তাই সুপারের কানে সুপরামর্শ দিয়ে চা চিনি কেনা বন্ধ করিয়েছে সে। না, একেবারে বন্ধ করেনি। তা এখন রাখা থাকে মাদার কিলারের জিম্মায়। চা এখন সে-ই বানায়। সুপার, ওয়ার্ডেন, মাদার-তিনজন খায়।
ব্যাপারটা অতি তুচ্ছ। তবে এই রকমের তুচ্ছ তুচ্ছ ঘটনা দিয়ে একজন মানুষের স্বরূপ কিছুটা বুঝতে পারা যায় বলে এসব লেখা। এগুলো তো বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনাও নয়। আমার প্রতি
মনের মধ্যে গুপ্ত থাকা অগ্নিকুণ্ডের ছোট ছোট ফুলকি।
আর যখন আমি এর কার্যকারণ অনুসন্ধানে ব্যাপৃত হই মনে হয় যেন আমি এক ভুল মানুষ, ভুল করে ভুল জায়গায় এসে পড়েছি।
আমিও মানুষ, আমারও দুঃখ হয় কষ্ট হয় রাগ হয়। তবে কী বা করতে পারি আমি? কী বা করার আছে আমার? আমি পারি দুই চার লাইন লিখতে। এই সময় এছাড়া আমার আর কোনো অবলম্বন নেই। লিখে যাই অনাগত কালের মানুষদের জন্য আমার কষ্টকর অবমানিত মরম বেদনার কথা। আর আশা করি, একদিন তা এক বিশাল দীর্ঘশ্বাস হয়ে চারিয়ে যাবে হাজার হাজার বুকে। যে বুক থেকে একটা প্রবল ধিক্কারের সাথে এক দলা থুথু ছুটে যাবে সেই সব মানুষের দিকে।
সেই সময় একটা গল্প লিখেছিলাম এই সময় নামে। বর্ণনা করেছিলাম অসহনীয় মানসিক অবস্থা। তুলে দিচ্ছি সেই গল্পটা।
নব গোয়ালকে বলেছিল তার বাপ প্রবীণ গোয়ালা–”যদি পারিস বাপ আমার তবে যেন গরু হোস।” আমি তোকে সেই আশীর্বাদ করি।
সবাই যখন সন্তানকে ‘মানুষ’ করে গড়ে তোলাবার আপ্রাণ চেষ্টায় কালঘাম ছোটায় তখন প্রবীণ গোয়ালার এরকম উদ্ভট কামনা কেন তা বোঝা বেশ কঠিন ব্যাপার। যার নামই গরু। অপদার্থ জীবদের মধ্যে যার গণনা সবার আগে, এক মানব পুত্রকে সেই জীবতুল্য হতে বলা আশীর্বাদ না অভিশাপ।
একদিন ছেলেকে বলেছিল বুড়ো বাপ-গোয়ালা আছিস গোয়ালাই থাকিস। মানুষ হবার দরকার নেই। মানুষের বড় লোভ, বড় আত্মস্বার্থ চিন্তা, পরশ্রীকাতরতা, সবাইকে পিছনে ফেলে নিজে এগিয়ে যাবার চেষ্টা। মানুষের মত মানুষ আর কজনা। সে পথে বাধাও বিস্তর। তার চেয়ে তুই গরু হোস। গরুশান্ত নির্বিরোধ পরোপকারী সারাটা জীবন অন্যের জন্য খাটে। অন্যের জন্যই কোনো টুশব্দ না করে কসাইয়ের ছুরির সামনে গলাটা বাড়ায়। মৃত্যুর পরও শরীরের চামড়া দিয়ে অন্যের শরীর রক্ষা করে। আরও বলেছিল বুড়ো গরু কী খায় জানিস তো বাপ, যা পৃথিবীর সব চেয়ে তুচ্ছ নিকৃষ্ট আর কম দামী। আর যা দেয় সেই দুধ হচ্ছে পৃথিবীর সব চেয়ে পবিত্র পুষ্টিকর এবং তুলনাহীন সামগ্রী। সেই জন্যই গরু হচ্ছে জগতের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ সব চেয়ে মহান জীব। তোর জীবনের পরমার্থ সাধন হোক–সত্যিকারের গো-জীবন।
গোয়ালার জীবন জীবিকার সর্বপ্রধান শর্ত বা অঙ্গ-গো-পালন এবং দুগ্ধ সংগ্রহণ। সংগৃহীত দুগ্ধ যারা বিক্রয় দ্বারা ধনোপার্জন করে তাদের কথা নয়, যারা বিতরণ করে তাদের কর্ম কল্পনা স্বপ্ন ভালোবাসা সব কিছুতেই মাখামাখি হয়ে থাকে দুধ দই ঘি মাখনের সুবাস সুগন্ধ। গল্প গান কবিতা হাসি আহ্লাদে উপচে ওঠে, এক ফেনিল উষ্ণ শুভ্রতা।
নব সেই রকম গোয়ালা। যার বাপ তাকে বলেছিল, দুধের কোন দাম হয় না বাপ। দুধ অমূল্য। যে বিক্রয় করে–পাষণ্ড, যে দাম দেবার ধৃষ্টতা দেখায়–মূর্খ। তুই দুধ দান করিস বাপ। শিশু, রুগ্ন, দুর্বল ভয় স্বাস্থ্য যে চাইবে তাকেই দিস।
তাহলে আমার চলবে কী করে?
যৎ সামান্য যে যা দেবে প্রতিদানে। বলেছিল বুড়ো, বেচা-কেনা নয়, সেটা দানের প্রতিদান।
আর একদিন বলেছিল বুড়ো, যে মদ বিক্রি করে সে কারও কাছে যায় না। কাউকে খোঁজে না। অন্ধকার ঘরে বসে থাকলেও মদখোর তাকে খুঁজে বের করবে। কিন্তু গোয়ালাকে তার সামগ্রী মানুষের দুয়ারে বয়ে নিয়ে যেতে হয়। কার প্রয়োজন খুঁজে ফিরতে হয়।
সময় সময় এমন ধরনের অনেক কথা বলতে প্রদীপ গোয়ালা। সব কথার সঠিক অর্থ নব গোয়ালার বোধগম্য হতো না। তবে তা নিয়ে তেমন চিন্তিত ছিল না বৃদ্ধ। কেননা, সময় সবচেয়ে বড় শিক্ষক। পরিণতি পাবার আগে বেদতুল্য বাক্যও মানুষের কাছে স্রেফ কতগুলো দুর্বোধ্য শব্দ।
বাবা দেহ রাখার পর স্বাভাবিক নিয়েমেই গোপালনের সমস্ত দায়দায়িত্ব নব গোয়ালার কাঁধে বর্তায়। ফলে সারাদিন মাঠে মাঠে বাশুরি বাজিয়ে গোচারণের পর সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে ক্লান্ত ঘুম। এই করেই সময় তার বেশ কেটে যায়। এর বাইরে যে অন্য কোন জীবন থাকতে পারে তা সে জানে না। জানতে চায় না।
নব গোয়ালা যে প্রদেশের বাসিন্দা সেখানে সবাই গোয়ালা। প্রত্যেকের রয়েছে বিশাল বিশাল গরুর পাল। ফলে গোচারণ-ভূমির বড় অকুলান। গো-বৎসরা যে কারণে পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘাস বিচালি খেতে পায় না। ফলে তাদের স্বাস্থ্য বা দেয় দুধে তেমন বাড় বাড়ন্ত হতে পারে না।
সে কারণে নব গোয়াল খুবই চিন্তিত। গরু যার জীবন, যে মানুষ গরুর পালের দ্বারা ঘিরে থাকে জলের মধ্যেকার মাছের মত। যার স্বপ্ন-সাধন একমাত্র গরুতুল্য হওয়া, গোধন কুলের শ্রী এবং সৌন্দর্যতে যার জীবন সৌন্দর্যমণ্ডিত, সে যে এর ফলে চিন্তাকুল হবে তাতে আর আশ্চর্য কী।
ফলে একদিন উপযুক্ত গোচারণ ভূমির সন্ধানে নব তার অতি চেনা বিচরণ ক্ষেত্র ত্যাগ করে অজানা অচেনা অঞ্চলের দিকে রওনা দিল। সাথে রইল সামান্য কিছু পাথেয় আর প্রিয় গরুর পাল।
