তাদের ভেঙে চুরে নতন বাধা বিনীত করে ফেলার একটাই অস্ত্র-সব দেশের সব স্বৈরাচারি শাসক যা করে থাকে, যার পোষাকি নাম–আইন শৃঙ্খলা রক্ষা। এই একটি মাত্র শব্দের আড়ালে মহিলা যোনীতে শাবল ঢুকিয়ে দেওয়া যায়, দুধের বাচ্চা দু’পা ধরে টেনে ছিঁড়ে ফেলা চলে, মৃত স্বামীর গুলিবিদ্ধ দেহের সামনে ক্রন্দরতা ভীত শোকাহত শরীরকে পিটিয়ে শুইয়ে দেওয়ায় বাধা নেই, এইসবই ঘটানো হয় নন্দীগ্রামে। সিপিএম দল একদিন ক্ষমতায় এসে মরিচঝাঁপিতে যে ধর্ষণ, সংস্কৃতির সূচনা করেছিল, নন্দীগ্রামে তারই বন্ধুহীন প্রয়োগ করে সংগ্রামী মানুষের মনোবল চুর্ণ করার জন্য। রাধারাণী আড়িকে সামান্য দিন ব্যবধানে দু’দুবার গণধর্ষণ করানো হয়। এক ১৪ মার্চ, ২০০৯, ১৪ জন মানুষকে খুন করা হয়। এই সবই করা হয় সাদা ধুতি, সাদা পাঞ্জাবি, সাদা চুলের সাহিত্য সংস্কৃতির বড় প্রবক্তা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সাধের শিল্পায়নের জন্যে।
সারাদেশ উত্তাল হয়ে ওঠে এই ঘটনায় ছাত্র যুবক শিক্ষক কবি লেখক গায়ক অভিনেতা শিল্পী সাহিত্যক-সমাজের সর্বস্তরে শোনা গেল একই ধিক্কার ধ্বনি–ছিঃ। ছিঃ মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। সাদা পোষাকের নীচে তোমার এই নরখাদক হিংস্র রূপটা লুকানো ছিল, সে আমরা আগে জানতাম না। ধিক্কার তোমাকে, শত ধিক্কার।
এই অন্যায়–রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে পথে নামল মানুষ। আবাল বৃদ্ধ শিশু নারী, কেউ বাদ গেল না। লাখো লাখো মানুষের প্রতিবাদী মিছিল বন্যার মতো আছড়ে পড়তে লাগল মহানগরীর বুকের উপর। যারা মানুষের প্রতি দায়বদ্ধ–সেই সব কবি শিল্পী সাহিত্যিক অভিনেতা সংবেদী মানুষ, একের পর এক বিষ্ঠাবৎ পরিত্যাগ করতে লাগলেন খুনি সরকারের দেওয়া পদ, পুরস্কার, খেতাব। প্রতিবাদী মানুষের সমর্থনে ছুটে এলেন নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনের নেত্রী মেধা পাটেকর, আদিবাসী মানুষের জল জঙ্গল জমিন নিয়ে অক্লান্ত লড়ে যাওয়া ভারত জনআন্দোলনের নেতা ড. ব্রহ্মদেও শর্মা, হাজার হাজার বন্ধক মানুষের মুক্তি এবং পুনর্বাসনের দাবিতে সড়ক সে সুপ্রিম কোর্ট’ পর্যন্ত লড়ে যাওয়া সন্ন্যাসী স্বামী অগ্নিবেশ। কলম থেকে আগুন উগরে দিতে লাগলেন মহাশ্বেতা দেবী। কত মানুষ, কত যে নাম তা গুনে শেষ করা যাবে না। বিগত চৌত্রিশ বছর কালে এই দেশ–এই পশ্চিমবঙ্গে এমন জনজোয়ার কোনোদিন দেখেনি।
যে চারজনের নাম উল্লেখ করেছি চারজনই আমার পরিচিত। শেষ জনের সঙ্গে তো সেই ১৯৮০ সাল থেকে চেনাজানা। অন্য তিন জনের সাথে স্বল্প সময়ের পরিচয় হলেও তাদের আন্দোলনে অংশ নিতে মিছিলে হেঁটেছি এক সাথে এক দু’পা।
তাকিয়ে দেখি, যে সব পত্র পত্রিকায় আমি লিখি, যাদের সাথে উঠি বসি, নন্দন চত্বরে কফি হাউসে আড্ডা দিই, যারা আমাকে শঙ্কর গুহ নিয়োগীর লোক বলে ভালোবাসে, সেই যে পুর্ণেন্দু বোস, যার সাথে খাদ্যে বিষক্রিয়াজনিত অসুস্থতায় পড়েছিলাম এক নদীর পাড়ে সেই ছত্তিশগড়ের পারালকোটে, সাথে আরও ছিল কুশল দেবনাথ, চঞ্চল মুনশি–সব সৎ দরদী নিঃস্বার্থ মানুষ এসে দাঁড়িয়েছে ওই লড়াকু কৃষক জনগণের পিছনে।
রণপা পরা নাচের পা আমার, রণবাদ্য শুনলে আর স্থির থাকতে পারে না, নাচতে চায়। টের পাই বুকের মধ্যে মাদলের দ্রিমিদ্রিমি? ওই মাঠ মাটি অকুতো মানুষ আমাকে ডাকে আয় আয়। এই তোর পথ। এই পথই তোর। এখানে এসে দাঁড়িয়ে পড়। এটা যুগ সন্ধিক্ষণ। এই সময় তোর সময়।
তবু আমি সে ডাকে সাড়া দিতে পারি না। এগিয়ে যেতে পারি না। যার সবার আগে যাবার কথা তার অগ্রগমণ রোধ করে দাঁড়ায় অসহ্য পেটের খিদে। যেদিন আমি ওখানে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ব, ওরা, আমাকে ঘিরে রাখা হার্মাদ দস্যুরা, দুধ থেকে তুলে ফেলা মাছির মতো কাজ থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেবে। তখন খাব কী! বাঁচব কী ভাবে? তাই রয়ে যাই পেটের গোলাম হয়ে মানবতার সব চেয়ে বড় শত্রুদের শিবিরে–না ঘরকা না ঘাটকা হয়ে। মোটবওয়া ধোপার গাধার মতো।
এই সময় তীব্র যন্ত্রণায় একটা কবিতা লিখেছিলাম মেধা পাটেকরকে মনে রেখে সেটা লেখার লোভ সামলানো গেল না। সেটি পরে ১৪১৭ শরৎ সংখ্যা ‘নতুন পথ এই সময়’ পত্রিকায় প্রকাশ হয়।
অক্ষমতা
অনেক দূর থেকে
অনেক পথ পার হয়ে
তুমি এসেছিলে–আমার জন্যে
আমাদের সবার জন্যে
আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে
তুমি একা হেঁটেছিলে
দস্যুর হাতে লুঠ হয়ে যাওয়া
সোনালী ধান ক্ষেত, আলপথ ধরে
তুমি একা…।
তোমার পিছনে পিছনে হেঁটে গিয়েছিল
রুক্ষ শুষ্ক বিবর্ণ তবুও আত্মদীপ্ত
সুদীর্ঘ সহস্র মানুষের মিছিল।
সবাই গিয়েছিল, সবাই–
শুধু আমি একমাত্র আমিই
যার সবার আগে যাবার কথা,
–যেতে পারিনি
পথ তো অচেনা ছিল না
পথ তো অপ্রিয় ছিল না
তবু, তবুও…।
তুমি একাই হেঁটেছিল–
তোমার পিছনে হেঁটে গিয়েছিল
যে শিশু ভূমিষ্ট হবে আজ রাতে
তার অনাগত ভবিষ্যতের উদ্বোধন গীত
আমি পারিনি
শুধু আমিই পারিনি
আমার নিজের জন্য
এক পা এগিয়ে যেতে
পথ অচেনা ছিল না অপ্রিয়ও নয়
তবু, তবু…।
এই সময় একদিন দুপুরে গেছি মহাশ্বেতা দেবীর বাড়িতে। উনি তখন গলফগ্রিনে থাকতেন। সাথে করে নিয়ে গেছি আমার সদ্য প্রকাশিত উপন্যাস ‘চণ্ডাল জীবন’। উনি এই বইয়ের জন্য ভূমিকা লিখেছিলেন। বইখানা ওনাকে দিয়ে প্রণাম করলাম। আমার দুটো চোখের জল ঝরে পড়ল ওনার পায়ের পাতায়। যেন হাজার বঞ্চনার, অভাব অভিযোগের অত্যাচারের গোপন ইতিহাস লুকানো আছে ওই চোখের জলের মধ্যে। যেন সেই জল বলছে, দেখ, আমাকে দেখ। একদিন যে ছোট প্রদীপটা তুমি আমার বুকের মধ্যে জ্বালিয়ে দিয়েছিলে, হাজার ঝড় ঝাঁপটায় আমি তাকে নিভে যেতে দিইনি। প্রাণের মতো, শ্বাস প্রশ্বাসের মতো আমার দুর্বল দুটো হাতের আড়াল দিয়ে অনির্বাণ রেখেছি। আর বহন করে নিয়ে চলেছি পতাকার মতো।
