খবরটা বাতাসের বেগে দিকে দিকে ছড়িয়ে যায়। একটা লোক মারাত্মক বিপজ্জনক, বিষবাহক। রে রে করে ছুটে আসে সবাই।
মানুষ হয়তো মানুষ বলেই মানুষকে বাঁচাবার চাইতে মারবার ব্যাপারে অধিক উৎসাহী। জ্ঞান বিজ্ঞানের বিশাল অংশ ব্যয় হয় মারণ গবেষণায়। কত শত শ্রেষ্ঠ মানবসন্তান নিভৃত গবেষণায় ব্যাপ্ত কত সহজে মানবকুলকে ধ্বংস করা যায় সেই মারণাস্ত্র উদ্ভাবনে।
যে লোকগুলো শুড়িখানার সংরক্ষক ও সঞ্চালক তারা হামলে পড়ে নব গোয়ালার উপর। তাদের ক্রোধই যেন সর্বাধিক। কেন না তারা, একমাত্র তারাই দুধের অপকার উপকার সব চেয়ে বেশি জানে।
সেই অদ্ভুত অঞ্চলের অদ্ভুত লোকরা গোয়ালার মুখে থুথু ছেটায়, অশ্রাব্য বাক্যবাণে বিদ্ধ করে। অপমানিত অবসন্ন নব গোয়ালা আত্মগ্লানিতে মরে যেতে অনুধাবন করতে পারে বুড়ো বাপের শেষ সতর্ক বার্তা–বাপরে, মাতালের পাড়ায় যাস না। ওখানে দুধওয়ালার মান থাকে না।
.
বড় সাহেবকে আর বাঁচানো গেল না। ভারতবর্ষের এক প্ৰথমশ্রেণির চিকিৎসা কেন্দ্রের দুষ্প্রাপ্য চিকিৎসকদের দুর্মূল্য চিকিৎসার পরেও একটা চোখ তার নষ্ট হয়ে গেল। ভাগ্যের কী নিদারুণ পরিহাস! একদা এই এরাই একদিন কংগ্রেস নেতা অতুল্য ঘোষকে একটা চোখ অন্ধ থাকার কারণে নাম দিয়েছিল কানা অতুল্য, কানা বেগুন।
অতুল্য ঘোষ একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী। তার চোখটা নষ্ট হয়েছিল ইংরেজ পুলিশের লাঠির আঘাতে। এই কারণে দেশবাসীর তার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত ছিল। তা তো নয়, উল্টে এই ধরনের রাজনেতারা তাদের কর্মী সমর্থকদের শিখিয়েছিল তাকে ব্যঙ্গ বিদ্রূপ অপমান করতে। সম্মানীয়কে অপমান, মর্যাদাবানদের মর্যাদা নাশ,কীর্তিবানদের নামে কুৎসা ভারতীয় কৃষ্টি সংস্কৃতি ঐতিহ্যকে অস্বীকার–এই সব অপকর্মকে হাতিয়ার করে কীভাবেবঙ্গের মাটিতে বিদেশি ভাবধারার শেকড় বসানো যায় তারই প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছে এরা জন্মলগ্ন থেকে। স্বদেশের সবকিছু বাতিল বর্জ নিন্দনীয় আর রাশিয়া চিনের সবকিছু মহান এবং শ্রেয় এই রকম একটা জনভাবনা নির্মাণে এদের ভূমিকা ছিল অতি উগ্র বিবেকানন্দ তাই অচল। নেতাজিতাই তোজোর কুকুর, সাম্রাজ্যবাদের দালাল, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বুর্জোয়া কবি, বঙ্কিম, বিদ্যাসাগর, রামমোহন কেউ নমস্য নয়?
যাঁরা শ্রদ্ধেয় সম্মানীয় পূজনীয় তাদের অবজ্ঞা অস্বীকার অপমানকারী যে রাজনীতির অতি সুচতুর ভাবে আমদানি করা হয়েছিল এদেশে শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির মূলোচ্ছেদের অপপ্রয়াসে, অতি ধূর্ত সেই একদল মানুষের পিছনে কোনো বিদেশি চক্রের ইন্ধন ছিল, সুদূর প্রসারি পরিকল্পনার চক্রান্ত জাল ছিল, যা এখন মহীরুহ হয়ে উঠেছে। একটা গোটা জাতি যে জাতি আজ যা ভাবে, কাল তা ভাবে সারা ভারত, তার নীতি নৈতিকতার চুড়ান্ত অধঃপতন ঘটিয়ে দেওয়া গেছে। আর যে তার বাঁকা কোমর সোজা করে উঠে দাঁড়িয়ে দেশকে পথ দেখাবে-প্রত্যয় হয় না। প্রতিবাদ প্রতিরোধের সেই দৃঢ় দৃপ্ত চেতনাকে ভোগবাদের সপ্ততল নরকের দিকে চালিত করতে পেরে এখন সুখ নিদ্রা দিতে পারছে দেশকে শুষে ছিবড়ে বানিয়ে দেওয়া বেনিয়া বুর্জোয়া শ্রেণির মানুষ। আর তাদের শোষণ সাম্রাজ্যকে আতঙ্কে প্রহর গুনতে হবে না। যুগ যুগ জিন্দাবাদ হয়ে থাকবে সর্বশক্তিমান পুঁজিবাদ।
যে কোন গণ-আন্দোলনের প্রথম সারিতে থাকে দেশের ছাত্র-যুব সম্প্রদায়। সেই যুব ছাত্রদের মন যদি দেশের সবকিছুর প্রতি শ্রদ্ধাহীন-নীতি নৈতিকতাহীন–আত্মসুখ সর্বস্ব ‘বিশ্ব নাগরিক বানিয়ে দেওয়া হয় তার কাছ থেকে দেশ, দেশের মানুষ, মহৎ কিছু পাবার আশা করতে পারে না। আজকের যুব সমাজ তাই এমন সমাজ বিমুখ। এত উচ্ছৃঙ্খল-উদ্দাম।
অতি দুঃখের বিষয়, বঙ্গে এই জিনিসের আমদানি ঘটিয়েছে তারা যাদের প্রতিশ্রুতি ছিল মানুষকে বিচ্ছিন্ন না রেখে সমাজের সার্বিক কল্যাণে যুক্ত করে পরিপূর্ণ সামাজিক মানুষ হিসাবে গড়ে তোলার। তাদেরই আশ্রয়ে প্রশ্রয়ে বেপথু যুব জনতা প্রমোটারি, জমির দালালি, সাপ্লাই, সিন্ডিকেট এইসব করে গাদাগুচ্ছের অন্যায় উপার্জনের অর্থ খরচা করছে আরও কোন অন্যায় উদ্দেশ্যে। এইযুবকদের ব্যবহার করছে সিপিএম দল তাদের শাসনক্ষমতাকে কুক্ষিগত করে রাখার কুপ্রয়াসে।
এটা বড় অন্ধকার সময়, অরাজক অন্ধকার। যে সময় দুর্বলের গলার আওয়াজ, কান্নার শব্দ চাপা পড়ে যায়, শাষকের সবল বুটের আওয়াজের নীচে। সেই যে এক কবি বলেছিলেন–শাসক আর শশাষকের নিষ্ঠুর সংহতি–যাতে জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। তবু মানুষ প্রতিবাদে পথে নামতে সাহস পায় না। বুক জুড়ে দাপায় নিদারুণ এক ভয়। সেই সাতাত্তর সাল থেকে দুহাজার এগারো–এতগুলো বছর ধরে মানুষ আর্তনাদ করছিল আর কামনা করছিল-একজন কেউ একজন ভয়কে জয় করে সামনে এসে দাঁড়াক। সাহসের মন্ত্রে সঞ্জীবিত করুক মৃতপ্রায় মানুষকে। আমরা এগিয়ে যাই তার পিছনে দুঃসহ রাত্রির বুকে সূর্য জ্বেলে দিতে। তিমির রাত্রির অবসানে নতুন দিন আসুক।
তোমাকে বধিবে যে গোকুলে বাড়িছে সে, গ্রাম বাংলার অতি পুরানো প্রবাদ। যেন সেই প্রবাদকে সত্যি করে–ঐতিহাসিক প্রয়োজনে, অতি সন্তর্পণে শহর কলকাতার এক খালপাড়ে বস্তিতে বেড়ে উঠছিল এক মেয়ে। সেটা সেই অঞ্চল যেখানে কাল অবসানের দেবী কালিকার মন্দির। সেই মেয়ে যে রূপে ইন্দিরা গান্ধির মতো নয়, সুভাষ বসুর মতো নামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষালাভ করেনি, জন্ম হয়নি কোনো অভিজাত ধনী পরিবারে, নেই কোনো ক্ষমতাশালী দাদা-মামা-কাকা। অতি সাধারণ ঘরের এক আটপৌরে বাঙালি মেয়ে। যাকে দেখলে আমাদের ঘরের মেয়ে বলে মনে হয়, এমন সাদাসিধা বেশবাস। কে জানত যে সে এমন উল্কার মতো, আলো আগুন নিয়ে ধেয়ে এসে আছড়ে পড়বে বঙ্গের রাজনীতিতে। মুহূর্তে লক্ষ লক্ষ মানুষ মিছিল করে দাঁড়াবে তার পিছনে। একশো কুড়ি বছরের সর্বভারতীয় দল কংগ্রেস, সত্তর পঁচাত্তর বছরের কমিউনিস্ট পার্টির হাজার হাজার নেতা কর্মী মুখ থুবড়ে পড়বে তার প্রতাপের সামনে। অর্থের পাহাড়, অস্ত্রের ভাণ্ডার ভেঁতা করে, শুধু মানুষকে সাথে নিয়ে গলা টিপে ধরবে সব জুলুম অন্যায় অত্যাচারের। কে জানত যে বার বার হেরে যাওয়া মানুষ, শ্রমিক কৃষক খেটে খাওয়া মানুষ, লাথি মেরে চূর্ণ করে দেবে স্বৈরাচারী শাসকের দম্ভ-দুর্গ। বিজয় কেতন তুলে ধরবে মা মাটি মানুষের। সেই অসম্ভব সম্ভব হল ২০১১ সালের ১৩ মার্চ। অবসান ঘটল একটা ইতিহাসের কালো অধ্যায়ের। অহমিকার মিনারে বসে মানুষকে অপমান অবহেলার চরম প্রতিশোধ নিল মানুষ। ক্ষমতা কেন্দ্র থেকে বিতাড়িত হল কমিউনিস্ট নামধারি মানবতার শত্রুরা। সেই যে মরিচঝাঁপি দ্বীপে হত্যা, ধর্ষণ, লুঠপাটের মধ্য দিয়ে, হাজার হাজার মৃতদেহের উপর দিয়ে, যাদের স্বৈরাচারের রথ নেতাই পর্যন্ত পৌঁছেছিল–দলিত দমিত নিপীড়িত মানুষ তাকে গতিরুদ্ধ করে দাঁড়াল। অনেক হয়েছে–আর না।
