আমার যা, তা এখনও হারায়নি। হারিয়ে যেতে দেব না, এই পণ করে প্রাণপণে আঁকড়ে ধরেছি দুটাকা দামের ছোট কলমটা। এটাই আমার গর্ব অহঙ্কার–ষোল আনা। আমি শিল্পী, আমি স্রষ্টা আমি ঈশ্বরের মতো মহান।
গল্প শুনেছি, কোনো এক রাজা নাকি একবার এক হাড় কাঁপানো শীতের রাতে খেলাচ্ছলে বলে বসেন, ওই পুকুরের জলে যে সারারাত গলা পর্যন্ত ডুবে থাকবে আমি তাকে এক হাজার টাকা দেব। আর একজন লোক সারারাত সেই জলে ডুবে বসে থাকেন। পরদিন রাজা যখন তাকে জিজ্ঞেস, করলেন, কী করে পারলে? এই ভীষণ শীতে লেপ কাথার নীচে মানুষ যখন বরফ হয়ে জমে যাচ্ছে, কী করে এমন অসাধ্য সাধন করলে? সে জবাবে বলে ওই যে দুরের জানালাটা, ওখান থেকে একটা ক্ষীণ আলোর রেখা দেখা যাচ্ছিল–সেদিকে তাকিয়ে বসেছিলাম। রাত কেটে গেছে।
আমার সামনেও একটা আশার আলোর ক্ষীণ রেখা ছিল। একদিন এই গভীর অন্ধকার–এই দুর্যোগের কালো মেঘ সরে যাবে। ঝলমল করে সূর্য–রোদ উঠবে। আমার জীবন আলোকিত হবে। সেই দুরাশায় পার হয়ে আসতে পেরেছি সব দুর্যোগের দিন। পার হয়ে আসতে পেরেছি বিপদ সংকুল বাধার পাহাড়-সাগর-অরণ্য-মরু।
বইখানা ওনাকে দিয়ে আর একবার প্রণাম করে দোতলার সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলাম নীচে। যে উচ্চতায় উঠেছিলাম সেখান থেকে পথে। যে পথে রিকশা চলছে, কাগজ কুড়াচ্ছে এক দরিদ্র বালক, সন্তান কোলে বাসি রুটি চেয়ে কাতরাচ্ছে এক ভিখারি মা, সেই পথের উপর। যে পথ আমার পথ।
এই পথে হেঁটে হেঁটে আমাকে পৌঁছাতে হবে আমার গন্তব্যে। কেউ আমার সহযাত্রী নেই, পথ চিনিয়ে দেবে না কেউ, আছাড় খেয়ে পড়ে গেলে হাত ধরে তুলে দেবে না কেউ। তবু আমাকে হাঁটতে হবে। থামা চলবে না। থামা মানে ইতি–অবসান, মৃত্যু।
আমি মরতে চাই না।
.
খড়ের গাদায় খুঁজলে নাকি হারানো সঁচও খুঁজে পাওয়া যায়, কিন্তু কে খোঁজে? যখন এক টাকায় একটা সঁচ কিনতে পারা যায়। তবু যদি কেউ খড়ের গাদায় সঁচ খোঁজে তাকে পাগল ছাড়া অন্য কিছু কী বলা চলে? এমনই একজন পাগল লোক সেই ১৯৮১ সাল থেকে প্রায় তিরিশ বছর আমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন। বর্তিকা পত্রিকায় আমার লেখাটি পড়বার পরই তার মাথার পোকারা নড়ে ওঠে-খোঁজো এই রিকশাওলাকে খুঁজে বের করো। খোঁজো এবং ধরো এবং যুক্ত করো।
তিনি প্রথম খোঁজ নিলেন বর্তিকার দপ্তরে। একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল। শুনলেন সেখানে আর সে যায় না। আর এই সব মানুষের তো কোনো ঠিকানা থাকে না। বর্তমানে কোথায় থাকে–তারা জানে না। তবে যাদবপুরে রিকশা চালায়, আছে হয়তো ওখানকার কোনো রিকশা লাইনে।
যাদবপুরে খোঁজখবর নিয়ে জানলেন, না, এখানেও সে নেই। চলে গেছে এখান থেকে। ওই নরেন্দ্রপুরের দিকে কোথায় যেন থাকে। যেখানে সন্ধান করে জানালেন, না, তার ঝড়ে উড়ে বেড়ানো শুকনো পাতা জীবন এখানেও তিষ্ঠোতে দেয়নি। ঠেলে দিয়েছে বহু দূর ছত্তিশগড়ে। সেখানে দল্লীতে শ্রমিক নেতা শঙ্কর গুহ নিয়োগীর সংগঠনে যোগ দিয়ে সাংগঠনিক কাজ করছে।
উনি গেলেন ছত্তিশগড়। তবে সেই রিকশাওলাকে দেখতে নয়। শঙ্কর গুহ নিয়োগীর সঙ্গে দেখা করতে। আশা অবশ্য একটা ছিল, যে, এবার হয়তো তার সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে। খোঁজ নিয়ে জানলেন, সে থাকে দল্লী থেকে দুশো মাইল দুরে বস্তার জেলার পারালকোটে। তবে মাঝে মাঝে দল্লীতে আসে। এই তো গত সপ্তাহে এসে চার পাঁচদিন থেকে ফিরে গেছেবস্তারের গভীর বনাঞ্চলে।
উনি দল্লীতে ছিলেন প্রায় এক সপ্তাহ। এর মধ্যে সে আসেনি তাই সেবারও দেখা হল না। এইভাবে কেটে গেছে অনেক কটা বছর, নিয়োগীজি মারা গেছেন, আর তারপর সে যে আবার পশ্চিমবঙ্গে ফিরে এসেছে, উনি জানতেন না। হঠাৎ একদিন খবর পেলেন গড়িয়ার পৌন্ড্রক্ষত্রিয় ভবনে বঙ্গীয় দলিত সাহিত্য সংস্থার এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। যে অনুষ্ঠানের উদ্বোধকের নাম সেই রিকশা চালকেরই নামে। এই কী সেই, যাকে আমি খ্যাপার মতো খুঁজে বেড়াচ্ছি? গেলেন উনি সেই অনুষ্ঠানে, আর তারপর যা হয়, পরিচয় হবার পর টেনে নিলেন বুকের ভিতর–মশাই আপনি তো সাংঘাতিক লোক, কোথায় না কোথায় আপনাকে খুঁজে বেড়িয়েছি, আর আপনি কীনা…!
এই লোকটির নাম অনন্ত আচার্য। সত্যিই অনন্ত। একটা টিউবওয়েল–যার আড়াই ফুট থাকে উপরে একশো ফুট থাকে মাটির গভীরে। অনন্তদার শেকড় যে সমাজ জীবনের কত গভীরে চারিয়ে দিয়েছেন আমি তার অন্ত পাইনি। মানুষ নয় উনি আমার কাছে এক অনন্ত বিস্ময়।
আমি একজন দলিত শ্রেণির মানুষ। হিন্দুধর্মের চতুবর্ণ ব্যবস্থায় ১৯১১ সালের আগে আমাদের চণ্ডাল বলে উচ্চবর্ণের লোকেরা অপমান, ঘৃণা করত এড়িয়ে চলত। কারও উঠোনে গিয়ে দাঁড়ালে গোবর জল ছিটিয়ে শুদ্ধ করত উঠোন। ছোঁয়া লেগে গেলে চান করে দেহ পবিত্র করত। মানুষকে শুধুমাত্র জন্ম-জনিত কারণে অপরাধী বলে একদল বর্বর মানুষ অপমান অবজ্ঞা অত্যাচার করে আনন্দ পেত।
সে অমানুষিক কুপ্রথা এখনও আছে, বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। তবে তা এই বাংলায়–বিহার বা উত্তর প্রদেশের মতো অতো উদোম উলঙ্গতায় নয়। সেখানে যদি কোনো তৃষ্ণার্ত দলিত উচ্চবর্ণের কোনো কুয়ো থেকে জল তুলে খায়, সেই অপরাধে পিটিয়ে মেরে ফেলতে পারে। এমনটা পশ্চিবঙ্গে হয় না। কারণ এক সময় এখানে কমিউনিস্ট আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠার ফলে, তেঁতো ওষুধকে যেমন মিষ্টি ক্যাপসুলের মধ্যে ঢাকা দিয়ে রাখা হয়–শ্রেণিঘৃণা নামক বায়বীয় বস্তু দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছিল বর্ণঘৃণাকে।
