কে যেন বলেছেন-যদি তুমি কোন কিছু আন্তরিকভাবে চাও, সমস্ত মহাবিশ্ব সেটি তোমার কাছে পৌঁছে দিতে সক্রিয় হয়ে উঠবে। ঠিক জানিনা আমি আন্তরিক ভাবে একটু লেখার সময় সুযোগ চেয়েছিলাম কিনা, কিন্তু অবাক হয়ে দেখলাম মহাবিশ্ব সক্রিয় হয়ে উঠেছে সেটি আমার নাগালে এনে দিতে। হঠাৎ আমার জন্ডিস হয়ে গেল। এরই নাম ভাগ্য। সারা জীবনে কত অখাদ্য কুখাদ্য পচা বাসি খেয়েছি, কোনোদিন কিছু হয়নি। সেদিন এক গেলাস জল খেয়ে শুয়ে পড়তে হল বিছানায়।
জন্ডিস এত অতি তুচ্ছ রোগ। ছোটবেলায় দেখেছি আমাদের ক্যাম্পে কারও জন্ডিস হলে ওঝা একটা মালা পরিয়ে রুগীকে শুইয়ে রাখে, দিন কয়েক পরে সে ভালো হয়ে যায়। এই প্রথম। শুনলাম যে এটি একটি এমন রোগ যে, ধরলে আর রক্ষা নেই।
এমনিতে আমি নিজেকে যথেষ্ট সাহসী বলে মনে করি। কিন্তু যারা আমাকে ভালোবাসে জীবিত দেখতে চায়, তাদের চোখে মুখে, চাল চলনে, কথাবার্তায়, তৎপরতায় ভীষণ ভীতি কামড়ে ধরেছিল আমার সাহসের ভিত্তিমুল। মনে হচ্ছিল এবার আমি যাচ্ছি।
একদিন এক সকালে একটা ফোন এল আমার মোবাইলে ফোন করেছেন জয়ন্তদা-কী হল মনোরঞ্জনদা? আপনাকে যে বলেছিলাম জীবনীটা লিখে ফেলুন কতদূর কী করলেন?
জবাবে বলেছিলাম–দাদা, এখনও ওটায় হাত দিতে পারিনি। শরীরটা একটু খারাপ। সেরে উঠেই লেখাটা নিয়ে পড়ব।
কী হয়েছে?
কিছু না। এই একটু জন্ডিস।
চমকে উঠলেন তিনি কী বললেন। একটু জন্ডিস? যার নাম জন্ডিস সেটা একটু হয় কী করে! খুব সাবধান, একদম হেলাফেলা করবেন না। রোগটা কিন্তু মারাত্মক।
এরপর যা হল সে আর বলার নয়, জয়ন্তদা থেকে মধুময় পাল, মধুময় পাল থেকে বাবলাদা, বাবলা দা থেকে সন্দীপদা, সন্দীপদা থেকে যোগেন দা, যোগেনদা থেকে অলকাদিদি, অশোকজি, কাজলদাসের পুরো টীম খবর পেয়ে গেল মনোরঞ্জন মারাত্মক অসুস্থ। আর যায় কোথায়, সবাই প্রায় পাগলের মতো ছুটে আসতে লাগল–দূর দুর্গম পথ পেরিয়ে ক্ষুদেরাবাদে –আমার বাসায়, আর্থিক সহায়তা নিয়ে। তাদের কষ্ট দেখে আমারই কষ্ট হতে লাগল অসুখের কষ্টের চেয়ে অধিক। প্রায় পঁচাশি ছিয়াশি বছরের বৃদ্ধ অসুস্থ অশোকজি তিনিও এসেছেন আমাকে দেখতে। মনটা কৃতজ্ঞতায় নুয়ে গেল আমার
আমাদের এলাকায় কোনো ভালো ডাক্তার নেই। সবাই হাতুড়ে, আমার শুভানুধ্যায়ী-আত্মজনদের আশঙ্কা এই চিকিৎসায় সেরে ওঠা কঠিন। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া উচিৎ। প্রচুর টাকা খরচ হচ্ছে বটে এতে কাজের কাজ হচ্ছে না।
আমি ঠিক জানি না কে যেন আমার খবর ফোন করে মহাশ্বেতা দেবীকে জানিয়ে দেয়। তিনি ফোন করেন আমাকে–কী তোর জন্ডিস হয়েছে নাকি! দেবপ্রিয় মল্লিককে ফোন কর। হাসপাতালে ভর্তি হয়ে যা।
যে ফোন নাম্বার তিনি দিয়েছিলেন সেটায় ফোন করে পেয়ে গেলাম ডাক্তার দেবপ্রিয় মল্লিককে। বলেন তিনি, পিজিতে চলে যাও। তারপর দেখছি।
ওনার কথামত পরের দিন সকালে পিজি হাসপাতালে পৌঁছে আবার ফোন করলাম ডাক্তার মল্লিককে–পৌঁছে গেছি। তিনি অন্য এক ডাক্তারের নাম বলে তার সঙ্গে দেখা করতে বললেন। একজনকে জিজ্ঞাসা করলাম-বলতে পারেন অমুক ডাক্তারকে পাবো কোথায়?
বলেন তিনি–সে তো আসেনি। তার কাছে কী দরকার?
বলি–ডাক্তার দেবপ্রিয় মল্লিক দেখা করতে বলেছেন। সেই অচেনা ভদ্রলোক–ডাক্তারই হবেন হয়তো নিজেই আমাকে নিয়ে গেলেন আর এক ডাক্তারের কাছে, পরে জেনেছি উনি ডাক্তার জয়ন্ত দাশগুপ্ত। সেই অচেনা ডাক্তার বলেন ডাক্তার জয়ন্ত দাশগুপ্তকে, একে ডাক্তার দেবপ্রিয় মল্লিক পাঠিয়েছে, একটু দেখুন।
কে দেবপ্রিয় মল্লিক!
জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের ভাই।
আমি তাকে চিনি?
খুব ভালো করেই চেনেন।
এবার ডাক্তার জয়ন্ত দাশগুপ্ত আমাকে জিজ্ঞাসা করেন উনি আপনাকে কী করে চেনেন?
বলি–আমি ওনাকে ঠিক চিনি না। মহাশ্বেতা দেবীর চেনা। মহাশ্বেতা দেবী আমার চেনা।
ডাক্তার মল্লিক যেন গোলক ধাঁধায় পড়ে গেলেন। কে তো তিনি বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে উঠতে পারছিলেন না, যে, আমার মতো খসখসে চোয়াড়ে চেহারার লোককে নিয়ে তার পরিচিত এক ডাক্তার এমন ব্যক্তিগত উদ্যোগ কেন নিচ্ছেন। যা হোক, খুঁজতে গিয়ে জানতে পারলেন যে একভাই রাজনেতা একভাই ডাক্তার এমন একটা ঘটনাক্রমের সাথে আমার কোন যোগসূত্র আছে। সেটাই তার মনোযোগ আকর্ষণের কারণ। কিন্তু এখন যা শুনলেন তা যেন কোন কিছুর সাথে মিল খাচ্ছে না। মেলানো যাচ্ছে না।
বলেন–মহাশ্বেতা দেবী আপনার চেনা। কী করে চেনেন ওনাকে?
বলি–আমি ওনার পত্রিকা ‘বর্তিকা’-য় লিখি।
আপনি লেখক।
ওই আর কী! একটু আধটু লিখি।
কী লেখেন?
গল্প উপন্যাস।
বর্তিকাতেই লেখেন, নাকি…।
বর্তিকা দিয়েই লেখার শুরু, তবে পরে আরও বহু পত্র-পত্রিকাতে লিখেছি। চারখানা বইও বের হয়েছে আমার।
এরপর তিনি আমাকে পরীক্ষা করলেন, ডাক্তারি পরিভাষায় যাকে ডায়গনোসিস বলে। তারপর আমার স্ত্রীর হাতে একটা কাগজ ধরিয়ে দিলেন–ব্লাড টেস্ট করতে হবে। আর আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন–ভর্তি হবেন? ভর্তি হলেই ভালো হবে।
দেবপ্রিয়বাবু ভর্তির কথাই বলেছিলেন। তাই সায় দিলাম আমি। অল্প সময়ে সে পর্ব মিটে গেল। তারপর কী যে একটা ঘটল আজ আর তা মনে নেই-সম্ভবত রক্ত পরীক্ষা। আগে বার পাঁচেক রক্ত পরীক্ষা হয়ে গেছে। গাদা গুচ্ছের টাকা গেছে তার পিছনে। ফের রক্ত পরীক্ষার প্রয়োজন পড়বে–একগাদা টাকা লাগবে, এর জন্য প্রস্তুত ছিলাম না আমরা। কাছে টাকা ছিল না।
