বলেন তিনি–এই বিষয়ে তুমি একটা লেখা দিতে পারবে? একটা ভালো কাগজে দেব লেখাটা। পারলে লেখো৷
আমি এর আগে কোনদিন প্রবন্ধ লিখিনি। আত্মকথা লিখেছি গল্প উপন্যাস লিখেছি। একটা দুটো কবিতা ছড়াও প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন পত্র পত্রিকায়। কিন্তু প্রবন্ধ কখনও নয়। কারণ এতে মৌলিক কিছুতো থাকে না। এখান থেকে খানিকটা ওখান থেকে খানিকটা এনে জুড়ে জুড়ে দেওয়া। আমার কেন জানি না একে কুম্ভীলক বৃত্তি বলে মনে হয়। অপরের শ্রমের ফসল আত্মসাৎ বলে মনে হয়। প্রবন্ধ লিখতে গেলে হীনমন্যতা এসে হাত চেপে ধরে। তাই বলি–চেষ্টা করব। এরপর আমি যারা দলিত বুদ্ধিজীবী তাদের দুতিন জনের সাথে যোগাযোগ করে বলি–এই বিষয়ে একটা লেখা দিন, খুব বড় কাগজে ছাপা হবে। কিন্তু তারা আমার কথার উপর ভরসা রাখতে পারে না।
এইসব দলিত লেখক কবি বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে আমার পরিচয় অল্পদিনের। আসলে আমি তো এই ফ্রন্টে কোনদিন কাজ করিনি। আমার গল্পের মধ্যে রীবাজ অতিথি সেবা আর উপন্যাসের মধ্যে চন্ডাল জীবন ছাড়া অন্যকোন রচনাকে তো দলিত সাহিত্য বলে ছাপও মারা যাবে না। আমি এতকাল যে ফ্রন্টে কাজ করেছি সে এদের কাছে এক অন্ধকার মহাদেশ। তার বিষয়ে এরা কোন খোঁজ খবর রাখে না, আম্বেদকর জ্যোতিবা ফুলে পেরিয়ার হয়ে কাশীরাম মায়াবতী এই এদের জানার জগত। এরা আমাকে জানে এক গরিব রিকশাঅলা–একটু লেখে টেখে। এদের যদি বলি যে, রাষ্ট্রসংঘের দলিত দাসতা নিধির তিন বছরের জন্য সম্মাননীয় অধ্যক্ষ স্বামী অগ্নিবেশ আমার পরিচিত, তাহলে সেটা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মিথ্যা বলে ভাববে। এরা তো আমার অতীত জানে না। তাই বিশ্বাস করে না।
এখানে আর একটা কথা বলা বোধ হয় অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, কাষ্ট এর মধ্যে ক্লাশ আছে, আবার ক্লাশের মধ্যে কাষ্ট আছে। একদলের কাছে যদি আমি চল বা নমঃশুদ্র বলে ঘৃণার পাত্র হই তবে আর একদল ঘৃণা আর উপেক্ষা দেয় শিক্ষাদীক্ষা হীন গরিব রিকশাঅলা বলে। এই জন্যে দুই দলের কাছেই আমি সমান ব্রাত্য। আমাকে তারাই ভালোবাসে যারা কোন দলের বন্ধনে আবদ্ধ নয়।
তারা যখন কেউ লিখলেন না তখন আমাকেই নেমে পড়তে হল কুম্ভীলকবৃত্তিতে। আট নয় মাস ধরে চেষ্টা করি আমি। প্রচুর বইপত্র ঘেটে প্রায় পঞ্চাশ ষাট পাতার একটা লেখা তৈরি করি। সেটি মীনাক্ষী দিদির হায়দারাবাদের ঠিকানায় পাঠিয়ে দিলে উনি নিজস্ব একটি ভূমিকার সাথে কেটে ছেটে দশ পনের পাতা ইংরাজিতে অনুবাদ করে পাঠিয়ে যেন বিখ্যাত ইংরাজি পত্রিকা, ইকনমিক এন্ড পলিটিক্যাল উইকলিতে।
এরপর সেটি অক্টোবরের তের তারিখ দুহাজার সাত এ প্রকাশিত হয়। একটি আমার দ্বিতীয় লেখা যা ইংরাজিতে প্রকাশ হল। পরে সম্পূর্ণ লেখাটি বর্তিকা পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ২০১০ উৎসব সংখ্যায়।
এই লেখাটির জন্য কোন পারিশ্রমিক পাইনি। মীনাক্ষী দিদি বলেছিলেন কিছু টাকা দেবেন। জানিনা ই.পি.ডব্লু ওনাকে কিছু দিয়েছিল কীনা। এখন তো মীনাক্ষী দিদি মারা গেছেন। আর কিছু জানাও যাবে না। তবেই.পি.ডব্লুতে লেখাটি প্রকাশিত হবার পর সারা ভারতবর্ষের দৃষ্টি পথে এসে যায় মনোরঞ্জন ব্যাপারীর নাম। দিল্লি হায়দরাবাদ মহারাষ্ট্র বিভিন্ন জায়গা থেকে বুদ্ধিজীবী মানুষের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ আসতে থাকে যোগ দেবার জন্য।
সুদুর কানাডায় বসে ইন্টারনেটে লেখাটি পড়ে কলকাতায় এসে গরু খোঁজার মত আমাকে খুঁজে বের করেন কল্পনা বর্ধন। ইনি সেই কল্পনা বর্ধন যিনি বাংলার এক শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক অদ্বৈত মল্ল বর্মনের শ্রেষ্ঠ রচনাকৃতি–তিতাস একটি নদীর নাম,ইংরাজিতে অনুবাদ করে পৌঁছে দিয়েছেন পৃথিবীর বহু পাঠকের কাছে। তিনি জানান যে–তিনি অক্সফোর্ড প্রেসের পক্ষ থেকে বাংলা সাহিত্য সংকলনের একটা দায়িত্ব পেয়েছেন। তাতে আমার ওই লেখাটি–lts there Dalit writing in Bangla? সন্নিহিত করতে চান। আমি এতে সম্মত আছি কিনা? এ যেন কোন বুভুক্ষকে প্রশ্ন করা সে পোলাও খেতে চায় কীনা। এক মুহূর্ত দেরি করিনি। লিখিত অনুমতি দিয়ে দিয়েছি। আর সেটি প্রকাশিত হয়ে গেছে।
.
মহাভারতে পড়েছি মহারাজ যুধিষ্ঠিরকে স্বর্গে নিয়ে যাবার জন্য স্বর্গ থেকে একখানা রথ নেমে এসেছিল পৃথিবীতে। কেমন ছিল সে রথখানা! আমি জানি না। আজ আমার ভাঙা ঘরের সামনে দাঁড়ালো একখানা দুধ সাদা গাড়ি। যেমন গাড়ি চেপে একদিন বস্তার জেলার ঘন জঙ্গল থেকে যাত্রা করেছিলাম দল্লীর দিকে। ভারতবর্ষের উথাল পাথাল এক রাজনৈতিক ইতিবৃত্তের অংশভাগী হতে। আজ আবার সেইরকম আর একখানা গাড়ি এসেছে আমাকে মাটি থেকে মহাকাশে নিয়ে যাবার জন্যে।
।গাড়ি থেকে নেমে এলেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক ডঃ সায়ন্তন দাশগুপ্ত। উনি একটি বার্তা নিয়ে এসেছেন হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগের প্রধান ডঃ টুটুনমুখার্জীর কাছ থেকে। যিনি পরে আমাকে এক চিঠিতে লিখেছিলেন, যে বাংলায় দলিত সাহিত্য বলে যে কিছু আছে তা উনি এই প্রথম আমার লেখার মাধ্যমে জানতে পেরেছেন। তাই তিনি উদ্যোগ নিয়েছেন বাংলা দলিত সাহিত্যের একটি সংকলন প্রস্তুত করবেন। যা ইংরাজিতে অনুদিত হয়ে অক্সফোর্ড প্রেস দ্বারা প্রকাশিত হবে। এবং উনি না বললেও এটা বোঝা যায় সেটি সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে যাবে। তাই আমার সহযোগিতা চাই।
