তবে লড়াই এখনও শেষ হয়নি, শুরু হয়েছে মাত্র। বোতলের দৈত্যকে বোতলে ঢুকিয়ে গভীর সমুদ্রে নিক্ষেপ না না করলে সে কোনদিন কোনো এক অসতর্ক মুহূর্তে আবার মানুষের জীবন সম্পত্তি সম্ভ্রমের উপর হামলে পড়তে পারে। ওরা সেই সুযোগের অপেক্ষায় আছে। প্রতিক্ষণ তাই সতর্ক থাকা জরুরি।
.
একটা চৌরাস্তার মোড়। সেখানে আছে একটা বাস স্ট্যান্ড।বহু লোকের যাতায়াত এই পথে। ছোট ছোট ছেলে মেয়ে স্কুলে যায়। দোকান, বাজার, অফিসে যায় শত শত লোক। কিন্তু সেখানে কোনো ছায়া নেই। গ্রীষ্মকালে রোদের তাপে সবার বড় কষ্ট হয়।
মোড় থেকে কিছুদূরে থাকেন একজন মানুষ। সেই যে যাদের মাথায় অনবরত উকুনে কামড়ায়–কিসে মানুষের মঙ্গল হবে–সেই রকম একজন মানুষ। তিনি একদিন একটা বটের চারা এনে পুতে দিলেন মোড়ের মাথায়। সার দিলেন, জল দিলেন, চারাগাছের চারদিকে ঘেড়া দিলেন যেন গরু ছাগলে মুড়িয়ে খেয়ে না যায়।
দিনে দিনে গাছটা বড় হতে লাগল। আকাশে ছড়িয়ে দিল শাখা প্রশাখা।তিরিশ চল্লিশ বছরে সেই ছোট্ট চারা মহীরুহ হয়ে উঠল। একদিন দেখা গেল সেই গাছের গোয় একটা দেবদেবীর মন্দির গড়ে উঠেছে। সেইসব দেবদেবী মানুষের কোনো মঙ্গল করল তা কে জানে। তবে মন্দিরকে কেন্দ্র করে একটা আখড়া জমে গেল গঞ্জিকা সেবীদের। গাঁজার ধোঁয়ার কটু গন্ধে পথচলা মানুষের নাক জ্বালা শুরু হয়ে গেল।
কিছুদিন পরে শুরু হল আর এক নতুন উপসর্গ। কোথা থেকে কে জানে একঝক শকুন এসে বাসা বাঁধল তার ডালে ডালে। দিনরাত তাদের ঝাঁপটা ঝাঁপটি ডাকাডাকি কামড়াকামড়িতে পরিবেশটা বিচ্ছিরি হয়ে উঠল। তার উপর শকুনের গায়ের গন্ধ, ঠোঁটে করে ভাগাড় থেকে নিয়ে আসা পচা গলা মাংস–এদিক সেদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাওয়ায় মানুষের পথচলা দুঃসাধ্য হয়ে গেল।
সেই যে মানুষটা–যিনি একদিন গাছটা পুতে ছিলেন, যখন গাছটা একটু একটু করে বড় হচ্ছিল দেখে মনটা ভরে গিয়েছিল তার। যখন সেই গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে শ্রান্ত পথিক বিশ্রাম নিত, ভাবতেন তিনি, জীবনে একটা কাজের মতো কাজ করেছি। বটবৃক্ষ অমর। আমি যেদিন থাকব না, গাছটা থাকবে। সেদিনও সে পরিশ্রান্ত পথিককে শীতল ছায়া দেবে।
কিন্তু আজ সেই গাছটাকে দেখে আঁতকে উঠলেন তিনি। দীর্ঘদিনের সযত্নে লালিত স্বপ্ন-বাসনা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। এ আমি কী করেছি! আত্মগ্লানিতে মন মুচড়ে উঠল তার। এমনটা যে হবে সে তো কোনোদিন ভাবেনি। পুরো পরিবেশটা যে পূর্তিগন্ধময় নরক হয়ে যাচ্ছে। বটবৃক্ষ যে পরিবর্তিত হয়ে গেছে বিষবৃক্ষে। এখন মানুষকে, সমাজকে, পরিবেশকে কী করে রক্ষা করা যাবে?
ভাবলেন তিনি গাছটাকে গোড়া থেকে কেটে ফেলবেন। তখনই মনে পড়ল সেটা বর্তমান আইনে দণ্ডনীয় অপরাধ। জেল খাটতে হতে পারে। শকুনগুলোকেও মেরে ফেলা যাবে না, আইনে ওটাও অপরাধ। মন্দিরটাকেও ভেঙে ফেলা চলবে না, সেটা ধর্মবিশ্বাসীদের আঘাত দেবে। সংবিধান ঘোষণা করে রেখেছে, কারও ধর্মবিশ্বাসে আঘাত দিলে সেটাকে শান্তিযোগ্য অপরাধ বলে মানা হবে। তাহলে এখন উপায়? জনসাধারণের স্বার্থে কাউকে দরকার, কাউকে না কাউকে ওটাকে মারার দায়িত্ব নিতে হবে।
কে নেবে সে দায়িত্ব? ভাবে লোকটা–আমি। আমাকেই সেই সামাজিক দায়িত্ব পালন করতে হবে। আমার কৃতকর্মের অপরাধ আমাকেই স্খলন করতে হবে।
যে কাজ গোপনে—লোক চক্ষুর আড়ালে করা হয় সে কর্মের কথা প্রকাশ হয়ে পড়লে লজ্জায় মুখ লুকাতে হয়–লোকটা জানত, সেটাই অপকর্ম। তাহলে ভোটদান সেটা কি? সেটাও তো লোকচক্ষুর আড়ালে অতি সঙ্গোপনে সেরে নিতে হয়। যে গোপন ক্ষমতার বলে বদলে ফেলা যায় শাসককেও এই গোপন কর্মটি যখন অপকর্ম নয়, তখন অন্য দু-একটা কাজও নিশ্চয় গোপনে করায় বাধা নেই, যদি তা জনহিতে করা হয়।
মানুষের সবচেয়ে প্রবল প্রতিপক্ষ সে নিজে। তাকে সবচেয়ে বেশি বিড়ম্বনায় ফেলে তার মন। মনের কাছে জবাবদিহি করতে হয় সবচেয়ে বেশি। যখন সে মনের কাছে মাথা উঁচু রাখার যুক্তি নাগালে পেয়ে গেল, এক গভীর রাতে ঘর থেকে কাটারি হাতে বেরিয়ে গিয়ে গাছটার চারদিকের মোটা ছাল চেঁছে তুলে নিল গোল করে। এতে কোনো শব্দ হলো না। কেউ টের পেল না। ফলে গাছ আর মাটি থেকে যথেষ্ট পরিমাণে রস শোষণ করতে না পারায় ধীরে ধীরে শুকিয়ে মরে গেল।
এরপর যা হয়–শকুনগুলো উড়ে পালাল অন্য কোন দিকে। গাঁজাখোরেরা সরে গেল অন্য কোনো ছায়ার সন্ধানে। মন্দির ভেঙে পড়ল সংরক্ষণের অভাবে। গাছটাকে আবর্তন করে যা যা জমে উঠেছিল সেসব আর কিছুই রইল না। আর একদিন শুকনো গাছটাকে কারা যেন কেটেকুটে নিয়ে চলে গেল। পরিচ্ছন্ন হয়ে গেল পুরো পরিবেশ। হাঁফ ছেড়ে বাঁচল পথ চলা মানুষ।
গাছটা মারা গিয়েছিল গত বছর ঠিক সেই সময়, যখন ভোটে বামফ্রন্ট সরকারের বিচ্ছিরিভাবে পরাজয় ঘটে। এই এক বছর সিপিএম দলটা বড় ম্রিয়মান হয়ে বসেছিল মণিহারা ফণীর মতো। সেই যে মোগল সাম্রাজ্যের কালে কিছু ক্ষমতালোভি তখৎ ইয়া তাবুদ বলে মেতে উঠেছিল মরণপণ দন্দ্বে, সিপিএম দলও এখন মেতে উঠেছে। যে কোনো কৌশলে আবার রাইটার্স দখল করতে হবে। কোনো নীতি নয়, আদর্শ নয় পাখির চোখের মতো তাদের একমাত্র লক্ষ্য আবার ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করা। যদি কোনভাবে তাতে একবার সফল হয়, আগামী পঞ্চাশ বছরে আর তাদের কেউ ভোটে হারাতে পারবে না।
