গেট থেকে একটা অল্পবয়সী মেয়ে–মনে হয় ছাত্রী, আমার আগে আগে হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছে বসবার আসন দেখিয়ে দিয়ে চলে গেল। সেই যেমন বহুকাল আগে বিনাটিকিটে ট্রেনে চেপে কাচুমাচু মুখ নিয়ে চেয়ারে গিয়ে বসতাম, সেভাবেই নিজেকে লুকিয়ে ফেললাম ভিড়ের মধ্যে।
খুবই ভিড় হয়েছে সভাগৃহে। হিন্দিতে যাকে বলে–খচাখচ ভরা–একেবারে তাই। অল্প কিছু সময়ের মধ্যে মোমবাতি জ্বালানো রবীন্দ্রসঙ্গীত আর সম্মানীয়দের বরণের পরে শুরু হয়ে গেল মূল অনুষ্ঠান। যার সঞ্চালক এবং মুখ্য উদ্যোক্তা যোগেশ চন্দ্র চৌধুরী কলেজের ইংরাজীর অধ্যাপক জয়দীপ ষড়ঙ্গী। সর্বপ্রথম বলতে উঠলেন তিনি। জানতাম বক্তৃতার একবর্ণও আমি বুঝব না। আমার অবস্থা এখানে–মধু রাখা কাঁচের বয়মের উপর বসে থাকা মাছির মতন। তবু তাকিয়ে ছিলাম মঞ্চের দিকে। উকর্ণ হয়েছিলাম–যদি কোন প্রিয়–পরিচিত শব্দ ভেসে আসে।
এল। এল একেবারে অনুষ্ঠান শুরুতেই, যা আমার দূরতম কষ্ট কল্পনাতেও ছিল না। যা আমার কাছে একেবারে বারুদ আর বাঁশরির শব্দ আর সুরের সংমিশ্রণে সৃষ্ট এমন এক বিদ্যুৎ চমক যে পা থেকে মাথা পর্যন্ত গোটা শরীর থরথর করে কেঁপে উঠল আমার।
কী বললেন অধ্যাপক ষড়ঙ্গী, আমরা কেউ আগে জানতাম না যে পশ্চিমবঙ্গে দলিত সাহিত্য আছে। মহারাষ্ট্রে গুজরাটে আছে–জানতাম। বাংলায় আছে–জানতাম না। গত ১৩ই অক্টোবর ২০০৭ ই.পি. ডব্লিউতে মনোরঞ্জন ব্যাপারীর একটা লেখা প্রকাশিত হয়, যার অনুবাদ করেছেন অধ্যাপিকা মীনাক্ষী মুখার্জী। সেটা পড়বার পরে জানলাম যে আছে। বাংলাতেও দলিত সাহিত্য আছে। তার ফলেই বাংলা দলিত সাহিত্য বিষয়ে একটা সম্মেলন করার ভাবনা মাথায় আসে। বাংলা এবং অন্যান্য ভারতীয় দলিত সাহিত্য। যার ফলশ্রুতিতে আজকের এই সম্মেলন। এটাই কী বলেছিলেন?
আমি জানি না। কারণ পুরো বক্তৃতাটা তো ছিল ইংরাজিতে–যা আমার কাছে ‘গোণ্ডি বুলি’-র চেয়েও দুর্বোধ্য। তবে মনোরঞ্জন, মীনাক্ষী মুখার্জী আর ইপিডব্লিউ এই তিনটে কথা বুঝতে অসুবিধা হয়নি। যার ফলে উনি কী বলতে পারেন সেটাও অনুমান করে নিতে অসুবিধা কোথায়?
যখন জয়দীপ ষড়ঙ্গী মঞ্চ থেকে নিচে নামলেন আমি সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম–দাদা, এই যে আমি। মনোরঞ্জন ব্যাপারী।
ওনার চোখে মুখে বিপন্ন বিস্ময়–আপনি মনোরঞ্জন ব্যাপারী।
–আমিই—
–মীনাক্ষী মুখার্জী আর আপনি মিলে ওই কাজটা করেছিলেন?
–আজ্ঞে হ্যাঁ, আমরা করেছিলাম।
আমি করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে ছিলাম। উনি আমাকেই বুকে টেনে নিলেন। জড়িয়ে ধরলেন–আপনার সাথে যোগাযোগ থাকবে। আরো অনেক কাজ করতে হবে। সবে তত পথ চলা শুরু।
আমি আবার গিয়ে নিজের জায়গায় বসে পড়লাম। দেখলাম–জয়দীপ ষড়ঙ্গী দূর থেকে জনে জনে–আমাকে দেখাচ্ছেন–ওই যে। মনোরঞ্জন ব্যাপারী।
প্রথম পর্বের অনুষ্ঠান শেষ হল। হঠাৎ আমার পিছন থেকে একটি সুরেলা কণ্ঠের সংকোচপূর্ণ মৃদু জিজ্ঞাসা–আপনি মনোরঞ্জন ব্যাপারী?
পরে জেনেছি ওই কণ্ঠের মালিকের নাম–অঙ্গনা দত্ত।
মাথা নাড়ি আমি–হ্যাঁ-আমি।
বলে সে–আজই সকালে আপনার কথা হচ্ছিল। স্যার বলছিলেন।
পাশ থেকে এবার-আবার একটি পুরুষ কণ্ঠ ওই একই প্রশ্ন করেন–আপনি মনোরঞ্জন ব্যাপারী? আবার মাথা নাড়ি আমি, হ্যাঁ আমিই সেই। বলেন তিনি–আমার নাম সঞ্জয় কুমার, দিল্লি থেকে আসছি। একটু থেমে ফের বলেন–আমি আপনার ‘রীবাজ’ গল্পটা হিন্দিতে অনুবাদ করেছিলাম। কথাদেশ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল।
বলি-হা মনে পড়েছে, এক দুবার ফোনেও আপনার সাথে কথা হয়েছিল। চাক্ষুষ দেখা এই প্রথম।
বলেন তিনি–আমি আপনার চণ্ডাল জীবন হিন্দিতে অনুবাদ করতে চাই। বইখানা কোথায় পাবো। এখানে কী আছে?
বলি–আমি আপনাকে এনে দেব।
দ্বিতীয় পর্বে চারজন পেপার পড়বেন। সবার শেষে সায়ন্তন দাশগুপ্ত। আর কী আশ্চর্য উনি পড়বেন সেই ‘রীবাজ’সহ আর এক দুটি আমার লেখা বিষয়ে। উনি রীবাজ গল্পের ইংরাজি অনুবাদ করেছেন, অক্সফোর্ড প্রকাশনার দলিত সাহিত্য সংকলনে দেবেন বলে।
কী তিনি পড়লেন আর কী তিনি বললেন সে আমি কী করে বুঝব! বুঝেছেন সঞ্জয় কুমার। উনিও যে লেখাটা অনেকবার পড়েছেন। পেপার পড়বার পরে যখন শুরু হল প্রশ্ন-উত্তর পর্ব, সঞ্জয় কুমার আর সায়ন্তন দাশগুপ্ত দুজনের বেশ অনেকক্ষণ ধরে তা নিয়ে চলল কথপোকথন। শব্দ ছোঁড়াছুড়ি। মজার ব্যাপার সমগ্র অনুষ্ঠানে আমি একটা বিরাট জায়গা জুড়ে ছিলাম। অথচ আমি ছিলাম না। থাকার কথাই ছিল না আমার। আমার কোন আমন্ত্রণই তো ছিল না।
এরপর অনুষ্ঠান শেষ হলে একটা ফাইল পেলাম। আর ফাইলে কিছু ছাপানো কাগজপত্র। অতিথি যারা আগে পেয়ে গেছে ফাইল–অনাহুত আমি পরে। আমি অন্ধ দেখতে পাইনা। যারা চক্ষুষ্মন সেই কাগজপত্রে চোখ বুলিয়ে অনেক জায়গায় লেখা পেয়ে গেল আমার নাম।
অনুষ্ঠান শেষ হবার পর হেঁটে হেঁটে এসে দাঁড়ালাম যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে–যেখানে একদিন আমি রিকশা চালাতাম।
সেই রিকশা লাইনটা আজও আছে। শুধু আমি আর নেই। এখান থেকেই আমার যে রিকশার চাকা গড়াতে শুরু করেছিল তা আজ গড়িয়ে গড়িয়ে পৌঁছে গেছে ইন্দুমতী সভাগৃহে। আরো অনেক পথ যেতে হবে।
***
দুহাজার দশ সালের মাঝামাঝি থেকে দুহাজার এগারোর মাঝামাঝি এই সময়কালটা মোটেই ভালো যাচ্ছিল না। ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ পশ্চিমবঙ্গের কথা বলছি না, আমি আমার নিজের কথা বলছি। পশ্চিমবঙ্গ তো তখন যেন রক্তস্নানের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলছিল এক নতুন ভবিষ্যকাল প্রসবের দিকে। সেই যন্ত্রণা তাকে তো মেনে নিতেই হবে। সমস্ত নব জনমের এটাই আগমন পূর্ব–শর্ত। একে এড়িয়ে যাবার কোন পথ প্রকৃতি খোলা রাখেনি।
