ওয়ার্ডেন খুঁজছিল একটা মোক্ষম অজুহাত। যেটা দেখিয়ে আমার গ্রীষ্মের ছুটিটা রদ করা যায়। তার নজর গেল সৌমেন্দুর দিকে। ছেলেটার অনেক দিন ধরে একটা রোগ আছে সেটা হাইড্রোসিল। এমনিতেই এইসব বাচ্চাদের প্রতি মানুষের দয়ামায়ার ভাণ্ড উপচে পড়ে, তার উপর রুগী। একে সামনে রেখে পিছনে বসে যেকোনো বদ উদ্দেশ্য সফল করতে খুব বেশী সমস্যা হবার নয়।
তাই করে সে। কী? না ওর হাইড্রোসিল অপারেশন হবে। ওকে এখানেই রাখা হবে, বাড়ি পাঠানো যাবে না।
হোস্টেলে রয়ে গেল সৌমেন্দু প্রধান। সে বা তার বাবা বেঁচে গেল ফালতু নিয়ে যাওয়া নিয়ে আসার ঝামেলা থেকে। আর পুরো গ্রীষ্মের কুড়ি বাইশ দিন ছুটি পাওয়া থেকে বঞ্চিত হলাম আমি। লেখা হল না যে উপন্যাসটা লিখব বলে অপেক্ষা করে ছিলাম।
সে গ্রীষ্মে সৌমেন্দুর অপারেশন হয়নি। হবে না যে সে তো ওয়ার্ডেন জানত। অপারেশন হয়েছিল শীতকালে। তবু তাকে হোস্টেলে রেখে খুব বুদ্ধি খাঁটিয়ে আমাকে দারুণ দাবদাহে তার সাথে অন্য চল্লিশ জন লোকের রান্না করতে বাধ্য করা হয়েছিল শুধু এই কারণে, আমি যেন লিখতে না পারি।
ঠিক মনে করতে পারছি না কবে কোথায় যেন একটা কবিতা পড়েছিলাম। যার লাইনগুলো ছিল এই রকম–
আমাকে তোমার এত ভয়।
কেন কমরেড?
সেকি শুধু ঘুরে দাঁড়িয়েছি বলে
তাতেই ভয়?
এখনও তত জ্বালিনি আগুন
শ্মশানের ধুলো ওড়াইনি
ধিনিকি ধিনিকি নাচনে
এখনও নামিনি পথে
বৃষভ বাহনে
তবু ভয় পেলে কমরেড?
আমি যখন একা প্রবল পরাক্রান্ত বিরুদ্ধ শক্তির বুহ্যে বসে সাহিত্যচর্চা করে চলেছিলাম যে কোনো মুহূর্তে যা কিছু হয়ে যেতে পারে সেই ভয় বুকে নিয়ে, তখন কিন্তু জেলখানার মতো পাঁচিল ঘেরা স্কুলের জগৎটার বাইরে একটু একটু করে মানুষের ভয় ভাঙছিল। প্রতিবাদী জন বিবেক জাগ্রত হচ্ছিল ধীরে ধীরে। এর প্রথম সূর্যকিরণ দেখা গিয়েছিল হুগলী জেলার সিঙ্গুর ব্লকে ২০০৬ সালে। যে প্রতিবাদের স্ফুলিঙ্গ ওখানে জ্বলে উঠেছিল তা দাবানলের মতো ছড়িয়ে গিয়েছিল সারা পশ্চিমবাংলার জনগণের মনে বুকে আত্মায়। ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ শাসকদল সে আগুনের আঁচ অনুমান করতে পারেনি। বুঝে উঠতে পারেনি সাধের লঙ্কা পুড়ে ছারখার হতে বসেছে।
তাই, সিঙ্গুরের আঠারো হাজার পরিবারকে গায়ের জোরে উচ্ছেদ করে তাদের তিন ফসলি চাষের জমি কেড়ে নিয়ে শিল্পপতি রতন টাটাকে উপঢৌকন স্বরূপ দিয়ে ছিল বর্তমান সরকার, যে নাকি শ্রমিক কৃষকের সবচেয়ে বড় বন্ধু।
কুড়ি কাঠায় এক বিঘে, তিন বিঘেয় এক একর, তারই ৯৯৭ একর। জমির পরিমাণ শুনে মাথা ঘুরে যাবার দশা আমার। আমি সারা জীবনে চেষ্টায় সোনারপুর থানার পথঘাট জল বিদ্যুৎবিহীন একদার জলাজমির মাত্র দু’কাঠার মালিক। তাও খাস জমির। কে যে এর আসল মালিক তা কে জানে। সিপিএমের লোকেরা দখলে রেখেছিল। দশ টাকার কোর্ট পেপার লিখে তারাই বেচল। আমার মতো অনেকে কিনে ঘরদোর বানিয়ে বসেছে। মাঝে মাঝে হুঙ্কার আসছে আজকাল, এখানে চিড়িয়াখানা হবে। তবে সেটা খুব একটা মসৃণ পথে হবে না। উচ্ছেদ হলে মানুষ মরণ কামড় দেবে।
যেমন দিয়েছে সিঙ্গুর। কৃষক ক্ষেতমজুররা ভিটে মাটি থেকে উৎখাত এর বিরুদ্ধে ফেটে পড়েছিল তীব্র বিক্ষোভে। তাদের দমন করতে একশো চুয়াল্লিশ ধারা জারি করে হাজার হাজার পুলিশ, হাজার হাজার লাঠিয়াল নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তারা লাঠি, গুলি, খুন, ধর্ষণ, লুটপাট যা ইচ্ছা তা করার অনুমোদন পেয়ে নেমে পড়েছিল কৃষক জনতার সব প্রতিরোধ আন্দোলন গুঁড়িয়ে দিতে।
এরপর যা হয় সে ইতিহাস আজ আর কারও অজনা নয়। সেই ইতিহাসের অঙ্গ হয়ে রয়ে গেছে তাপসী মালিক আর রাজকুমার ভুলের নাম। এরই প্রতিবাদে পথে নামল লক্ষ জনতার স্বতঃ স্ফুর্তমিছিল। পথে নামলেন অশীতিপর বৃদ্ধা সাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবী। ধর্মতলায় অনশনে বসলেন অগ্নিকন্যা মমতা ব্যানার্জী।
প্রবল বিরোধ তবু সিঙ্গুর ব্লকের জমি অধিগ্রহণ স্থগিত রাখেনি দাম্ভিক সরকারের দাম্ভিক প্রধান। অধিগৃহীত জমির চার দিক ঘিরে গড়ে তোলা হয়েছিল উঁচু পাঁচিল। হাজার হাজার রাজ্য পুলিশের তখন একটাই কাজ, পাঁচিল পাহারা দেওয়া। জনরোষ আছড়ে পড়ে বারবার ভেঙে দিচ্ছিল, পুলিশ পাহারায় বার বার বসানো হচ্ছিল ওই পাঁচিল।
সিঙ্গুর দখল মোটামুটি সম্পন্ন হবার ফলে জমির ক্ষুধা বেড়ে গেল শিল্পপতিদের তাদের বন্ধু সরকারের মুখ্যমন্ত্রীর। এবার তার শেন্য দৃষ্টি গেল পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রামের দিকে। এবার সেখানকার মানুষকে উচ্ছেদ করে সে জমি সালেম নামক এক শিল্পপতির হাতে তুলে দেবার প্রক্রিয়া চালানো হল। পুলিশের পোষাক পরা ক্যাডার, আর ক্যাডারের ভূমিকা পালন করা পুলিশ লেলিয়ে দেওয়া হল নন্দীগ্রামের দিকে। যাও দখল করো। চল্লিশ হাজার একর জমি চাই ওখানে। শুরু হয়ে গেল আবার খুন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুঠপাট।
মানুষ তো শেষ পর্যন্ত সবকিছুর পরেও মানুষই হয়। সে বেঁকে যেতে যেতে সোজা হয়। মার খেতে খেতে মরিয়া হয়ে উঠে দাঁড়ায়। তাইনন্দীগ্রামের মানুষ রুখে দাঁড়াল। রুখে দিল সেই দলকে এক সময় যে দলকে তারাই বলবৃদ্ধি করেছিল, এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। তাদের বাল্যের মাতৃক্রোড় শৈশবের ক্রীড়াভূমি, যৌবনের প্রেম, বার্ধক্যের বারাণসী–নিশ্চিন্তে মরবার মাটি মায়ের অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে আগুন হয়ে জ্বলে উঠল তারা।
