আমি কোন ভয়ের কাছে নত হইনি, প্রলোভনে বিকিয়ে যাইনি, মাথা উঁচু করে শিরদাঁড়া সোজা রেখে সাহসের সাথে উচ্চারণ করেছি অমল সত্য। এই বই বহন করছে তারই সাক্ষ্য।
উনি কোনো কথা বললেন না, আমাকে জড়িয়ে ধরে মাথায় দিলেন তিনটি স্নেহ চুম্বন। ছল ছল করে উঠল ওনার দুচোখ। বাইরে কোনো প্রকাশ নেই, তবু মনে হয় এক পশলা বৃষ্টিপাত হয়ে গেল বুকের মরুভূমিতে। আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে আবেগঘন গলায় বললেন বুঝতে পারিনি, যে তুই এত লম্বা রেসের ঘোড়া, তোকে সত্যিই সেদিন আমি চিনতে পারিনি।
উনি সেই ১৯৮০ সালে জ্যোতিষ রায় কলেজে পড়াতেন। থাকতেন বালিগঞ্জ রোডে জ্যোতির্ময় বোসের বাড়ি ভাড়ায়। কলেজে আসা যাওয়া করতেন বাসে-রিক্সায়।
সেদিন ছিল এক শনিবার। কলেজের সামনে থেকে উনি উঠেছিলেন এক রিকশায়, যেমন তিনি রোজ ওঠেন। রোজ এইট বি স্ট্যান্ডে গিয়ে নেমে যান। উনিও ভুলে যান রিকশা অলার কথা, রিকশাঅলাও ভুলে যায় ওনাকে।
কিন্তু সেদিন ব্যাপারটা একটু অন্যরকম ঘটে গিয়েছিল। সেদিন সেই রিকশাঅলা দু’একটা কথা বলেছিল। যাতে বোঝা গিয়েছিল–এ একটু অন্যরকম। অন্যসব রিকশাওলার মতো নয়। বই টই পড়ে, দেশের নানা বিষয়ে কিছু খোঁজখবর রাখে।
উনি তখন একটি পত্রিকার সম্পাদনা শুরু করেছিলেন, যার নাম বর্তিকা। এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক মনীষ ঘটক। যিনি মহাশ্বেতা দেবীর বাবা। এখন এর দায় দায়িত্ব ওনার উপর বর্তেছে। উনি সম্পাদনার দায়িত্ব নিয়ে পত্রিকাটিকে একটি নতুন রূপ দেবার চেষ্টা করেন, গল্প, উপন্যাস কবিতা নয়, সাধারণ মানুষের সত্যনিষ্ঠ গ্রাম সমীক্ষার বাস্তব চিত্র দিয়ে ভরিয়ে তুলতে থাকেন পত্রিকার পাতা।
ইতিপূর্বে বর্তিকায় ক্ষেতমজুর, বর্গাদার, ছোট কৃষক, ইটভাটার মজুর, জুতো কারখানার কর্মী, এমন ধরনের অনেক লিখেছে, লেখেনি কোনো রিকশা শ্রমিক। ওনার তখন মনে হল যে, একটা লেখা এইরিকশাওলাকে দিয়ে লেখানো যেতে পারে। শহর কলকাতায় এদের জীবন বহুবিধ সমস্যা, সেই সমস্যা নিয়ে লিখলে বর্তিকার পাঠকরা একটু ভাবনা চিন্তার খোরাক পাবে।
তাই তিনি সেই রিকশাওলাকে দিয়ে লেখালেন। সেটা ১৯৮১ জানুয়ারি সংখ্যা–বর্তিকায় প্রকাশিত হল। এক কিছুদিন পরে তিনি সেই রিকশাওলার কথা ভুলে গেলেন। রোজ কোন না কোন রিকশায় চাপেন, কত মুখ মনে রাখবেন। রোজ কত না কত জন বর্তিকায় লেখে, কার নাম মনে রাখবেন। মানুষের মস্তিষ্ক হচ্ছে সেই কক্ষ যার কিছু পুরাতনকে জায়গা করে দিলে নতুন কিছু রাখার স্থান সংকুলান হয় না।
একবার প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধি সুন্দরবনের বাসন্তীতে গিয়েছিলেন। তখন এক চায়ের দোকানের বাচ্চা চাকরকে দেখে কী ভাবে কে জানে কাছে ডেকে একটু আদর করে দেন। তারপর ফিরে যান দিল্লিতে। সবাই ভেবেছিল বাচ্চার বোধহয় ভাগ্য ফিরে গেল। কিছুই ফেরেনি, দিল্লি গিয়ে হাজার কাজের চাপে সে বাচ্চার কথা মনে থাকেনি ইন্দিরা গান্ধির। আজও সে বাচ্চা চায়ের গেলাস ধোয়। তবু তার মনের মণিকোঠায় উজ্জ্বল হয়ে রয়ে গেছে সেই দিনটা।
ছত্তিশগড়েন একজন এম.এল.এ. বিল ক্লিন্টনের সাথে হাত মিলিয়েছিল। এক মাস সে সেই হাতে কোনো কাজ করেনি, ধোয়নি। আর ক্লিন্টন? সে সম্ভবতঃ কীটনাশক সাবান দিয়ে ধুয়ে পরিচ্ছন্ন করে নিয়েছিল নিজের হাত।
মহাশ্বেতা দেবীর কাছে সেটা বড় কোনো ঘটনা হবার নয় যেটা সেই রিকশা চালকের জীবনে সর্বশ্রেষ্ঠ ঘটনা, জীবনের এক যুগ সন্ধিক্ষণ। চুম্বক যেমন জানে না, তারই স্পর্শে লোহাও চুম্বক হয়ে যায়, ওনার সামান্য ছোঁয়া পেয়ে সেই রিকশা চালকের মনে জন্ম নিয়েছে আশার একটা ছোট্ট চারাগাছ-আমি লেখক হবো।
সেই আশার বাতি বুকে আঠাশটা বছর শত রকম দুঃখ কষ্ট জীবন যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে এক পা এক পা করে হেঁটে, কারও কোনো সহায়তা ছাড়া, হাজার লেখকের ভিড়ে, নিজের একটা স্থান বানিয়ে নেওয়া–এটা কোনো গল্প উপন্যাসের চেয়ে কম নয়।
এখন কী ওনার মনে কোনো কষ্ট হচ্ছে? ছেলেটার জন্য একটু কিছু করা দরকার ছিল। মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য। একটু সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলে, একটু সামান্য সাহায্য পেলে ও অনেকটা এগিয়ে যেতে পারত। তাহলে আজ একলব্যের গুরু দ্রোণের যে স্থান আগামী ইতিহাসে ওনার সে স্থান হতো না, হতো কুরুক্ষেত্র বিজয়ী বীর সব্যসাচীর গুরু দ্রোণাচার্যের সমান স্থান, সম্মান।
তাই কী আক্ষেপ এখন ওনার গলায় আমি সেদিন বুঝতে পারিনি রে। কত লোকের লেখা বর্তিকায় ছেপেছি, একজনও তোর মতন হতে পারল না।
আমি যা হয়েছি তা শখে হইনি, অন্য কিছু হবার কোন পথ ছিল না, তাই হয়েছি। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল হতে পড়াশোনা লাগে, নেতা অভিনেতা খেলায়াড় হতে প্রতিভা থাকা দরকার, যার পড়াশোনা নেই প্রতিভা নেই সে অন্য কিছু কী করে হবে?
আমার বাবার কাছে একটা রূপোর টাকা ছিল। বাবা তাকে বলতেন ষোল আনা। আমার কাছে ষোল আনা আছে, সেটাই ছিল তার গর্ব–পথে যেতে যেতে সেটা তিনি কবে যেন কুড়িয়ে পেয়েছিলেন। সারা জীবনে শত অভাব অভিযোগের মধ্যেও উনি সে টাকাটা কোনদিন ভাঙাননি। আগলে রেখেছিলেন যক্ষের ধনের মতো। পরে অবশ্য তার সেই পথে পাওয়া টাকা পথেই হারিয়ে যায়।
