দাবি মেনে নেন উনি। এই বইয়ের ভূমিকা লিখে দেন–আর কেউ নয় সাহিত্য জগতের হিমালয় প্রতিম সাহিত্যিক-মহাশ্বেতা দেবী। উনি লেখেন, লেখেন–উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক-প্রাবন্ধিক-অশ্রুকুমার সিকদার, বাংলাদেশের বিতর্কিত লেখক সালাম আজাদ আর লেখেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অচিন্ত্য বিশ্বাস। অচিন্ত্য বিশ্বাস শুধু লেখকই নন, একজন সমালোচকও।
চণ্ডাল, এই কথাটির অর্থ ভারতীয় বর্ণ ব্যবস্থায় সর্বনিম্নে অবস্থিত সেই মানুষ, যাকে সমাজ-ধর্ম ঘোষণা করেছে অচ্ছুত অস্পৃশ্য ঘৃণা করার যোগ্য এক মানবেতর জীব বলে।
চণ্ডাল শব্দের আর একটি অর্থ–ভয়ংকর রাগ। বলাই তো হয়ে থাকে রাগ-চণ্ডাল। তাহলে চণ্ডাল জীবন কথার অর্থ দাঁড়াচ্ছে–একটা অচ্ছুত অস্পৃশ্যের গোটা জিয়কাল, অথবা একটা রাগী মানুষের জীবনযাপন প্রণালী।
চণ্ডাল জীবন উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র একাধারে দুই-ই। সে জন্ম জনিত কারণে অচ্ছুত অস্পৃশ্য ও স্বভাবজাত কারণে ভীষণ রকম ক্রোধী। যে ক্রোধের কারণও হয়তো সুপ্ত রয়েছে এই অমানবিক সমাজের অন্দরে। সেটা খুঁজে দেখবেন বিবেচক পাঠক। হয়তো প্রতিকারের বিষয়ও। কেউ ভাববেন।
জীবন দাস কোনও কল্প কাহিনীর নায়ক নয়। সে এই দেশ সমাজ সময়ের এক জিয়ন্ত জীবন্ত মানুষ ছিলো। ছিলো বলছি, কারণ সে এখন আর নেই। যাকে আমি চিনতাম। এবং যাকে আমার মতো গভীরভাবে অন্য কেউ চেনেনা। এই দাবি আমিই করতে পারি। যদিতাকে পাঠকের দরবারে বিচারার্থে যথাযথ উপস্থাপন না করতে পেরে থাকি সে আমার দুর্বল লেখনি, আমার ক্রটি।
আমার মুখে শুনে শুনে আকাডেমি সাহিত্য পুরস্কারে সম্মানিতা সাহিত্যিক অলকা সারাওগী তার বিখ্যাত হিন্দি উপন্যাস “কোই বাত নেহী” তে জীবন চণ্ডালের জীবনের কিছু খণ্ড ছবি এঁকেছিলেন। আমার ইচ্ছা এই অদ্ভুত রকমের বিচিত্র মানুষটির পূর্ণাঙ্গ জীবনকাহিনী লিপিবদ্ধ করে রেখে যাবার, সে বেঁচে ছিল শুধুমাত্র মরে যাবার উদগ্র কামনা বুকে নিয়ে। এবং যে মরে গেছে বেঁচে থাকার ভীষণ অভীপ্সায়।
.
২০১১ সালের ২৭ শে নভেম্বর, রাত তখন মনে হয় আট কি সাড়ে আটটা। ক্রিং ক্রিং করে বেজে উঠল আমার মোবাইল। ফোন তুলে জানলাম যিনি ওপারে আছেন তিনি মনোহর মৌলি বিশ্বাস।
বলেন তিনি–মনোরঞ্জন, আগামী ২৯ ও ৩০ তারিখে যাদবপুরের ইন্দুমতী সভাগৃহে যে সর্ব ভারতীয় দলিত সাহিত্য সম্মেলন হচ্ছে–তুমি কী তার আমন্ত্রণ পত্র পেয়েছো?
বলি না তো। আমি তো জানিই না যে ওখানে কিছু হবে।
সায়ন্তন বাবু তোমাকে বলেননি! উনি তো একটা পেপার পড়বেন যাতে তোমার লেখা নিয়ে ঐ সম্মেলনে আলোচনা হবে।
একটু ভেবে বলি–হয়ত বলবেন। এখনও তো সময় আছে।
বলেন তিনি–তুমি যখন জানো না একটু বুঝিয়ে বলি, এটা যাদবপুর হলেও, সম্মেলনটা করছে যোগেশ চন্দ্র চৌধুরি কলেজের ইংরাজী বিভাগ আর পশ্চিমবঙ্গ দলিত সাহিত্য সংস্থা। এর ব্যয়ভার বহন করছে ইউ.জি.সি। মানে ইউনিভার্সিটি গ্রান্টস কমিশন। বলতে গেলে এটা খুব বড় মাপের প্রোগ্রাম। দলিত সাহিত্য নিয়ে এরকম প্রোগ্রাম পশ্চিমবঙ্গে আগে আর হয়নি। তুমি কী ওইদিন যেতে পারবে? যদি যাও আমার কাছে আমন্ত্রণ পত্র আছে। আমি তোমাকে একটা দুটো দিতে পারব। সকাল সাড়ে নটা থেকে অনুষ্ঠান। ওখানে গিয়ে আমাকে একটা ফোন কোরো, আমি গেটে আমন্ত্রণ পত্র দিয়ে আসব। গেট পাশ না থাকলে ঢোকা যাবে না।
আজ রবিবার। অর্থাৎ ঊনত্রিশ তারিখ পড়বে মঙ্গলবার। ওইদিন আমার সাপ্তাহিক ছুটির দিন। অন্য কোন দিন হলে যেতে পারতাম কী না কে জানে তবে ছুটির দিন যখন, যাওয়া যায়। এই তো কাছেই। বাসে পাঁচ টাকা ভাড়া মাত্র।
কিছুক্ষণ পরে কী ভেবে কে জানে, ফোন করলাম যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক সায়ন্তন দাশগুপ্তকে–দাদা, খবর পেলাম যাদবপুরের ইন্দুমতী সভাগৃহে একটা সর্বভারতীয় দলিত সাহিত্য সম্মেলন হচ্ছে। মনোহরদা ফোন করেছিলেন।
ধীর গলায় বলেন তিনি–আপনি যাচ্ছেন নাকি?
-–ভাবছি যাব। শুনলাম আপনি নাকি একটা পেপার পড়বেন।
–হ্যাঁ, পড়ব।
–ওটাই শোনবার জন্য যাব। যেতে পারতাম না, মঙ্গলবার হওয়ায় পারব।
বলেন তিনি–আমি আপনাকে বলতাম।বলিনি, কারণ পুরো প্রোগ্রামটা তো হবে ইংরাজিতে। আপনি তো…হয়ত বোর হয়ে যাবেন।
বলি–কিছু বুঝি আর না বুঝি–তবু যাব। আপনি যখন পেপার পড়বেন শ্রোতাদের কি প্রতিক্রিয়া হয় সেটা তো দেখতে পারব।
যথারীতি ২৯শে নভেম্বর সকালে দাড়িটারি কেটে চানটান করে গিয়ে পৌঁছালাম যাদবপুরের সেই সভাগৃহের সামনে। আমার কোন আমন্ত্রণ নেই, সম্পূর্ণ অনাহুত, গেটের সামনে যেতে একটু সংকোচ হচ্ছে। একটু ভয় ভয়। এটা নতুন নয়, সবদিনই শিক্ষিত-বিদ্বান লোকদের সামনে যেতে আমার হাত পা গলা বুক সব কঁপে। বিশেষ করে যারা অধিক ইংরাজি জ্ঞান সম্পন্ন তাদের ডরাই বাঘের চেয়ে বেশি।
ফোন করি মনোহর মৌলি বিশ্বাসকে–দাদা আমি এসে গেছি। গেটে দাঁড়িয়ে আছি। আমাকে নিয়ে যান।
বলেন তিনি আমার যেতে হবে না, তুমি সোজা চলে এসো।
–যদি গেটে আটকায়?
–আটকাবে না। বলবে, অনুষ্ঠানে যাব। দলিত সাহিত্য সংস্থার সদস্য।
–তবু–যদি যেতে না দেয়।
–তখন আমাকে ফোন কোরো।
আটকাল না। তবে জিজ্ঞাসা করল–কোথায় যাব। আর আমার যা ভয়, সেই কটমটে ইংরাজি ভাষায়। ভাষার কিছু বুঝিনি, ভাবনার বুঝেছি। তাই জবাব হয়েছিল শুদ্ধ ভেজালবিহীন বাংলা ভাষায়–এই অনুষ্ঠানে যাব।
