প্রত্যেকটা মানুষ একদিন মারা যাবে। মারা আমিও যাবো। কিন্তু মৃত্যুর পরও বহু বহু বছর বেঁচে থাকবে আমার কীর্তি। একেই তো অমর হওয়া বলে। এ লোভ আমি পরিত্যাগ করতে পারি? তাই বলে দিই ওনাকে, এই কাজের জন্য আমার সর্বতো সহযোগিতা থাকবে। এ আমার প্রাণের বড় আরামের কাজ।
এরপর উনি আমাকে কোঅর্ডিনেটর হিসাবে যুক্ত করে নিলেন ওই কাজে। যে আমি জীবনে কখনও স্কুলের চৌকাঠ ডিঙোইনি–আকাট মূর্খ, সেই আমাকে যাদবপুর, দিল্লি, আসাম এর শিলচর, আর হায়দরাবাদ চার বিশ্ব বিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগের চার অধ্যাপক, এদের নিয়ে গড়া এক কমিটিতে সমমর্যাদায় স্থান দেওয়া হল। আমার উপর ভার রইল বাংলা দলিত সাহিত্য সংকলনটির।
একজন তুচ্ছ নগণ্য মানুষ। সে কী কোনদিন ভাবতে পেরেছিল তার জীবদ্দশায় কোনদিন এতবড় প্রাপ্তি ঘটবে। এই সম্মান–এই প্রাপ্তি, আমার তো মনে হয় জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ মহান এক পুরস্কার। এর চেয়ে বড় আর কী হয় তা আমার জানা নেই।
.
এবার একটি ছোট্ট গল্প। গল্পটি মহাভারতের। পঞ্চ পান্ডবদের অশ্বমেধ যজ্ঞের ঘোড়া ধরেছে বালক বব্ৰুবাহন। সেই নিয়ে তার ও অর্জুনের মধ্যে মহাযুদ্ধ। অর্জুন বাণ নিক্ষেপ করল বব্ৰুবাহনের রথে। বাণের ধাক্কায় সে রথ ছিটকে গিয়ে পড়ল চল্লিশ যোজন দুরে। কী আর করে বালক বব্ৰুবাহন। সে ধীরে ধীরে ফিরে এল রণভূমিতে। এবার সে একটা বান ছুড়ল অর্জুনের রথে। রথ তিন পা পিছনে সরে গেল। শ্রীকৃষ্ণ হাততালি দিয়ে অভিনন্দিত করলেন বালককে–সাবাশ বীর।
তখন অর্জুন ক্ষুণ্ণ মনে শ্রীকৃষ্ণকে বললেন–আমি ওর রথ চল্লিশ যোজন দূরে ফেলেছিলাম, আমাকে ধন্যবাদ দাওনি। ও আমার রথ মাত্র তিন পা সরিয়েছে, ওকে ধন্যবাদ দিলে।
তখন বলেন শ্রীকৃষ্ণ–ওর রথে কে আছে আর কী আছে! ওই রথ চল্লিশ কেন চারশো যোজন দূরে ফেলাও কোন কঠিন কাজ নয়। কিন্তু যে রথে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সব ভার নিয়ে আমি বসে আছি, এই রথকে এক চুল নাড়ানো সহজ নয়। এ তিন পা সরিয়েছে। ধন্য বালকের অস্ত্র শিক্ষা।
যারা বিদ্বান, বিদ্যার্জনের জন্যে পান অফুরন্ত অবসর, তারা তো উন্নত উৎকৃষ্ট মহৎ আর অজস্র রচনা করবেনই। তা না করাটাই তো আশ্চর্যের, কিন্তু কিছু না শিখে না জেনে বাইরে যখন অসহ্য উত্তাপ, সেই উত্তাপকে আরও অনেক গুণ বাড়িয়ে তোলে আমার কর্মস্থলের আগুন সেই অবস্থায় যতটুকু যা করেছি একটা হাততালি কী আমি পেতে পারি না? ওই হাততালির মূল্য আমার কাছে অনেক বড়।
আমার একখানি উপন্যাস যা আমাকে সবচেয়ে খ্যাতি সম্মান ও লেখক পরিচিতি দিয়েছে–তার নাম চন্ডাল জীবন। এটি এক সময় বহুজন নায়ক পত্রিকায় জীবন চন্ডাল শিরোনামে কিছু অংশ প্রকাশিত হয়েছিল। পত্রিকাখানি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বাকি অংশ অপ্রকাশিত পড়ে থাকে বহু বছর।
শেষে একদিন ছুটে যাই তার কাছে, যার কাছে যাওয়া যায়। ইনি আমার প্রণবদা। হাটে বাজারে পত্রিকার সম্পাদক। যে চন্ডালের কথা আমি লিখেছি–মাত্র তার চব্বিশ পঁচিশ বছরের বিচ্ছিরি বিড়ম্বনাময় ঘটনা দুর্ঘটনা বহুল জীবন কথার পাণ্ডুলিপি দেখে মুষড়ে পড়েন প্রনবদা। এটা ছাপালে পত্রিকায় অন্য লেখকদের লেখা রাখার জায়গা থাকবে না। কিন্তু আমার আবদার–অনুরোধ–দাবি–সেটাও তার পক্ষে এড়ানো কঠিন–সেই যে স্নেহ ভালোবাসা বলে কী সব আছে! সেটা আমার প্রতি প্রণবদার ভান্ডারে অনেক বেশি।
তাই পরামর্শ দেন তিনি–খন্ড খন্ড করে ফ্যাল। প্রতি খন্ড এমন ভাবে শেষ কর, যেন তাতে একটা সুন্দর সমাপ্তি থাকে। এরপর কী? পাঠকের কৌতূহল থাকুক, কিন্তু কোনভাবে যেন বোঝা না যায়-অসমাপ্ত হয়ে গেছে।
তাই করি আমি। একটাকে ভেঙে চারটে বানাই। তারপর চার বছরের চারটে হাটে বাজারে পত্রিকার পূজা সংখ্যায়-চন্ডাল জীবন, আবার চন্ডাল জীবন, এই জীবন সেই জীবন, এবং নরকের এক জীবন, নামে প্রকাশিত হয়ে যায়।
এরপর আর সেই চন্ডালের জীবন কাহিনী লেখার কোন দরকার নেই। নরকের যে জীবন সে স্বর্গের দিকে, মুক্ত মানুষের বাসভূমি থেকে প্রাচীর ঘেরা জেলখানার দিকে যাত্রা করে গেছে। যখন সে জেলখানা থেকে বাইরে আসবে আর চন্ডাল নয়। এখানে রাগ শব্দের অর্থ চন্ডাল ধরা হচ্ছে। এরপর সে তত শুধু জীবন। যার কাহিনী রত্নাকরের মৃতদেহের মধ্যে থেকে বাল্মিকীর বেঁচে ওঠার কাহিনী। যা আমি এই কাহিনীর মধ্যে লিখে ফেলেছি।
ওটি উপন্যাস–এটি আত্মকথন। দুটি কাহিনীর মর্মবস্তুতে মিল থাকলেও গরমিল আছে উপস্থাপনায় বর্ণনায়। উপন্যাসকে উপন্যাস বানাবার প্রয়োজনে যেটুকু কারিকুরি দরকার তা করা হয়েছে। ফলে আগের কথা পরে-পরের কথা আগে এমন হয়েছে। তবে সব কথার সার কথা–এ দুটোতে সাহিত্য কতটা আছে তা কে জানে, কিন্তু সত্য আছে। উলঙ্গ নির্ভেজাল কঠিন সত্য।
হাটেবাজারে পত্রিকায় চন্ডাল জীবন প্রকাশিত হবার পরে, পাঠকদের মধ্যে একটা প্রবল প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হল এটাকে পুস্তকাকারে প্রকাশ করতে পারলে খুব ভালো হয়। কিন্তু এই ব্যয়বহুল দায়িত্ব কে নেবে। তখনই মনে পড়ল মনোজদার কথা। মনোজদা মানে প্রিয়শিল্প প্রকাশন-এর কর্ণধার মনোজ বন্দ্যোপাধ্যায়। যিনি আমার ‘অন্য ভুবন’ উপন্যাসখানি ছেপেছিলেন।
অল্প কিছু টাকা যোগাড় করে সেটা নিয়ে শরণাপন্ন হই মনোজদার–চন্ডাল জীবন-এর প্রথম ভাগটা আপনাকে ছাপতে হবে। যতটুকু পেরেছি দিলাম আর এখন কোনো টাকা দিতে পারব না সে দেব বই বিক্রি করে।
