প্রথমত, এখানে বিরোধী দল বলে আর কিছু থাকবেইনা। থাকবে, যেমন ভিলাই শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক ইউনিয়ন আছে। কথিত শ্রমিক নেতাকে আগে গিয়ে মালিকের সঙ্গে দেখা করে কোন বিষয়ে আন্দোলন করা হবে জানিয়ে তার অনুমোদন নিতে হয়। গোডাউনে মাল জমে গেলে নেতাকে মালিক হুকুম দেয়-সাতদিনের জন্য ধর্মঘট করে দাও।তখন মিছিল মিটিং আগুন ছেটানো বক্তৃতা হয়। আন্দোলন হয়, তার আগে নয়।
সেই যে মমতা ব্যানার্জী যাদের বলেছিলেন তরমুজ, তারাই গণতন্ত্রের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে বিরোধীর ভূমিকা পালন করবে। যারা তরমুজ হবে না, নিখোঁজ হয়ে গিয়ে সুশান্ত কোন কর্মীর দ্বারা উপরে নুন নীচে নুন নিয়ে কবরে গিয়ে ঘুমাবে। পচবে জেলে, পালাতে হবে রাজ্যের বাইরে। তখন পাড়ায় পাড়ায় ওয়াচকমিটি হবে। সিপিএমের লোকেরা নজর রাখবে, কোন লোকটা আমাদের বিরুদ্ধে কী কথা বলছে। কে গণশক্তি কিনছে না, পার্টিকে খুশি মনে চাদা দিচ্ছে না, মিছিল মিটিংয়ে যাচ্ছে না। হাড়গোড় ভাঙা হবে তার কোনো ছুতো পেলেই। ছুতো না পেলে ছুতো তৈরি করে নেবে। ওরা পারে না এমন কোন অপকর্ম পৃথিবীতে নেই। নৃশংসতায় এরা তালিবানেরও বাপ, নাৎসিদের জ্যাঠামশাই।
মাত্র এক বছর পরে তাই আবার সিপিএম মরিয়া চেষ্টা শুরু করেছে নতুন সরকারকে বিপাকে ফেলার জন্য। আবার সেই মরা গাছের গোড়া থেকে লতপত করে বেড়ে উঠছে একটা সরু ডগা। এই বর্ষার জল পেয়ে অসীম স্পর্ধায় আকাশের দিকে মাথা উঁচু করছে। এখনই ওটাকে নির্মূল করা দরকার। না হলে দেরি হয়ে যাবে।
.
আমার বাড়ির সামনে একখানা গাড়ি এসে থেমেছে। কেন এই গাড়ি তা বলতে হলে আমাকে একটু পিছিয়ে যেতে হবে।
সেটা ২০০৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর। সকাল বেলা আনন্দবাজার পত্রিকার পাতা খুলে চোখ আটকে গেল একটা সংবাদে। আজ সন্ধে ৬টায় অক্সফোর্ড বুকস্টোরে অলকা সারাওগীর উপন্যাস শেষ কাদম্বরীর ইংরাজি–বাংলা, ইতালী অনুবাদ প্রকাশ অনুষ্ঠান। প্রকাশ করবেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। উপস্থিত থাকবেন ইতালির আন্তোনিয়ো সিলভি।
আর কী আমি থাকতে পারি? মন উতলা হয়ে উঠছে আমার। চোখে জল এসে যাচ্ছে। এই সেই বই যাতে আমার নামের একটা চরিত্র আছে। তাই জলভরা চোখে ছুটে যাই টিচার ইনচার্জের টেবিলের সামনে–বড়দি। বড় দুঃসংবাদ, আমাকে ও বেলা ছুটি দিতে হবে তালদিতে আমার শাশুড়ির মরণাপন্ন অবস্থা, আমার যেতেই হবে।
ছুটি নিয়েই ছুটে যাই পার্কস্ট্রিটে–অক্সফোর্ড বুক স্টোরের সামনে। যে ভবনে বই প্রকাশ অনুষ্ঠান তা থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে অবস্থিত আমেরিকান দূতাবাস। যার উপর ষাট সত্তর দিন আগে মুসলিম জেহাদিরা হামলে পড়েছিল ক্ষুধার্ত হায়নার মতো। এখন ওসামা বিন লাদেনের অনুগামিদের একটাই কর্মসূচি–আমেরিকানদের মারো।
ইতালি আমেরিকার একটা মিত্র দেশ। এই কদিন আগে আমেরিকা ইতালি আর বৃটেন মিলে গুঁড়িয়ে দিয়েছে ইরাককে। আজ এই ভবনে ইতালি দূতাবাসের কিছু লোক আসবে। বলা যায় না, তাদের উপর আছড়ে পড়তে পারে কোন মানব বোমা। সুরক্ষার ব্যবস্থা তাই খুবই কড়া।
এক সময় আমি ধীরে ধীরে বুক স্টোরের প্রধান প্রবেশ পথের সামনে গিয়ে দাঁড়াই। দ্বার আগলে দুজন দীর্ঘদেহী দারোয়ান–একজন প্রশ্ন করে–হোয়াট ডু ইউ ওয়ান্ট। আমি একথার মানে বুঝি না, বোকার মতো মাথা নাড়াই। তারপর নিজের মাতৃভাষায় বলি–এখানে যে অনুষ্ঠান হচ্ছে–আমি যাব।
কার্ড প্লিজ। অর্থাৎ আমন্ত্রণ পত্র দেখতে চাইছে। কত লোক যাচ্ছে, কারো কাছে চায়নি। শুধু আমার কাছে। আমার চেহারা পোষাক এই ভবনের উপযুক্ত যে নয়। বলি–নেই। সে আঙুল তুলে বলে–গো এ্যাওয়ে। আমার কানে তা আসে–গেট আউট হয়ে।
কী আর করি! এক বুক নিরাশা নিয়ে গেট ছেড়ে ফুটপাতে নেমে দাঁড়াই। চারদিকে তাকাই যদি কোন চেনা কাউকে পাই।
ভাগ্য আমার ভালো, কিছুক্ষণ পরে দেখি–গাড়ি থেকে আমার সামনে অলকা দিদি এসে নামলেন। জিজ্ঞাসা করলেন, কখন এসেছেন? বলি–এই তো সবে।
চলুন ভিতরে যাই।
চলুন।
দারোয়ান অলকা দিদিকে চেনে। তার সাথে যেতে দেখে এখন সে আর আমার পথ আটকাল। সভা ঘরে ঢুকে আমার ভীষণ ভয় ভয় করছিল। চারদিকে ফরসা দামি দামি জামাপ্যান্ট পড়া ইংরাজিতে অনর্গল কথাবলা লোকজন এখানে আমার মত একজনও নেই।
না, আছে। আমার মত গায়ের রঙ একজন আছে। যদিও তিনিই আজকের অনুষ্ঠানের মধ্যমণি। মঞ্চ আলো করে বসে আছেন। আহা, কালোর কী অপরূপ আলো! তিনি আর কেউ নয়, কবি সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। বাংলা শেষ কাদম্বরীর প্রকাশ হল তাঁরই হাত দিয়ে।
সে যাই হোক, অনুষ্ঠান শেষে যখন নীচে নেমে এসেছি, অলকা দিদি আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন এক সুশ্রী বৃদ্ধা মহিলার সঙ্গে। ইনি হায়দারাবাদে থাকেন, নাম মীনাক্ষী মুখাজী। ইনিই হিন্দি থেকে বাংলায় শেষ কাদম্বরীর অনুবাদ করেছেন। বলেন অলকাদিদি, এই যে–এই হচ্ছে মনোরঞ্জন ব্যাপারী। মীনাক্ষী দিদিবইয়ের পাতায় বার বার এইনাম দেখেছেন। সেই নামের একজন রক্তমাংসের মানুষ দেখে বিস্মিত হন তিনি–আমি তো ভেবেছিলাম চরিত্রটি কাল্পনিক। আশ্চর্য তো!
আমি তখন বলি–অলকা দিদি তার বইয়ে আমার নামে চরিত্র রেখেছেন। এবার আমি আমার বইয়ে অলকা দিদির নামে একটা চরিত্র রাখবো।
