব ছাইপাঁশ লিখে কী হয়েছে। চেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে। কিচ্ছু হবে না তোমার ওই খুন্তি নাড়া ছাড়া। চোখ গেলে সেও পারবে না। সব মরব না খেয়ে।
কিছু হবে না সে আমিও জানি। একটা গাছ কত বড় হবে সে তো তার বীজের মধ্যে গুপ্ত হয়ে থাকে। হাজার চেষ্টা করেও বেগুন চারাকে কী বটবৃক্ষ বানানো সম্ভব! তবু মনকে যে কিছুতে বোঝাতে পারি না। কিছুতেই যে সে পাগল বুঝ মানতে চায় না। বলে শুয়োপোকা যদি প্রজাপতি হয় আমি কেন পারব না আমার পা-কে পাখনা বানিয়ে উড়ে যেতে।
ভাবি, যে কাজ করি সে আর খুব বেশিদিন পেরে উঠব না। আমার শত্রুপক্ষের তাড়াতে হবে, এমনিতে শরীর অচল অক্ষম হয়ে পড়বে। তখন তো ভিক্ষে ছাড়া গতি নেই। যায় যদি তো যাক–সাধারণ ভিখারির চেয়ে অন্ধ খঞ্জ মানুষের দয়া বেশি পায়। তবু লেখাটা শেষ করি। একজন প্রকাশক যখন পাওয়া গেছে। মানুষ তো মানুষই হয়, আজ যে উৎসাহ দেখাচ্ছে কাল যদি মতিগতি বদলে যায়। সেই যে মেয়েটা যে একজনকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল-বাবু তোমাকে আমি প্রেমিকের মতো ভালোবাসি, সে পরে আর একদিন তার মুখের সামনে দরজা বন্ধ করে অন্য বাবুকে ঘরে বসিয়ে নেয় না। তাই দ্রুত হাত চালাই। মোহ কেটে যাবার আগে লেখা শেষ করে দিয়ে অন্ধ হবার আগে বইটা দেখতে চাই।
