বলেন অনন্তদা—এনার নাম খোকন মজুমদার।
সেই সাতষট্টি সালে শিলিগুড়িতে থাকার সময় এই নামটা আমি বার বার শুনেছি। নকশালবাড়ি, খড়িবাড়ি, ফাঁসিদেওয়া–এইসব অঞ্চলে সেই কৃষক অভ্যুত্থান সংগঠিত করার পিছনে যে পাঁচ-ছয়জন নেতার নাম সর্বাগ্রে উচ্চারিত হয়–তারই অন্যতম নাম খোকন মজুমদার। তবে কী ইনিই তিনি? না, তা কি করে হবে। তিনি কত বড় মাপের এক নেতা। তিনি আসবেন এক অতি তুচ্ছ লেখকের সাথে দেখা করতে। ধেস তা হয় নাকি। এ অন্য কেউ।
বলি অনন্তদাকে–এই নামটা আমার বহুবার শোনা।
হতে পারে। বলেন অনন্তদা–একই নামে কত মানুষ থাকে। তবে ইনি কোনো বিখ্যাত কেউ নন। আপনার আমার মতো সাধারণ।
কথাবার্তা শেষ। এবার ওনাদের যেতে হবে। বাসে তুলে দেবার সময় আমার সাথে করমর্দন করলেন খোকনবাবু। বললেন–আবার দেখা হবে। তারপর ব্যাগ থেকে বের করলেন একটা প্যাকেট।কী আছে এতে? বললেন-একটা বই। আপনার জন্য এনেছি। আমিও কোনদিন কোনো স্কুলে পড়িনি। পড়ে দেখবেন কেমন লিখেছি।
প্যাকেট আর তখন খোলা হল না। ব্যাগে রেখে দিলাম। বাস এলে ওনারা উঠে গেলেন। বাড়ি এসে সেই প্যাকেট ছিঁড়ে বইখানা বের করে আমি যেন একটা হাজার ভোল্টেজ বিদ্যুতের ঝটকা খেয়ে ছিটকে পড়লাম কোথায় না কোথায়। কী আশ্চর্য। উনি এলেন, এত সময় রইলেন কত কথা বললেন, আর আমি চিনতে পারলাম না?
ইনি সেই খোকন মজুমদার। এই নামেই সারা ভারত ওনাকে চেনে। সেই সত্তরের দশকে এখান থেকে একটা সশস্ত্র সংগ্রামে বিশ্বাসী প্রতিনিধি দল চিনে গিয়েছিল। দেখা করেছিল মাও-সে-তুংয়ের সাথে। সেই দলের এক সদ্য ছিলেন খোকন মজুমদার। ভারতবর্ষের ইনি সেই প্রথম মানুষ যিনি বিপ্লবী জনগণের পক্ষ থেকে এগিয়ে এসে করমর্দন করেছিলেন মহান সেই নেতার সাথে। আমি সেই হাত ছুঁয়েছি, তবু চিনতে পারলাম না। এই বইখানা লেখা হয়েছে সেই চিন যাত্রার অভিজ্ঞতার বিষয় নিয়ে কী ভাবে সীমান্ত রক্ষীদের চোখ এড়িয়ে, কোনো কোনো সময় বোকা বানিয়ে দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে কি ভাবে পৌঁছে গিয়েছিলেন চিনের রাজধানীতে। কতখানি উষ্ণ অভ্যর্থনা পেয়েছেন সেদেশের মানুষের কাছে। অতি প্রাঞ্জল ভাষায় সে সব লিখেছেন খোকনদা তার ‘বসন্তের বজ্র নির্ঘোষ’ বইয়ে।
এখন ওনার বয়স আশি পেরিয়ে গেছে, থেমে গেছে সেই উত্তাল সত্তর দশকের বিপ্লবী সংগ্রাম। তবু উনি সেই বিশ্বাস বুকে নিয়ে আজও পথ হাঁটছেন সংগ্রাম কখনো ফুরায় না, শেষ হয় না। সে আছে সে থাকবে।
.
এই পৃথিবী কত না বৈচিত্র্যে ভরা, কত বিচিত্র রকমের মানুষ এখানে। প্রত্যেকে বাঁচার জন্য খুঁজে নিয়েছে এক একটা অবলম্বন। খুঁজে নিয়েছে এক একটা আনন্দের উপকরণ। সে আনন্দের জন্য কেউ কেউ হাজার হাজার মাইল পথ হাঁটছেন, মানুষের কথা গলায় রক্ত তুলে বলে বেড়াচ্ছেন। জেলে পচছেন, গুলিও খাচ্ছেন বুকে মাথায়। আবার কেউ ব্রত নিয়েছে মানব জীবনের অহিত করার, মানব সমাজের অনিষ্টকরার। এতেই সেখুঁজে পচ্ছে একটা পৈশাচিক আনন্দ। তবে এদের বা ওদের কারও কারও বাছাই করে নেওয়া কর্ম কর্তব্যের প্রতি যে নিষ্ঠা তা দেখলে অবাক না হয়ে উপায় নেই।
ওই যে বললাম আনন্দ, একদল লোক আছে যারা দিন মাস বছরের শেষে দুঃস্থ দরিদ্র অসহায় মানুষকে অন্নদান করে আনন্দ পান অযথা পাপের বোঝা কিছুটা হালকা করে নেন। এ আমি জেলে থাকাকালীন সময়েও দেখেছি। এক একটা বিশেষ দিনে কিছু লোক ঝুড়ি ভরে লুচি হালুয়া নিয়ে পৌঁছে যেত জেলখানায়। বন্দীদের খাইয়ে খুবই আত্মসন্তোষ অনুভব করত।
এমনটা এই বোবা স্কুলেও হয়। মায়ের শ্রাদ্ধ, পুত্রের জন্মদিন বা কোনো বিশেষ কারণে কেউ কেউ ভোজ দেয়। দুতিনবার মুকাভিনয় শিল্পী যোগেশ দত্তও এমন অনুষ্ঠান করে গেছেন।
সেবার–ঠিক মনে নেই, কে যেন এমন একটা আয়োজনের ব্যয়ভার বহন করেছিলেন। হতে পারে কোনো জমি বেচা-কেনার দালাল, কোনো প্রমোটার বা কন্টাক্টার। যে হয়তো বড় সাহেবের কোনো কৃপা করুণায় পেয়ে গেছে কোনো বড় মুনাফা বলেছেন বড় সাহেব বাদবাকি যা সে পরে, আগে বাচ্চাদের একদিন একটু ভালোমন্দ খাইয়ে দে। এখানে জয়া না বিজয়া নামে এক নেতা আছে, যার স্থান বড় সাহেবের এক ধাপ নীচে। সিপিএম পার্টি করে একেবারে সভাবে-স্রেফ জমি কেনাবেচা করে সে কয়েক কুবেরের ধনের মালিক হয়ে গেছে। সে মাঝে মাঝে বোবাদের ভোজন দিয়ে নাম কামায় আর পাপ কমায়।
সেদিন এমন একজনের অনুদানে এই স্কুলে নানাবিধ খাদ্যদ্রব্যের রান্নাবান্না হচ্ছিল। বোবা ছাড়াও বাইরের কিছু লোক খাবে। সব মিলিয়ে প্রায় চারশো। কেনাকাটা সব কালই হয়ে গেছে আজ সকাল থেকেই আমরা নেমে পড়েছি রান্না বান্নার কাজে। রবিবার বলে বড় বড় কটা বোবা ছেলেও আমাদের সহযোগিতা করছে।
আজ বড় আনন্দের দিন। সবাই হাসছে নাচছে গান গাইছে। আর এমনই আনন্দ যজ্ঞের মাঝে হঠাৎ দুঃসংবাদ, ওয়ার্ডেনের বড়দার হার্ট অ্যাটাক। যে রোগে তার এখন প্রাণ যাবে। প্রাণ তো পরে যাবে, তার আগে চিকিৎসাটা তো হবে। পয়সার তো কোনো কম নেই, পাঁচ ভাই দশ হাতে কামাচ্ছে। তাই তাকে এনে ভর্তি করা হল এশিয়া মহাদেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় ব্যয়বহুল শেঠির হাসপাতালে। বেলা আটটা থেকে এগোরাটা–তিনঘন্টা লেগে গেল প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা সারতে–এরপর হবে বাইপাশ সার্জারি। ছয় আট ঘন্টা ধরে চলবে অপারেশন। ভাইকে ও.টি-তে ঢুকিয়ে দিয়েই আত্মাধিকার এল ওয়ার্ডেনের মনে–ছিঃ ছিঃ আমি এত স্বার্থপর, নিজের দায়িত্ব কর্তব্য সম্বন্ধে এত অসচেতন–ছিঃ। “আজ স্কুলে অনুষ্ঠান, কত উপাদেয় রান্নাবান্না, কত লোক আসবে খাবে। আর আমি কিনা পড়ে আছিহাসপাতালে।”খেতে সে খুব ভালোবাসে তবে আজ খাবে না। লোভ সম্বরণ করে রাখতেই হবে। যার ভাই হাসপাতালে মৃত্যুশয্যায়–সে পাঠার ঠ্যাং চিবোতে বসলে লোকে কী বলবে। সেই যে বলে না, পারিতে করিনা কাজ, সদা ভয় সদা লাজ সংশয়ে সংকল্প সদা টলে পাছে লোকে কিছু বলে। এই লোক লজ্জার কারণেই কতবার বঞ্চিত করতে হয় নিজেকে সুস্বাদু প্রাপ্তি থেকে।
