নিজের আনন্দ দশজনকে ভাগ করে দিলে তা যেমন বাড়ে, নিজের দুঃখতে দশজনকে জড়িয়ে নিতে পারলে তার ভার কিছু কমে। আমার যদি ঘর না থাকে খোলা আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজি, রোদে শুকাই, লোকে ঘরের জানালা দিয়ে আমাকে কৃপাদৃষ্টিতে দেখবে–আহা উহ করবে, হাসবে, সে বড় অসহ্য। এতে আমার মনোকষ্ট শতগুণ বেড়ে যাবে। আর যদি কারুর মাথার উপর আচ্ছাদন না থাকে যদি সবাই একসাথে বসে থাকি খোলা আকাশের নীচে, রোদে পুড়ি, শীতে কপি, বৃষ্টিতে চুপচুপে হই—কে কাকে দেখে করুণার পাত্র ভেবে মুচকে হাসবে? কে নিজেকে ভাববে ভাগ্যবান সুখি, অন্যকে মন্দ ভাগ্য? ওয়ার্ডেন বড় ভাইকে মৃত্যুশয্যায় রেখে তাই একছুটে চলে এলেন স্কুলে, আধ ঘন্টার জন্য। ঘুরে ঘুরে দেখলো সব। সবাইকে দিল দাদার সংবাদ শেঠি হাসপাতালে ভর্তি করেছি। অপারেশন চলছে, আমি থাকতে পারব না। এক্ষুনি যেতে হবে।
আর তারপর–চলে যেতে যেতে ঘাড় ঘুরিয়ে তার নিজস্ব ভঙ্গিতে আমাকে ডেকে নীচু কিন্তু নীরস গলায় বললেন-আপনি কিন্তু খাবেন না। আমি তার চোখের মধ্যে দেখতে পেলাম ছাই চাপা আগুনের মতো জান্তব এক জিঘাংসার প্রকাশ-আপনি হয়তো বুঝবেন না, হয়তো খেতে বসে যাবেন, তাই বারণ করছি। আপনি কিন্তু নিমন্ত্রিত নন। এসব কিছুর আয়োজন একমাত্র নিমন্ত্রিত আর যারা এখানে রোজ খায়—তাদের জন্য। কথা কটা বলে দ্রুত তিনি চলে গেলেন। দাঁড়াবার উপায় নেই–ভাই মরে যাচ্ছে। অন্য অপর কেউ নয় মায়ের পেটের আপন বড় ভাই। তবু এই বিপন্ন সময়েও তিনি বুদ্ধিভ্রষ্ট হননি, স্বধর্মচ্যুত হননি, ছুটে এসে স্বকর্ম করে গেলেন, দেখে আমি বিস্মিত।
১৩. কৃষ্টি-সংস্কৃতি সৌজন্য সভ্যতা
কৃষ্টি-সংস্কৃতি সৌজন্য সভ্যতা এর কোনো নির্দিষ্ট মাপদণ্ড নেই। স্থান ভেদে পাত্র ভেদে কাল ভেদে নির্ণয় হয়। আমি যে সমাজে মানুষ, সেই দরিদ্র নমঃশূদ্র মানুষকে একত্র একটা বড় সংখ্যায় বসবাস করতে দেখেছি দণ্ডকারণ্যে। পূর্ববাংলার বরিশাল, ফরিদপুর, খুলনা থেকে যদিও তারা এসেছে, সেখানকার দেশাচার লোকাঁচার লোকধৰ্ম লৌকিকতা কিছুই বর্জন করে আসেনি।ঝিনুকের বুকের মুক্তোর মতো সব আগলে রেখে দিয়েছে। কেউ কেউ যাকে কুসংস্কার কুপ্রথা এসব বলতেই পারেন।
এই সমাজে নিয়ম আছে–যার বাড়িতে অনুষ্ঠান–সে বিয়ে, শ্রাদ্ধ, অন্নপ্রাশন যাই হোক, রান্না হয়ে যাবার পর নিমন্ত্রিতকে তার বাড়ি গিয়ে ডেকে আনতে হবে–“চলেন, রান্না হইয়া গ্যাছে, দুইটা অন্ন সেবা করবেন।” সেই কবে কতদিন আগে একবার বলা হয়েছিল, আর আজ সব এসে পাত পেতে বসে যাবে–এমন হবে না। সেটাতে তারা অপমানিত বোধ করবেন। শাস্ত্রে বলা আছে, অতিথি নারায়ণ। এখন আমি নারায়ণ। তবে আমাকে সেই সম্মান দাও। না হলে যাব না। থাক তোমার খাবার তোমার হাঁড়িতে। আমি খাব না।
আমি এই সংস্কারের ক্রোড়ে লালিত। আমার আজন্ম অনাহারি তবু আত্মসম্মান সচেতন বাবা আমাকে বলে গেছেন–যদি কেউ আদর করে ডেকে পান্তা খেতে দেয়–পরমান্ন ভেবে খাস, যদি কেউ অনাদরে পরমান্ন দেয়–বিষ্টাবৎ বর্জন করে আসিস!
এখানকার খাদ্যদ্রব্যকে আমি ওই মনে করি। ঘৃণা করে আমার মুখে তুলতে। রান্নার সময়ে নুন ঝাল পরীক্ষা করতে একটু জিভে ছোঁয়াতেও আমার অন্তরাত্মা রি রি করে ওঠে। তবু সেইবিষ্ঠা এক একদিন গলাধঃকরণ না করে উপায় থাকে না।
একদিন টিচার ইনচার্জ তার মেয়ের বিয়ে উপলক্ষ্যে যারা সেই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারেনি তাদের জন্য এখানে একটা ভোজ দিয়েছিলেন। যথারীতি রান্নাবান্না করে সবাইকে খাইয়ে আমি বাড়ি চলে গিয়েছিলাম। পরের দিন কেউ একজন কথাটা তার কানে দিয়ে দেয়–রঞ্জনদা খায়নি। উনি সেদিন আমাকে ডেকে বেজায় ধমকান। কেন খাননি? এটা তো আমাকে অপমান।
বলি-আমার তো নিমন্ত্রণ ছিল না।
ছিল না মানে! সবার নিমন্ত্রণ ছিল। আলাদা আলাদা করে কাউকে বলিনি। সুপারকে বলে গিয়েছিলাম–সবাই যেন যায়।
সে কথা উনি তো আমাকে কিছু বলেননি। আমি কী করে জানব! রোজ যে রকম রান্না করে চলে যাই। কালকেও গেছি।
তার মানে কোনদিনই আপনি খান না?
মাথা নাড়ি আমি–না।
কেন?
বড় সাহেবের বারণ আছে যে।
কিছুক্ষণ কী যেন ভেবে–শেষে কেন কে জানে মানবিক হয়ে উঠলেন তিনি সে ঠিক আছে। অন্যদিন না খান না খাবেন, কিন্তু যেদিন কোনো অনুষ্ঠান হবে খেয়ে যাবেন। আমার অর্ডার রইল। এ কী কথা! সবাই খাবে আর যে রান্না করবে সে খাবে না। হয় নাকি!
সেই কারণে কোনো কোনোদিন বিশেষ নিষেধ না থাকলে খেয়ে নিতে হতো। সবটা নির্ভর করে যিনি খরচপাতি করছেন তার উপরে। তার জিনিস তিনি কাকে দেবেন না দেবেন সবই তার মর্জি। সেই যেবার বড় সাহেবের বড় ছেলের বিয়ে হল–কয়েক হাজার লোক খেয়েছিল, একমাত্র আমি ছিলাম অনিমন্ত্রিত। অবশ্য সে রান্না করেছিল অন্য রাঁধুনিরা।
আজকের যিনি উদ্যোক্তা, হতে পারে তিনি বড় সাহেবের পদাঙ্ক অনুসারি। তাই আমি তার নাপসন্দ। তবে সেই নির্দেশ কার্যকর করতে ভাইকে মৃত্যু শয্যায় রেখে ওয়ার্ডেনের উন্মাদ প্রায় ছুটে আসা–নিজ দায়িত্ব সম্বন্ধে এমন সচেতন আমি আগে আর কাউকে দেখিনি।
আগে হোস্টেলে চা হতো, ওরা খেত। আমি ওদের জন্য বানাতাম তাই আমিও খেয়ে নিতাম। দুধ ছাড়া লাল চা আর একটু চিনি। এতে কত বা খরচ। তবু বুক টনটন করে উঠল ওয়ার্ডেনের। খাচ্ছে তো! খেয়ে নিল তো। সর্বনাশ।
