এখন যখন শোষিতদের পক্ষে লড়াই করছি নাটক করে, একদল বর্ণপ্রভু শোষিত থেকে শোয়ক, শাসিত থেকে শাসক হয়ে গেছে, আর সেই শ্রেণি সংগ্রামের গল্প নয়–এখন ফেরি করে বেড়াচ্ছে শ্রেণি সহবস্থানের তত্ত্ব। তাই এখন আবার সেই বর্ণঘৃণার বিষবৃক্ষ ফলে ফুলে পল্লবিত হয়ে উঠছে। এত দীর্ঘকাল বঙ্গের বাম শাসনের পরও তথাকথিত উঁচু জাতের লোক তথাকথিত নীচু জাতের হাতে রান্না করা মিড-ডে-মিলের খাবার পর্যন্ত ছোট ছোট স্কুলের বাচ্চাদের খেতে দিচ্ছে না।
এই যে আমি যে স্কুলে কাজ করি-সেখানে যে-সব মানুষ আমাকে অনবরত বিপদাপন্ন করে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, সবাই কী শুধু রাজনৈতিক মত পার্থক্যের জন্য। তা নয়, একটা বৃহৎ অংশের বুক জ্বলে আমার জাতি পরিচিতির জন্য। ব্যাপারী না হয়ে যদি ব্যানার্জী হতাম আক্রমণ এতটা সর্বাত্মক হতো না। কেউনা কেউ পাশে দাঁড়াত।জাতি ব্যাপারটা বঙ্গমানসে এমনভাবে গেড়ে বসে আছে, যে, যিনি ঘৃণা করছেন নিজেও তা বুঝতে পারেন না অনেক সময়। চুরি চামারির চোটে দেশটা রসাতলে গেল। যেমন পচা কাঁঠাল তেমন মুচি খদ্দের।কী সব কাওরা মার্কা কথাবার্তা। বাক্যে যারা এইসব শব্দবন্ধ ব্যবহার করেন, কী বলছেন, কতজনে তা জেনে বুঝে করেন?
এই যে যুগ যুগ ধরে মানুষকে হেয় প্রতিপন্ন করার হীন প্রবৃত্তি এর বিরুদ্ধে শুধু নিম্নবর্ন সমাজ থেকে প্রতিবাদ ওঠেনি, সমানভাবে প্রতিবাদে মুখর হয়েছেন উচ্চবর্ণেরও কিছু বিদগ্ধ মানুষ। এই তালিকায় শিবরাম চক্রবর্তী, সুকুমারী ভট্টাচার্য, শিবনাথ শাস্ত্রী, রণজিৎ গুহ, গৌতম রায়, হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, শেখর বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সবার শীর্ষে রয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। যাঁরা মনে প্রাণে ওই অন্যায় অবস্থার অবসান কামনায় সড়ক থেকে সাহিত্য অঙ্গনের অন্দরেও তুমুল বিরোধ প্রগঠিত করে চলেছেন। আমার দেখা উচ্চবর্ণ সচেতনদের মধ্যে বর্তমানে সবার আগে আছেন–এই অনন্ত আচার্য। সত্যি বলতে কী প্রথম যেদিন আমি ওনাকে দেখি উলুখাগড়া চুল, আগাছা দাড়ি, আকাঁচা জামা-প্যান্ট। ছেঁড়া জুতো, বই বোঝাই কাঁধের ভারি ঝোলা–এসব কিছুই দেখিনি, দেখেছিলাম শুধু দুটো ফাটাচটা পরিব্রাজক পা। ওই পা দেখেই আমার বহুদেখা চোখ মুহূর্তে বুঝেছিল হাজার মাইল না হাঁটলে কোন পা এমন হয় না। আর শুনেছিলাম তার কথা– । কথায় কোনো বুদ্ধিজীবীতুল্য পালিশ দেবার প্রয়াস ছিল না, তত্ত্বের কচকচানি, জ্ঞানের মেদের সর্বস্তরে দাপট ছিল অনুপস্থিত। অতি সাদামাটা শব্দে যা তিনি বলেছিলেন তাতে বুঝেছিলাম–ইনি যে কাজকে ব্রত করেছেন তাতে কোনো খাদ নেই। কোনো নিজ স্বার্থ নেই। নেই নেতা হয়ে ওঠার নকল নাটক। মনেপ্রাণে চান বর্ণবৈষম্যের বিলুপ্তি! ভালো লেগে গেল ওনাকে আমার। আর আমি যুক্ত হয়ে পড়লাম ওনার সঙ্গে। মাঝে মাঝে দেখা হতে থাকল, কথা হতে রইল এবং কিছু কাজও।
অনন্তদা যে সংগঠনের দায়িত্বে আছেন তার নাম ‘ডাফোড্যাম’ এটি সম্পূর্ণ একটি সামাজিক সংগঠন। যেমন ‘এপিডিআর’, ‘পিইইউসিএল, জন চেতনা মঞ্চ’, ‘ভারত জন আন্দোলন। যাদের একটাই স্লোগান–”হর জোর জুলুম কা বিরোধ মে সংঘর্ষ হামারা নাড়া হ্যায়”।
ডাফোড্যামের মুখপত্র ‘চেতনা লহর’। আমি হয়ে গেলাম এই পত্রিকার একজন নিয়মিত লেখক। হাতে ছিল হাটে বাজারে পত্রিকা এবার আর একখানা পত্রিকা পেলাম যেখানে স্বাধীনভাবে লিখতে পারি। সম্পাদক আমার লেখায় কাঁচি চালায় না।
একদিন অনন্তদা এসেছেন আমার সঙ্গে দেখা করতে যেমন মাঝে মাঝে আসেন। সেদিন ওনার সাথে একজন অন্য লোকও এসেছেন আমাকে দেখবেন বলে। আজকাল এমন সব লোকের সংখ্যা খুব বেড়ে গেছে। যারা শুধু দেখতে নয়, আমাকে পরীক্ষা করতে আসে। বিবিধ প্রশ্নে বিদ্ধ করে। সত্যি আপনি কোন স্কুলে যাননি? ঢপ দিচ্ছেন না তো? কেউ বলে–আপনাকে ঠিক লেখকের মতো দেখায় না, সত্যিই এগুলো আপনি লিখেছেন? অনন্তদাই একদিন বলেছেন বিদেশে নাকি কী এক সাহিত্যের ব্যাপক চল হয়েছে, কোনো নামি লেখক নাম গোপন করে, খুনি, ডাকাত, এমনকী বারবণিতা সেজে বই লেখে। যা নাকি পাঠকেরা খুব খায়। কেউ কেউ আমাকে বাজিয়ে দেখে–আমি নকল মাল নই তো।
যে লোকটি এসেছেন ঠিক অনন্তদার মতোই। যাকে ঠিক প্রচলিত ভদ্রলোক অর্থাৎ পরিপাটি পোষাক, পালিশ মারা চেহারা, এই পর্যায়ে ফেলা যাবে না। রঙটা কোনো এককালে ফরসাই ছিল। এখন রোদে জলে তামাটে। তিনি খুবই রোগা এবং বুড়ো। বৃদ্ধ নয়, বেশ বুড়োই। ঠিকমতো হাঁটতে চলতেও পারেন না। কথা বললে শব্দরা গলার মধ্যে আটকে গিয়ে এমন একটা ফাঁস ফাঁস আওয়াজ বের হয় যে মর্মার্থ উদ্ধার করা অতীব কঠিন। তাই তিনি কী বলছেন তা অনুবাদ করে দিচ্ছেন অনন্তদা।
জানলাম–ইনি উত্তরবঙ্গে থাকেন। কলকাতায় এসেছেন দুটো তীব্র জরুরি কাজ নিয়ে। প্রথমটা চিকিৎসা। শরীরটা ওনার অসুস্থ। আর দ্বিতীয়টা হচ্ছে একবার মনোরঞ্জন ব্যাপারীকে দেখে যাওয়া। যখন খোঁজ পাওয়া গেছে যে কলকাতায় আছে। আর উনিও যখন কলকাতায় আসছেন এক সাথে দুটো কাজ সেরে নেবার ইচ্ছা।
আমরা বসেছি বাস রাস্তার ধারে এক চায়ের দোকানে। উনি প্রশ্ন করছেন–আমি জবাব দিচ্ছি। এইভাবে এগিয়ে চলল সময়। প্রায় ঘন্টা দেড়েক কেটে গেল। এবার উনি ফিরে যাবেন। আমি তখন অনন্তদাকে বলি, বহু কথা তো হল, কিন্তু আসল কথাটাই তো জেনে নেওয়া হয়নি ওনার নামটা!
