এবার মীনাক্ষী দিদি আর একবার অবাক হলেন। কারণ বইয়ে যে মনোরঞ্জন সে অনেক কিছু করেছে তা সত্য, কিন্তু সে লেখেলিখতে পারে, তেমন কোন ইঙ্গিত তো নেই। তাই বিস্মিত গলায় জানতে চান–তুমি লেখো? মাথা নাড়ি আমি, লিখি। একাশি সাল থেকে লিখছি। আমার লেখা হিন্দি ইংরাজিতেও অনুবাদ হয়েছে। তারপর আমার দুটো উপন্যাস-ছন্নছাড়া ও বাতাসে বারুদের গন্ধ পড়তে দেই তাকে। কিছুক্ষণ পরে উনি জানতে চান–বাংলায় দলিত সাহিত্য বলে কি কিছু আছে?
দলিত। বাংলায় এই শব্দটার এত ব্যাপক প্রচলন নেই। এখানে দলিত অচ্ছুত অস্পৃশ্য এ সব বোঝাতে ছোটজাত ছোটলোক এই সব শব্দের প্রয়োগ হয়। কেউ কেউ একে একটু ভদ্রোচিত করে ইংরাজি মোড়কে মুড়ে বলে থাকেন সিডিউল কাস্ট বা সিডিউল ট্রাইব। যাদের সামাজিক সম্মান থেকে বঞ্চিত বা দলন করা হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গে একদল বুদ্ধিজীবী আছেন–অবশ্যই তারা বর্ণবাদী ব্যবস্থার উপর দিকের বাসিন্দা, তারা বলেন থাকেন যে–যা সাহিত্য তা সবার পক্ষে হিতকারক। সাহিত্যের কখনও দলিত–অদলিত এমন শ্রেণি বিভাগ হয়না। আর কিছু বিশ্বাস মন্ডল বাগ এমন পদবিধারী বুদ্ধিজীবী মানুষ বলে থাকেন যে-হয়। সাহিত্যেরও শ্রেণি বিভাগ হয়। বৈষ্ণব সাহিত্য, মুসলিম সাহিত্য, মার্কসীয় সাহিত্য, প্রগতিশীল সাহিত্য–এই সব শব্দের মধ্য দিয়ে যেমন একটা বিশেষ ধারা বা মতবাদ বা বিশিষ্টতার প্রকাশ ঘটে–যা সাহিত্যের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েও সাহিত্য ধারাকেই পরিপুষ্ট করে–তেমনই জন্ম জনিত কারণে অপরাধী ঘোষিত মানুষেরা তাদের জীবনযন্ত্রণা প্রেম দ্রোহ প্রতিরোধ ও প্রতিশোধ নিয়ে যা রচনা করে তাকে অবশ্যই দলিত সাহিত্য বলা যাবে।
এখানে তারা একটি শর্ত দিয়েছেন–দলিত জীবন নিয়ে যে কেউ লিখলেই সেটা দলিত সাহিত্য হবে না। অবশ্যই রচনাকারকে হতে হবে জন্মসূত্রে দলিত পরিবারের সন্তান। আর–ওই, লিখতে হবে দলিত জীবনের ব্যথা বেদনা অনাহার অপমান বিষয়ে। যে কারণে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মানদীর মাঝি দলিত সাহিত্য নয়, আর রবীন্দ্র পুরস্কার প্রাপ্ত বিনয় মজুমদার নন-দলিত কবি। তার কবিতায় কোন দলিত যন্ত্রণা নেই। আর পদ্মানদীর মাঝিতে যে দলিত জীবন, তা দলিতের মর্যাদা বাড়ায় না।
দলিত বুদ্ধিজীবীদের স্বপক্ষে এটা বলা যায় যে–অদলিত কথাশিল্পীদের কলম থেকে নিম্নবর্নের মানুষের জীবন নিয়ে অনেক উৎকৃষ্ট সাহিত্য রচনা হয়েছে, কিন্তু নিম্নবর্গের মানুষকে নিয়ে সেভাবে বিশেষ লেখা হয়নি। এটা একদিক থেকে মন্দের ভালো। কারণ তারা যা রচনা করতেন তাতে দলিত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে অনেক ত্রুটি বিচ্যুতি দেখা যেত। এমন কি যথার্থ তো নয়ই তার উল্টোটা মনে হতো। পদ্মানদীর মাঝির একটি চরিত্রকেও মহৎ করে গড়তে পারেননি মানিকবাবু। সেকী তিনি সচেতন ভাবে করেছেন? নাকি তার মনের মধ্যে ঘাঁটি গেড়ে বসে থাকা বর্ণবাদী চিন্তা তাকে দিয়ে এসব করিয়ে নিয়েছে? অ-দলিত লেখক এমন ভুল করেই ফেলবেন।
একটি বিশিষ্ট দৈনিক পত্রিকা আমি পড়ি। তাতে মাঝে মাঝে একটা শব্দ দেখি, চুরি চামারি। চুরি চামারির চোটে দেশটা উচ্ছন্নে গেল। প্রায়শই মানুষের মুখে শুনি। তা চুরি তো একটা বাজে কাজ সেটা সবাই মানে। কিন্তু চামারি কাজটা বাজে হল কেন? একজন মানুষ পেটের জ্বালায় চামড়া ছেলে, সেটা কী তার অপরাধ! এমন অপরাধ যা চোরের সমতুল? এই শব্দ অ-দলিত বুদ্ধিজীবীর কলম থেকে বের হয়ে যাবে। কিন্তু কোন দলিত লিখতে পারবে না। একটা বিশাল জনগোষ্ঠিকে অপমান করতে তার দলিত চেতনা তাকে বাধা দেবে।
এই প্রসঙ্গে মুনশি প্রেমাদের কথা বলা যায়। দলিত জীবন নিয়ে উনি যত লিখেছেন ভারতীয় ভাষা সাহিত্যের আর কেউ লিখেছে বলে আমার জানা নেই। ওনার কফন একটি অসাধারণ গল্প। কিন্তু যেহেতু তিনি নিজে কায়স্থ-দলিত নন, তাই ঘিসু আর মাধব এই দুই পিতা পুত্রের কুৎসিত কদাকার চরিত্রের এমন এক ছবি বানাতে পারলেন। তারা তাদের এক নিকট আত্মীয়ের মৃতদেহ ঢাকবার জন্য কাপড় (কফন) কেনার টাকা যা তারা চেয়েচিন্তে যোগাড় করেছিল, মদ খেয়ে উড়িয়ে দিল। দলিতেরা এমন নিষ্ঠুর অমানবিক হৃদয়হীন নরাধম?
যদি কোন দলিত লেখককে ওই কাহিনী দ্বিতীয়বার লিখতে বলা হয়, সে কোন দিন ওইভাবে কাহিনী শেষ করতে পারবে না। হাত কেঁপে যাবে তার। কারণ দলিত জীবনের যথার্থতা সে নিজের জীবন থেকে জানে। সে লিখবে মাধব আর ঘিসু কফন কিনতে গিয়ে হোটেলের টগবগে ফোঁটা ভাতের গন্ধে বিহ্বল হয়ে পড়ে। মনে পড়ে যাবে তাদের, যে, বহুকাল তারা ভাত পায়নি। তখন একজন আর একজনকে বলবে যে মরে গেছে সে তো গেছে। আয় আমরা একটা দিন বাঁচি। ভাত খাই।
এইজন্য দলিত লেখকেরা অ-দলিত লেখকদের দলিত জীবন বিষয়ক লেখাকে বলে থাকেন সহানুভূতি সাহিত্য। যা সমান অনুভূতি বা দলিত সাহিত্য নয়। মীনাক্ষী দিদি আমাকে সেই সাহিত্যের কথা জিজ্ঞাসা করেছেন, যা দলিতদের দ্বারা রচিত ও দলিত জীবনের দুঃখ বেদনা সমাজ সংস্কৃতির উপর বিন্যস্ত।
বলি তাকে আমি–আছে। মূলস্রোত থেকে সরে অন্তঃশীলা সে সাহিত্য খুব ধীর গতিতে প্রবহমান। অদ্বৈত মল্লবর্মনের পরে এই সমাজে তেমন কোন শক্তিমান লেখক এখনও আসেনি, গুণমান উৎকর্ষতায় যা বাংলা সাহিত্য অঙ্গনে বিশেষ স্থান দখল করে নিতে পারে। সেটা পারলে তো আপনি আজ আমাকে এই প্রশ্ন করতেন না। তবে আছে।
