দত্তদা, এই সমাজে ব্যক্তি মানুষ হিসাবে আপনার মূল্য কানাকড়িও নয় যা কিছু প্রভাব প্রতিপত্তি সব ওই পার্টির সাথে জুড়ে আছেন বলে। যদি আপনার এই সব চক্রান্ত ফাঁস হয়ে যায়, যদি পার্টি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসাবে আপনাকে আলাদা করে দেয় এক মিনিটে শূন্য হয়ে যাবেন। এটুকুও কি বোঝার মতো বুদ্ধি আপনার নেই? কেন যে ডালে বসে আছেন তাতে কুড়ুল মারতে যাচ্ছেন? এতে শুধু আপনি একা মরবেন না, আপনার বউ মেয়ে ওরাও সবার চোখে হেয় হয়ে যাবে।
আপনাকে এত কথা বলার দরকার ছিল না। আপনি যদি আগুন খান গাল আপনারই পুড়বে। তবু এই জন্য বলছি, এক সঙ্গে অনেকগুলো বছর ছিলাম তো, আপনার ক্ষতি হলে সেটা আমার ভালো লাগবে না তাই বুঝিয়ে বলা। এ সব ধ্বংসাত্মক ভাবনা, আত্মহননের পথ পরিত্যাগ করুন। আপনার যা বয়েস এ সব ছেলে মানুষি আপনাকে মানায় না। যদি আমার কথা না মানেন যা ইচ্ছা করুন আর কি বলব।
.
কি যে করবে কিছুতে বুঝে উঠতে পারছে না ওয়ার্ডেন। একটার পর একটা লেখা ছাপা হয়েই আছে। কিছুতেই থামিয়ে দেওয়া যাচ্ছে না লোকটার কলম। প্রতি পুজোয় বের হচ্ছে একটা উপন্যাস, মাসে কমপক্ষে একটা গল্প। এত কাজের চাপ, এরপর লেখে কখন! কখন লেখার সময় পায়! উপন্যাসে কত পাতা! কী করে পারে লোকটা এইসব করতে।
সাধারণতঃ স্কুলের চাকরির মতো আরামের চাকরি আর একটাও নেই। এগারোটা থেকে চারটে মাত্র পাঁচঘন্টা ডিউটি। তার উপর এর জন্মদিন ওর মৃত্যুদিন, স্বাধীনতা, প্রজাতন্ত্র-সব মিলিয়ে যে কত ছুটি। আছে পুজোর ছুটি গরমের ছুটি। তবে এইসব ছুটি শুধু শিক্ষক এবং দু’চারজন শিক্ষাকর্মীর জন্য। দারোয়ান, সুইপার, রাঁধুনি–এরা বাদ। আমরা রাঁধুনিরা, ছুটি পাই যদি হোস্টেলে কোনো বাচ্চা না থাকে।
সব ছুটিতে সব বাচ্চা বাড়ি যায় না। অনেকের বাড়ির আর্থিক স্থিতি ভালো নয়, বাচ্চাকে ঠিকমতো খেতে দিতে পারে না, অনেকের বাড়ি দুরে। সেই মা বাবা বাচ্চাকে বাড়ি নিয়ে যেতে চায় না। অভাগা বাপ-মায়ের সেই অভাগা বাচ্চাগুলো এখানে পড়ে থাকে। ওদের কারণে আমরা পড়ে থাকি। ছুটি পাইনা। আমরা না এলে ওরা খাবে কী। বাচ্চাদের জন্য রান্নাটা করতে আমাদের আসতে হয়–সে একটা দুটো যাই-ই হোক সেইসাথে রান্না করতে হয় বহিরাগত এখানে শেল্টার পাওয়া অন্য চল্লিশ পঞ্চাশ জনেরও। নানাবিধ কারণে যারা পাড়া ছাড়া বা বাড়িতে যেতে পারে না। আমরা না এলে এদের নিজে বেঁধে খেতে হয়!
এদের সবাইকে যে পুলিশ বা বিরোধী দলের লোকেরা খুঁজছে তা নয় কেউ কেউ এমনও আছে যে কলকাতায় কোথাও চাকরি করে। কেউ চাকরি পাবার উপযুক্ত হবার প্রশিক্ষণ নিচ্ছে শহরের কোন সংস্থায়। কেউ পড়াশোনা করছে কোনো কলেজে। সবারই বাড়ি বহু দুরে আর এদের বাবা কাকা দাদা মামা—কেউ না। কেউ অবশ্যই সিপিএম দলের স্থানীয় নেতা।
আমি মোটামুটি ভাবে গ্রীষ্মের ছুটির আর পুজোর ছুটির সময়টাকে বেছে রাখি কোনো একটা বড় লেখার জন্য। গ্রীষ্মের ছুটিতে যেটা লিখি সেটা পুজোর সময় ছাপা হয়, আর পুজোয় যেটা লিখি ছাপা হয় বইমেলায়। আমার কর্মস্থলের প্রায় সবাই সেটা জানে। জানে ওয়ার্ডেনও।
সে এবার স্থির করে নেয় এই গ্রীষ্মের ছুটিতে আমাকে লিখতে দেবে না। আসছে পুজোয় ছাপতে দেবে না আমার উপন্যাস। তাতে অবশ্য খুব বেশি ক্ষতি করা হবে না তবু একেবারে কিছু না হওয়ার চাইতে সামান্য কিছু হলেও বা মন্দ কী!
এখন দারুণ দাবদাহ চলছে। তাপমাত্রা ওঠা নামা করছে চল্লিশ ডিগ্রির আশেপাশে। চারদিক যেন জ্বলে যাচ্ছে তার প্রবাহে। সেই প্রখর রোদ রান্নাঘরের টিনের চালে পড়ছে। ঘরের ভেতরটা যেন ফার্নেশের মতো তেতে উঠছে। যেখানে আবার জ্বলছে বড় বড় দু’খানা উনুন। তারই সামনে দাঁড়িয়ে ঘামে নেয়ে চুপচুপে হয়ে লোকটা রান্না করছে, ভাবতেই দেহমনে শিহরণ খেলে যায় ওয়ার্ডেনের! কী দারুণ একটা মজার ব্যাপার। ছুটির ছুটিও গেল উপন্যাসও লেখা হল না। বাড়তি পাওনা–দহন। মন পুড়বে লিখতে না পারার জন্য, শরীর পুড়বে আগুনের তাপে। আহঃ কী বিভৎস মজা! ওকে এই কষ্টে ফেলে সেই মজা উপভোগ করতে হবে।
ওয়ার্ডেন অতীব চালাক লোক। তার হাতে আছে একগাদা বোবা বাচ্চা। এদের চাল হিসাবে ব্যবহার করতে শিখন্ডি দাঁড় করাতে কোনো অসুবিধা নেই। সুস্থ-সামাজিক মানুষের সমস্ত সহানুভূতির কেন্দ্রে আছে এরা। এদের সামনে এগিয়ে দিয়ে পেছন থেকে কলকাঠি নেড়ে যে কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করার যথেষ্ট সুযোগ।
একটি ছেলে এসেছে এখানে নাম সৌমেন্দু প্রধান। বাড়ি বহু দূর সুন্দরবনের এক অজ গাঁয়ে। যেখানে এখনও পাকা সড়ক হয়নি, বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি। সৌমেন্দুর বাবা বড় গরিব। অনেক কষ্টে কোনমতে ছেলেটাকে এখানে ভর্তি করাতে পেরে যেন হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছে। আর কিছু না হোক ছেলেটা পেট ভরে খেতে পাচ্ছে, গায়ে গতরে বাড়ছে-এই যথেষ্ট। বাড়িতে থাকলে তো খেতেই পেত না। ওর বাপ ওকে রেখে চলে যাবার পর অন্য বাপের মতো মাসে মাসে এসে ছেলেকে দেখে যাওয়া কি লাগবে না লাগবে খোঁজ নেওয়া সেসব পারে না। পেরে ওঠে না আর্থিক অনটনের জন্য। পথ খরচ যে জোগাড় হওয়াই কঠিন। তার উপর একটা দিন কাজ কামাই দিলে সংসারেও টান পড়ে। সেই জন্য সে আসে বছরে চার বার। গরম আর পূজোর ছুটিতে সৌমেন্দুকে নিয়ে এবং দিয়ে যাবার জন্য। পুজোর ছুটিতে সৌমেন্দু বাড়ি যায় খুশি মনে। সেটা একটা আনন্দ উৎসবের সময়। চারদিকে কত হৈচৈ। তখন একা একা হোস্টেলে পড়ে থাকতে কার ভালো লাগে। আর গরমের ছুটিতে বাড়ি যায় বাধ্য হয়ে–ভারাক্রান্ত মনে। বাড়িতে এখানকার মতো পাখার হাওয়া, পাকা ঘর, খাট সে সব কিছুই নেই। পেট ভরে খাবারও জোটে না। বড় কষ্ট।
