অনেক পাহাড়, জঙ্গল, পথ পার হয়ে অনেক দিন পর সে এমন এক অঞ্চলে এসে পৌঁছলো যেখানে নদীতে রয়েছে পান করার মত প্রচুর স্বচ্ছ সুমিষ্ট জল। আর মাঠ ভর্তি অঢেল সতেজ সবুজ ঘাস। কারণ এখানকার কেউ গরু পোষে না। গরু যে পোষবার মত একটা প্রাণী, দুধ যে পান করার মত একটা পদার্থ কেউ তা কখনও শোনেনি।
এখানকার প্রত্যেকটি মানুষ যে শিশু কিশোর যুবা যাই হোক, সব নেশাগ্রস্ত। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সবটুকু পথ, তা সে স্বল্প কিংবা দীর্ঘ সরল কিংবা আঁকা-বাঁকা, এরা পার হয়ে চলে আচ্ছন্ন এক নেশার খেয়ালে। এখানে নব জাতকের মুখে কেউ মধু দেয় না, মাতৃবক্ষ থেকে উথলে ওঠা সুধার সমুদ্র উপচে পড়ে না সন্তানের ওষ্ঠে বা অধরে। এখানে মৃত্যু পথযাত্রীকে কেউ হরিনাম শোনায় না, পান করায় না পবিত্র গঙ্গা বারি। শোকে বা আনন্দে উৎসব বা উত্তেজনায় বলতে গেলে জীবনের সর্বক্ষেত্রে এদের অবলম্বন একমাত্র নেশা।
নব গোয়ালা এইরকম অঞ্চলে এসে গরু গোয়াল গোয়ালা নেই দেখে মনে মনে দারুণ পুলকিত। এতবড় বিশাল অঞ্চল, এত মানুষজন আর দুধওয়ালা বলতে সে মাত্র একা। না জানি কতশত লোক তার কাছে আসবে, কদর করবে।কিন্তু এখানে কেন যে কোন গোয়ালা নেই তা সে কী করে বুঝতে পারবে। এ সব গুহ্য রহস্য বুঝতে পারার মত বুদ্ধি তার নেই। কথায় তো বলে যে, গোয়ালাদের বুদ্ধির বিকাশ হয় চোখে তুলসী পাতা দেবার কয়েকঘন্টা আগে।
সে সময় আসতে নব গোয়ালার ঢের বাকি। তবে তার বাপ বুড়ো গোয়ালা সেই চরম মুহূর্তে বলে গিয়েছিল প্রিয় পুত্রকে মাতালের পাড়ায় দুধওয়ালার কী দরকার। ভুলেও যেন যাসনা বাপ৷ গেলে মান পাবি না। মদের উপর দুধ শাস্ত্র মতে বিরুদ্ধ ভোজন। এদের কী ঠিক, লোভে কিংবা স্বাদে নেশা কিংবা কৌতূহলে যদি খেয়ে ফেলে, হজম হবে না। তাতে দুধের অপমান হবে। গোয়ালার অবমাননা হবে। তার চেয়ে দুরে দুরে থাকিস, বাপ। অমৃতও অপাত্রে রাখলে গরল হয়ে যায়।
নব গোয়ালা নদীর কিনারে সবুজ শ্যামল মাঠের পাশে অল্প কিছুকাল বাস করার ফলে শীর্ণকায় গরুগুলো প্রাণভরে পেট পুরে কচিকচি নরম ঘাস খেতে পেয়ে বেশ হৃষ্টপুষ্ট হয়ে উঠল। গাভীগুলোর দুধ দেবার ক্ষমতাও বেশ বেড়ে গেল। যা কিছু ভাণ্ড পাত্র, সব টইটম্বুর। তখন একদিন পিতৃবাক্য বেমালুম বিস্মৃত হয়ে সেই পূর্ণভাণ্ড মাথায় বয়ে পৌঁছে গেল সেই পাড়ায়। যেখানে লোক কারণ ছাড়া পান করে না। যেন পরিশুদ্ধ জলও পান করা অকারণ।
সে পাড়ার চারদিকে বড় বিচিত্র দৃশ্য। যে লোকটি আসলে জন্ম থেকেই অন্ধ, চোখের তারায় জ্বলেনি কখনও কোন আলো, সে এমন এক গভীরে নেশায় আকণ্ঠ ডুবু ডুবু যেন একমাত্র সেই জানে কেমন করে সমুদ্রের তলদেশ থেকে সোনার থালার মত উঠে আসে সকালের সূর্য। আর কেমন করে গলানো সোনার মতো রোদ ছড়িয়ে আকাশ পেরিয়ে পশ্চিম পাহাড়ের পিছে ডুবে যায় বিকেলবেলায়।
আসলে যে বোবা যার মুখ থেকে কখনও উচ্চারিত হতে পারবে না কোন স্তব কোন প্রিয় শব্দ বা কোন মাঙ্গলিক মন্ত্র, অহংকারী নেশা তাকে দিয়েছে এক হিমালয় ভ্রম। যেন তার মুখ নিঃ সৃত প্রতিটি শব্দ মহার্ঘ বা মহান। যেন জগতের যা কিছু শ্রেষ্ঠ বাক্যবাণী উপদেশ সব ভুয়ো ভ্রান্ত, চিরসত্য তারই অসংবদ্ধ অসংলগ্ন অর্থহীন প্রলাপ। যে আসলে চির বধির, কোনদিন শোনেনি কোন শিশুর মুখের নির্মল হাসি, কোন পাখির কুহুতান। আধো অন্ধকারে অস্ফুট কোন নিবেদন কিংবা সমুদ্রের অক্লান্ত গর্জন। মস্তিষ্কের কোষে কোষে পুঞ্জিভূত মাদক ধারণা তাকে দিয়েছে এমন এক দম্ভ যেন জগতের যা কিছু সুন্দর স্বরযুক্ত রাগ কাব্যিক ব্যঞ্জনা তার মত আস্বাদন আর কারও জীবনে জোটেনি। সবাই ব্যর্থ অপূর্ণ। একমাত্র তারই টলোমলো পায়ের নীচে আছাড় খাচ্ছে সকল পুর্ণতা।
এমনই অসহ্য অস্বাভাবিক দৃশ্য ও ঘটনার মধ্যে দিয়ে গোয়ালা তার অমৃতসম্ভার মাথায় বয়ে পথ হেঁটে চলে। আতুর আবেদনে হেঁকে চলে, কে নেবে গো দুধ।
দুধ। সে আবার কী পদার্থ রে বাবা? থমকে দাঁড়ায় এক নেশাগ্রস্ত। নামাও দেখি ভাণ্ড তোমার। জিনিসটা কেমন একটু দেখি।
আরও দু’চারজন জড়ো হয়ে গেল আশেপাশে। তাদের চোখে মুখে বিস্ময়। এর নাম বুঝি দুধ। খায় নাকি। খেলে নেশা হয়?
একজন হাতের কোষে করে অল্প মুখে ঢেলে বলে বাহঃ, খেতে তো মন্দ নয়। কিন্তু খেলে শরীর টরির খারাপ হবে নাতো?
এ পাড়ার যে সবচেয়ে বিচক্ষণ বলে সে, এই রকম একটা সাদা জিনিষ শীতকালে খেজুরগাছে গরম কালে তালগাছে হয়। খেতেও বেশ আর নেশাও হয়।
আর এক বুদ্ধিমান বলে, এটা সেটা নয়। এই রকম জিনিস, তবে কিছুটা ঘন। যেটা পানের সাথে অল্প পরিমাণে খায়। বেশি হলে মুখ পোড়ে।
নানা সেটা নয়।
এটাও নয় ওটাও নয় তাহলে বস্তুটা কী? যে পণ্ডিত সে বলে-সেটা জানবার সহজ উপায় কিছুটা খেয়ে নেওয়া।
মদের চেয়ে দুধের দাম সর্বকালে কম। এবং পান করাও কম কষ্টকর। লোকগুলো সস্তায় পানীয় পেয়ে বেশ কয়েক গ্লাস করেই পান করে বসে। কেউ কৌতূহলে আর কেউ বা নেশার খেয়ালে। কিন্তু দুধের মত পবিত্র শক্তিবর্ধক সহজপাচ্য এবং সুলভ পদার্থও তাদের সহ্য হয় না। পেটের মধ্যে পড়ে থাকা যুগ যুগান্তরের মাদক তরলে পতিত পবিত্র গোরসও বিষাক্ত হয়ে ওঠে। ফলে সবাই অসুস্থ হয়ে পড়ে। কারও বমি শুরু হয়ে যায়। কারও পাতলা দাস্ত আর কারও বা দুটোই।
