এরপর যা হবার তাই হল। পরের দিন থেকে সে আমার সবকাজে খুঁত ধরতে লাগল। আমি তরকারি ধুলে তাতে বালি থাকে, মশলা বাটলে মিহি হয় না, রুটি সেকলে হয় পুড়ে যায় নয় কাঁচা থাকে। সে নিয়ে তর্ক করলে গালে চড় এসে পড়ে। এত অসন্তুষ্টির কারণ আমার জানা। তবে তা দূর করা আমার সাধ্যের বাইরে। তাই একদিন নিশ্চিন্ত আহার আশ্রয় ছেড়ে পথের মানুষ পথের উপর এসে দাঁড়ালাম আবার। সেই পথঘাট সেই গাড়িঘোড়া লোকজন সেই হাওড়া ব্রিজ সেই গঙ্গা সব একই আছে, শুধু আর একটু বড় হয়ে উঠেছি আমি, আর একটু অভিজ্ঞ।
.
এবার আবার ফিরে এসে আশ্রয় নিলাম সেখানে, যেখানে সব আশ্রয়হীন মানুষ আশ্রয় নেয়। চোর পকেটমার বেশ্যা পাগল ভবঘুরে ভিখারি মাতাল মুটে মজুর আরও বহু বিচিত্র সব মানুষের মিলন মেলা এখানে। এর নাম রেল স্টেশন। ভারি বোঝা বইবার মত শক্তি নেই, সারা দিনে হালকা পলকা এক আধটা মোটফোট বয়ে দুচার পয়সা পেয়ে গেলে তা দিয়ে মুড়ি আলুর দম, রুটি ঘুগনি খেয়ে পড়ে থাকি প্লাটফর্মে। এভাবেই কেটে যায় দিন মাস।
একদিন স্টেশনেই পরিচয় হল ঠিক আমারই মত একটা ভবঘুরে বাউন্ডুলে ছেলের সাথে। আমার চেয়ে বছর চার পাঁচ বড়, রোগা লম্বা কালো এই ছেলেটা মনের কষ্ট পেটের খিদে সবকিছু চেপে রেখে অসম্ভব হাসতে জানে। একে দেখেই ভালো লেগে গেল আমার। বিশ্বাস জন্মে গেল। কথায় কথায় জানাল ও আসাম যাবে। সেখানে নাকি কাজের কোন অভাব নেই। আর তার মজুরি নাকি এখানকার চেয়ে তিনচারগুণ বেশি।
আমার টাকা চাই, অনেক টাকা। বাবার চিকিৎসা করাতে হবে। মাকে বস্ত্র পরিয়ে দিনের আলোয় ঘরের বাইরে আনতে হবে। ভাইবোনকে মৃত্যুর করাল গ্রাস থেকে বাঁচাতে হবে। এর জন্য টাকা চাই। আমার তখন আর সুস্থ মাথায় ভাবনা চিন্তার অবকাশ কোথায়! তৃষ্ণার্ত মানুষ যেমন জল ভেবে মরীচিৎকার দিকে পাগলের মত ছুটে যায় আমিও ছুটে গেলাম সেই সদ্য চেনা ছেলেটার পিছনে–আমিও তোমার লগে আসামে যামু।
আমার কাছে বিষ খাবার মত পয়সাও নেই। পরিধানে নেই কোন ভব্যপোষাক, পেটে নেই জল ছাড়া অন্য পদার্থ। সেই দূরদেশে আপন বলতেও কেউ নেই যে বিপন্ন সময়ে পাশে এসে দাঁড়াবে। তবু এক অসম্ভব সাহস–যার আর এক নাম হতে পারে মহামুখতা, সেই পথ সম্বল নিয়ে বের হয়ে পড়েছিলাম সদ্যচেনা একটা ছেলের সাথে। যে আমাকে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে দিতে পারত সেই অপরাধ চক্রের কাছে যারা বাচ্চাদের চোখ অন্ধ হাত পা ভেঙে দিয়ে ভিখারি বানায়। আরবে পাঠায় উটের দৌড়ে উটের পেটে বেঁধে ঝোলাবার জন্য। কিডনি কেটে বের করে নেয়। পুরুষাঙ্গ কেটে ফেলে হিজড়া বানায়। এই রকম কত কী সেদিন ঘটে যেতে পারত যা ভাবলে আজ বুক কেঁপে যায়।
সেই বিচিত্র বিচ্ছিরি ভ্রমণ কাহিনী লিখেছিলাম আমার ‘চণ্ডাল জীবন’ উপন্যাসে।
যা লিখেছিলাম, যেমন লিখেছিলাম সেটাই তুলে দিলাম এই আত্মজীবনীর মধ্যে।
০২. শিয়ালদহ রেল স্টেশন
শিয়ালদহ রেল স্টেশন। নামের অভিধানিক অর্থ খুঁজতে গেলে মনে হয় কোন এক কালে এখানে কোন জলাশয় ছিল যাতে শেয়াল পড়ে গিয়ে থাকবে। নানা পথ ঘুরে ঘুরে এখানে এসে পৌঁছেছে বিপন্ন সময়ের গর্তে পা পিছলে পড়া এক কিশোর। যার নাম জীবন। অজানিত এক ভয় তাড়া করে নিয়ে ফিরছে তাকে। মনে হচ্ছে যেন একপাল হিংস্র হায়না ধাওয়া করে আসছে। নাগালে পেলে ধারালো দাঁতে ফালা ফালা করে ফেলবে। কত বা বয়স এখন জীবনের! সেই নাবালক বয়সের তুলনায় অন্যায়েরকার বিশাল ও শিয়ালদহ রেল স্টেশন। শুধু এই রেল স্টেশনই নয়, সব রেল স্টেশনেরই একটা বিমূর্ত কিন্তু সংবেদী সত্তা আছে। যাকে দেখতে বা বুঝতে হলে মনটাকে খানিকটা দার্শনিক ভাবালুতার শিকড়ে নিয়ে বসাতে হয়। গোপন প্রবাহিত সেই ফতার আদিম অনাবিল শেকড়ে আছে জাতিধর্ম বর্ণের উর্ধ্বে এক চিরায়ত মানবাত্মার সুগভীর মেল বন্ধন। হাজার হাজার মানুষ, নানা বয়সের নানা পোষাকের নানা ভাষার। কেউ কারও পরিচিত নয়, কিন্তু কোন দক্ষ মালাকার যেন এক সুতোয় গেঁথে দিয়েছে সব ফুলের এক অদৃশ্য মালা।
সকালবেলায় যখন দিনের প্রথম ট্রেনখানা এসে প্লাটফর্মে থামে সেই যন্ত্রযানের গর্ভ থেকে একইভাবে পিলপিল করে প্রসব হয় মানুষ। তারপর একই রকম, ধেয়ে চলা মিছিলের মতো সামনে ছোটে। প্রতিটি পায়ের চলায় ফুটে ওঠে একই রকম ছন্দ তাল ধ্বনি। ফুটে ওঠে দায়িত্ব কর্তব্যের সাথে নিখুঁত শ্রম জীবনের বার্তা। আবার দুপুরে বিকালে রাতে ফিরতি এই পাগুলোয় জড়িয়ে থাকে শ্রান্তি ক্লান্তি অবসাদ। মনে জড়িয়ে থাকে ঘরে ফেরার তাড়ার সাথে কিছু উৎকণ্ঠা। যদি ট্রেন না আসে! যদি ট্রেন না ছাড়ে! যদি মাঝপথে গিয়ে থেমে যায়! ট্রেনের আজকাল হাজার বিপদ। বর্ষায় লাইনে জল জমে যেতে পারে। ওভার হেড তার ছিঁড়ে যেতে পারে। কেটে নিয়ে যেতে পারে কোন চোর। বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকতে পারে। হঠাৎ কোন নাগরিক বা রাজনৈতিক অবরোধে বন্ধ। তখন আর ট্রেন চলবে না। ট্রেন না চললে সব মানুষের মুখ একই দুশ্চিন্তায় কালো হবে। বুকে জমবে একই রকম মেঘ বাদল যা বৃষ্টি হয়ে ঝরাও বিচিত্র নয়। সবার ঘরের মানুষ একই রকম আশংকায় পথের দিকে তাকিয়ে থাকবে একই কামনা নিয়ে। ভালোয় ভালোয় ঘরে ফিরে আসুক ঘরের মানুষ। কারো সাথে কারো দেখা সাক্ষাৎ চেনা জানা পরিচয় পরিচিতি নেই, তবু একই রকম দীর্ঘশ্বাস পড়বে সবার একই দুর্ভাবনায়। জীবন দার্শনিক নয়। দর্শনের গভীর তথ্যে বিচরণের পক্ষে ষোল সতের বছর বয়েসটা বড় কম। সে এই স্টেশনে বলতে গেলে আত্মগোপন করে আছে স্কুল এক জৈবিক তাড়নায়। স্টেশনে সে একা নয়, তার মত ভবঘুরে ভিখারি পাগল গৃহহারা বহু মানুষের বসবাস। এর মধ্যে আর একটা নতুন বাড়তি বালক বিশেষ কারো শিরঃ পীড়ার কারণ ঘটায় না।
