“মানুষকে কখনও অবজ্ঞা করতে নেই”। মানুষের ক্ষমতাকে কখনও ছোট করে দেখতে নেই। পেটে ভাত, পায়ে চপ্পল, গায়ে জামা, মাথায় তেল না থাকা তৃণাদপি’ এই যে মানুষ–এরা একতাবদ্ধ হয়ে ভয়কে জয় করে উঠে দাঁড়ালে পৃথিবীর সব ইতিহাস ওলোট পালট করে দিতে পারে, রাজপ্রাসাদ থেকে হিড়হিড় করে টেনে এনে পথের ধুলোয় গুড়ো করে মিশিয়ে দিতে পারে স্বৈরাচারী দাম্ভিকদের। দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকার ফলে সেটা ভুলে গিয়েছিল লাল পার্টির লোকজন। মুখ অহম জিরাফ হয়ে উঠেছিল মনে–উত্তরের পাহাড় থেকে দক্ষিণে সাগর–সব আমার গোলাম। আমি যদি বলি দাঁড়িয়ে থাক–দাঁড়িয়ে থাকবে, যদি বলি বসে পড়–বসে পড়বে। এই সীমাহীন ঔদ্ধত্যে তারা আয়লাঝড়ের মতো গিয়ে আছড়ে পড়েছিল গ্রামবাংলার গরিব জনজীবনের উপর। তোর ওই জমি মন্দির মসজিদ খেলার মাঠ স্কুল হাসপাতাল পুকুর, তোর সভ্যতা, সংস্কৃতি নিরাপদ জীবন, স্বাধীনসত্তা–সব আমাকে দিয়ে দে। একদম কাঁদবি না, মুখে হাসি ঝুলিয়ে রেখে বল–হীরকের রাজা ভগবান, তিনি যা করেন সব আমার মঙ্গলের জন্য। যদি তা না করিস তোর মেয়েকে, তোর বউকে, তোর মাকে–জানিস তো, প্রণাম করে দেব। প্রণাম বুঝিস? আমাদের শক্তিশালী প্রণব ব্রিগেড আট থেকে আশি কাউকে ছাড়ে না।
সেই ভয়কে জয় করে যেদিন মানুষ উঠে দাঁড়াল, শাসনক্ষমতার অলিন্দ থেকে চোখ মুছতে মুছতে বিল্টুদায় হয়ে গেল আবর্জনা সমতুল্য অপশাসনের আমদানি কারি চৌত্রিশ বছরের শাসকদল, সেই ইতিহাস তো সবারই জানা। জানা নেই তাদের সরিয়ে দিয়ে আজ যাদের হাতে নিজের শুভাশুভের ভার সমর্পণ করা হল তার ভূমিকা কী হবে। তবে এটা ঠিক যে মানুষ যদি এদের উপর তীক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ না রেখে আবার শীত ঘুমে চলে যায়–ক্ষমতার যা ধর্ম, এদেরও দূষিত করে দেবে। ঘুম শেষে চোখ মেলে দেখবে মানুষ আর এক দৈত্যে রূপান্তরিত হয়ে গেছে তারা যাদের প্রতিশ্রুতি ছিল মা মাটি মানুষের মঙ্গলের।
কী হবে না হবে সেটা ভোলা থাক ভবিষ্যৎ কালের জন্য। আমি আমার কথা বলি।
ওই দু হাজার দশের মাঝামাঝি থেকে এগারোর মাঝামাঝি বারো মাসে তিনবার তিন তিনটি শারীরিক অসুবিধায় পড়ি। প্রথমবার আমার একটি চোখের ছানি অপারেশন করাতে হয়। পরের বার হয়ে যায় জলবাহিত রোগ জন্ডিস। আর তার পরেরবার আমার কর্মস্থলে পা পিছলে পড়ে গিয়ে মারাত্মক ভাবে পুড়ে যাই।বুক পেট গরম জলে ঝলসে যায় আমার। সেই বছর তিরিশ পঁয়ত্রিশ আগে একবার পুড়েছিল শরীরের ডান দিক, এবার গেল বাঁদিক। দু’দুবার জীবন্ত দগ্ধ হলাম জীবনে।
তবে যারা আমার জীবনী পড়েছেন নিশ্চয় জেনে গেছেন আমার জীবনের সব দুঃ সময়-পরবর্তীকালে বদলে গেছে সুন্দর সময়ে কিছুই ছাড়িনি আমি সব দুঃখ কষ্টঅপমান অত্যাচার যা জীবনকে একদা দুর্বিষহ নরকতুল্য বানিয়ে দিয়েছিল, তাকে নিংড়ে আদায় করে নিয়েছি যথার্থ মূল্য। আজ আর আমার বিগত দিনের প্রতি কোন ক্ষোভ দ্বেষ নেই। যে জীবন যাপন করেছি, যে দুঃখ কষ্ট অপমান সইতে হয়েছে তা আমার অভিজ্ঞতার ঝুলিতে এসেছে অনেক অনেক রসদ। তা না হলে আমি কী লেখক হতে পারতাম?
পশ্চিমবঙ্গে আমার এমন কোনো আত্মীয় নেই যাদের সাথে কোনো রক্তের সম্পর্ক আছে। তবে আমি আত্মজন বিহীন আত্মীয়তা হীন মোটেই নই। এখানে রয়েছে অগণন আপনজন, যাদের সঙ্গে আমার আত্মার এবং আদর্শের সম্পর্ক যা রক্তের স্পর্কের চেয়ে অনেক গুণ মজবুত। যে কারণে যারা আমার প্রতিপক্ষ–শত্রু ভাবাপন্ন, বিশেষ একটা ক্ষতি এখনও করে উঠতে পারেনি। অজস্র সৎ সাহসী সমাজ-সচেতন মানুষ নিজেরা এগিয়ে এসে আমার দিকে এগিয়ে দিয়েছে বন্ধুত্বের হাত। জড়িয়ে ধরেছে বুকে উষ্ণ আলিঙ্গনে। যাদের কাছে আমি চিন্তা চেতনা শিক্ষাদীক্ষা আর্থ সামাজিক ও আভিজাত্যে তৃণদপি তুচ্ছ। তবু সেই মানুষরা আমাকে স্নেহ করেন, ভালোবাসেন। এটা আমার একটা পরম প্রাপ্তি।
এইরকম এক বন্ধুর নাম জয়ন্ত ঘোষাল। থাকেন ব্যারাকপুরে। উনি শূন্যদশক’ নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করেন। সুলেখক।
উনি একদিন অসম্ভব উৎপীড়ন শুরু করে দিলেন আমার উপর। কী? না আপনার আত্মজীবনীটা লিখে ফেলুন।
জয়ন্তদা ভীষণ আবেগপ্রবণ মানুষ। উনি ওনার বিশেষ পরিচিত একনামি প্রকাশকের বিশ্বাস পদবি দেখে বিশ্বাস করে নিয়েছিলেন যে আমার জীবনী সে ছাপবে। কথা যখন দিয়েছে।
আমিও এক বিশ্বাসকে বিশ্বাস করে যে ভুল করেছিলাম সেই একই ভুল জয়ন্তদাও করে বসলেন। আর আমাকে তাগাদার পর তাগাদা দিয়ে অস্থির করে তুললেন–লিখুন। যত তাড়াতাড়ি পারেন লিখে শেষ করুন।
বহুকাল আগে পৃথিবীতে এসেছি। সেই যখন অষ্টগ্রহ নামে কী এক বিঘটন ঘটেছিল সৌরমন্ডলে। শোনা গিয়েছিল সেইদিনই পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে। আজব ব্যাপার–সব আশঙ্কা ব্যর্থ করে পৃথিবী বেঁচে গেছে। আমিও সব সম্ভাবনা ব্যর্থ চলে যাওয়ায় আজও বেঁচে রয়েছি। অনাবশ্যক–অনেক বছর।
আর এই বেকার বর্ধিত আয়ুর কারণে জীবনের সাথে যুক্ত হয়ে গেছেকত যে কাহিনি উপাখ্যান ঘটনা দুর্ঘটনা। সে সব কী এত তাড়াতাড়ি লিখে ফেলা যায়! সব কথা কী অকপটে বলা চলে? আমার লেখা শব্দরা আমার বিরুদ্ধে সাপের মতো ফণা তুলে দাঁড়ালে তখন কী হবে? তা ছাড়া তেমন বিশদ ও বিস্তারিত লিখব যে, আমার জীবনে এত সময় কই!
