একরাতে সে বাইরের এক গাঁজার ঠেকে বসে এক পুরিয়া গাঁজা আদারকুচি ধুতরার বিচি আরও কী সব মশলা দিয়ে বানিয়ে বেশ মৌতাত করে খেয়ে মাঠের মাঝখান থেকে হেঁটে ব্যারাকে ফিরে যাবার সময় তার চোখে পড়ে যায় মাঠের আধো আলো আধো অন্ধকারে শোয়া, সদ্য যুবতী হয়ে ওঠা এক কুকুর কন্যাকে। তখন আর সে ধৈর্য রাখতে পারে না। কামেমোহিত হয়ে তাকে বলাৎকার করবার চেষ্টা করে। আর তখন সেই কুকুর কন্যা নিজের মান সম্মান রক্ষার্থে কামড়ে দ্যায় পুলিশ পুঙ্গবের পুরুষাঙ্গে। জখম কিছু বেশি ছিল, ভয় ছিল জলাতঙ্ক হবার তাই তাকে ছুটতে হয় হাসপাতালে। হাসপাতাল পুলিশ ব্যারাকের কাছে। ফলে ঘটনাটা আর চাপা রইল না। পরদিন সে নিয়ে সবাই প্রচুর হাসাহাসি করে। পুলিশ লাইনের অফিসারগণ নিজের বাহিনীর এমন অপকর্মে যারপরনাই বিব্রত হয়ে তাকে একমাসের ছুটি দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়।
এই পুলিশ লাইনে মেস অনেক কটা। নেপালিদের আলাদা বিহারিদের আলাদা, আবার বাঙালীদের দুটো। আমি যেটায় কাজ করি সেখানে যে রান্না করে তার নাম অমূল্য ঠাকুর। গলায় তার একখানা পৈতা ঝোলানো আছে বটে তবে সেটায় চাবি ঝোলানো ছাড়া অন্য কোন কাজে ব্যবহৃত হয় না। নরেশ ঠাকুরের গলায়ও এমন একখানা ময়লা তেল চিটচিটে পৈতা থাকে, সেও রান্নার কাজ করে। যার কথা পরে লিখব। আমার কাছে এটা একটা ধন্দ যে রান্নার কাজ করলে তার গলায় পৈতা কেন থাকতে হবে।
অমূল্য ঠাকুর এই মেসে নাকি কুড়ি বাইশ বছর ধরে রান্নার কাজ করছে। তাই তার পাওয়ার যেন সুপারিডেন্ট পাওয়ার। মেসে তার কথাই শেষ কথা। আমি এখানে আসবার দিনই সে আমাকে বলে দেয়–এতগুলো লোকের খাওয়ানোর ভার আমার উপর। আমি যা বলব যদি মেনে চলিস কাজ থাকবে। যদি না চলিস, কারও বাপের ক্ষমতা নেই তোকে এখানে রাখে।
প্রায় একশো মেম্বার এখানে দু-বেলা খায়। সকালে ভাত ডাল একটা তরকারি আর মাছের ঝোল। রবিবারে মাছের পরিবর্তে মাংস। রাতে রুটি ডাল তরকারি। এই সব মেম্বারের এঠো থালা বাটি গেলাস ধোয়া রান্নার বাসনপত্র মাজা, তরিতরকারি কাটা, টিউবয়েল থেকে পাম্প করে বালতি ভরে জল বয়ে আনা, আটা মাখা, রুটি সেকা, এই সব আমার কাজ। এর জন্য মাসের মাইনে চল্লিশ টাকা। অমুল্য ঠাকুরের বিচারে এ সব কাজ, কোন গুণ নয়। আমার বিশেষ গুণ থাকাটা দরকার।
কী সেই বিশেষ গুণ, যা আমার চাকরির স্থায়িত্ব দিতে সক্ষম তা জানতে পারলাম এক শুক্রবারে। এদিন পুলিশ লাইনে পুলিশদের রাম নামক একটা মদ পান করতে দেওয়া হয়।
পুলিশের চাকরি বড় কঠিন চাকরি। যার সাথে কোন চেনা জানা শত্রুতা নেই, শুধু মাত্র চাকরি রক্ষার প্রয়োজনে উপর ওলার আদেশে তার বুকে গুলি চালিয়ে দেওয়া–এতে সবার না হোক কিছু পুলিশের একটা মানসিক যন্ত্রণা তো হয়ই। পীড়িত হতে পারে পাপবোধের দ্বারা। তাই এই মদের ব্যবস্থা। মনোবেদনা চাপা দিতে মদের মত বন্ধু আর কে আছে! মদ খাইয়ে তাই শাসক পক্ষ পুলিশ মিলিটারিদের মাতাল করে রাখে হুকুম পালনের একটা বিচার বুদ্ধি বিবেক শূন্য মেশিন বানিয়ে দ্যায়। যাদের আত্মা পরমাত্মা ন্যায় অন্যায় পাপ পুণ্যবোধ কিছুই আর অবশিষ্ট থাকে না। যার এ সব থাকে দীর্ঘকাল এ চাকরি করতে পারে না।
মদের একটা কোটা অমূল্য ঠাকুরেরও আছে। শুক্রবার খৃষ্টান ধর্মাবলম্বী মানুষের কাছে বড় পবিত্র দিন। যে কোন পবিত্র দিনই আনন্দের উদ্দাম খুশির জোয়ারে ভেসে যাবার দিন। সেই কারণেই সম্ভবতঃ ইংরেজ শাসকরা মদ্য পরিবেশনের জন্য এই দিনটা বেছে নিয়েছিল। ভারতীয় শাসকরা সেই দিনটা আর বদলায়নি। তো সেই পবিত্র শুক্রবারে অমূল্য মদ্যপান করেছিল একগলা। তখন মেসের মেম্বাররা রাতের খাবার খেয়ে চলে গিয়েছিল। সেদিনের মত শেষ হয়ে গিয়েছিল আমার কাজ। খেয়েদেয়ে আমিও শোবার আয়োজন করছিলাম। এমন সময় অমূল্য ঠাকুর এগিয়ে এল আমার কাছে। খুব কাছে। তারপর সে তার ময়লা তেল চিটচিটে লুঙ্গিটা সরিয়ে বের করল তার কালো মোটা দুর্গন্ধযুক্ত–বমন উদ্রেককারী পুরুষ অঙ্গখানা। তৈল জাতীয় কিছু একটা মাখানো। কোন রকম সংকোচ না করে সেটা চাপিয়ে দিল আমার হাতের তালুর উপর।–“নে, একটু খেঁচে দে তো।”
গা ঘিন ঘিন করে আমার। মনটা বিদ্রোহ করে। তবু নাক টিপে চোখ বুজে আদেশ পালন করি আমি। আর সময় গুণতে থাকি কখন এই বিচ্ছিরি ব্যাপারটা থেকে পরিত্রাণ পাই। কিন্তু সে এক অসহায় বালককে অত অল্পে রেহাই দিতে ইচ্ছুক নয়। সে চাইল শেষ এবং চরমতার চূড়ান্তে পৌঁছে যেতে। ব্যাস, ব্যাস হয়েছে, নে এবার উপুড় হয়ে শুয়ে পড়।”
পরবর্তীকালে যখন আমাকে জেলে যেতে হয়েছিল তখন জেনেছি এটা কারও কারও কাছে বড় প্রিয় বিষয়। তারা পায়ু মৈথুন করে বড় আনন্দ পায়। তবে আমার জন্মজনিত সংস্কার ও শিক্ষার এটা এক বিপরীত মেরুর বিষয়। যা ভীষণ ঘৃণ্য এবং নিন্দনীয়। অন্তরাত্মা রিরি করে ওঠে আমার। কণ্ঠনালি থেকে বের হয় একটা থুৎকার–না।
আমার অসম্মতিতে সে একটু ক্রুদ্ধ হয়, এবং ক্রোধ ভরে একটা লাল দু’টাকার নোট এনে আমার দিকে ছুঁড়ে মারে–নে এবার আর বেশি সতীগিরি দেখাস না, প্যান্ট খোল। কিন্তু তবু নিজেকে কুকুর বানাতে মনের সায় পেলাম না। না, কুকুর নয়, তার চেয়ে খারাপ। এই অবস্থায় কুকুরও তো কামড় দিয়েছিল।
