আপনি আমাকে একদিন বড় সাহেবের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। যেভাবে আর যে কারণেই হোক একটা কাজ পেয়েছি। দুবেলা দুমুঠো খেতে পাচ্ছি। এর জন্য আমি আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ।
সেই কৃতজ্ঞতা বোধ থেকেই আমি আপনাকে কথা দিয়েছিলাম আমি কোনদিন আপনার অবাধ্য হবে না। যা বলবেন তা করবো। দশ বছর ধরে করে গেছি তা, একটা ফোন করে যখন যা বলেছেন। “ভোর চারটেয় লেকের পাড়ে গিয়ে দাঁড়াস”। দাঁড়িয়েছি। এর জন্য কোনদিন কোনো মূল্যও দাবি করিনি। প্রয়োজন আপনার, তবু আপনি একটাকা খরচ করে সেটা আমাকে জানাতে চাননি, মিস কল মেরে দিয়েছেন আমি আমার পয়সা খরচ করে কি দরকার জেনে কুকুরের মতো আপনার বাড়ি ছুটে ছুটে গেছি। করেছি আরো অনেক কিছুই সেতো আমি আর আপনি-দুজনে জানি। ওই পর্যন্ত সব ঠিক আছে। কিন্তু কি করে এক পুকুরে যেখানে হাজার হাজার লোক চান করে, হাজার হাজার টাকার মাছ ছাড়া আছে তাতে বিষ ঢেলে দিতে বললেন, আমি ভাবতে পারছি না। কি করে মনে করলেন যে এত হীন নীচ জঘন্য কাজ আমি বিনা দ্বিধায় করে দেবো? এ কাজ কি আমার মত একজন মানুষ যে লেখে, যে মার্কসবাদের ছাত্র করতে পারে?
আমি আবারও বলছি, আপনি যা বলবেন তাই করব। তবে শর্ত একটাই সেটা যেন সময় সমাজ মানুষের মঙ্গলের জন্য হয়। সেটা করতে গিয়ে আমি মারা গেলে যেন লোকে শহিদ বলে। বেদী বানায়, মালা দেয়। কিন্তু ওটা? যা করার জন্য আপনি চাপ দিচ্ছিলেন, এতে মানষু সমাজের কি মঙ্গল হবে? কারো কোনো মঙ্গল তো হবেই না, উল্টে আপনার প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে গিয়ে আমি যদি ধরা পড়ে যাই জনগণ কুকুরের মতো পিটিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলবে। সর্বসাধারণের ব্যবহারযোগ্য জল, মহিলা সমিতির স্বনিযুক্তি প্রকল্পের মাছ মারার শাস্তি হাতে হাতে পেয়ে যাব।
যদি মারা নাও যাই যেতে হবে জেল গারদে। চাকরিটাও আর থাকবে না। এরপর আরো আছে। লেখকমনোরঞ্জন ব্যাপারী সামাজিক অপরাধ করে ধরা পড়েছে সে খবর পত্রিকায় টিভিতে থাকবেনা তা কি করে সঙ্গবফলে সারা দেশজেনে যাবে আমার চুড়ান্ত নৈতিক অধঃপতন। সারা জীবনের অক্লান্ত পরিশ্রমে যেটুকু বা মান সম্মান অর্জন করেছি সব ধুলোর সাথে মিশে যাবে। আর কোনদিন কারো সামনে মাথা উঁচু করতে পারব না, সবাই ছিঃ ছিঃ করবে। সব সাধ, স্বপ্ন, সাধনার অপমৃত্যু হয়ে যাবে। আপনি কি করে ভাবলেন যে এই রকম আহাম্মুখির কাজ আপনি বলবেন আর আমি করে দেবো! আমি কি এতই নির্বোধ!
আপনি সেদিন আমাকে তিরস্কার করে বলেছিলেন-“তুই ভীত হয়ে পড়েছিস!” সত্যিই আমি ভীত হয়ে পড়েছি। সে ভয় মান-সম্মান হারাবার ভয়। ওইটুকু ছাড়া আর আমার কি আছে? দশজন গুণী মানুষ চেনে, দশটা অনুষ্ঠানে মঞ্চে বসি, যে মঞ্চে খ্যাতনামা সব মহান মানুষেরা থাকে।ওইটুকু হারাবার ভয় যে কি বিষম ভয় সে একমাত্র তারাই জানে, যাদের আছে। আর জানে তারা, যারা হারিয়েছে।
ধরা যাক আমি স্পটে ধরা পড়লাম না। সফল এ্যাকশানের পর অক্ষত শরীরে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়ে গেলাম, তারপরও কি মনে করেন বেঁচে যাব? না বাঁচবো না। তখন মহিলা সমিতি আর সাথে স্থানীয় নেতা-জনতা যাবে থানায়। কেস করবে। করবেই। পুকুর আগে আপনার ছিল, আপনার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে। পুলিশ সবার আগে আপনাকে সন্দেহ করবে। কারও না–অন্য কারো চাইতে আপনার রাগ বেশি থাকা স্বাভাবিক। সেটা বুঝেনিতে অপরাধ তত্ত্ব নিয়ে নাড়াচাড়া করা পুলিশ অফিসারদের বেশি বিলম্ব হবে না। কত বড় বড় কেস ওরা ধরে ফেলে। সে তুলনায় এতো জলভাত। চব্বিশ ঘন্টা সময় যাবে না ওরা আপনাকে তুলে নেবে। তখন কি হবে? পারবেন পুলিশের মার আর জেরার সামনে মুখ বন্ধ রাখতে? পারবেন না। কথা বের করার ওদের শতেক রকম কায়দা আছে। সে কায়দার সামনে কত বাঘা বাঘা লোক কাত হয়ে যায়। আর আপনার তো ওই শরীর।
ধরে নিচ্ছি আপনি আমার নাম বলবেন না। কিন্তু আপনার বউ মেয়ে? ওরা তো জানে কাকে দিয়ে আপনি এ সব কুকর্ম করিয়েছেন। তারা যখন দেখবে আপনি ফেঁসে গেছেন কেঁদে কেটে আমার নাম বলে আপনার অপরাধ লাঘব করে দিয়ে আপনাকে বাঁচাতে চাইবে। এটা দোষের কিছু নয়, সব মেয়ে মহিলারা এই করে। যদি আমি ধরা পড়ি আমার মেয়ে বউও তাই করবে।
তখন আমার কি হবে দত্তদা। যদি সুযোগ পাই বউ ছেলে মেয়ের হাত ধরে সাজানো সংসার ফেলে আমাকে পলায়ন করতে হবে। আমার এত বছরের চেষ্টায় গড়ে তোলা ঘর দুয়ার সব ছারখার হয়ে যাবে। তখন আবার সেইনা খেয়ে না দেয়ে গাছতলা ফুটপাত স্টেশনে পড়ে থাকতে হবে। আর যদি পালাবার সুযোগ না পাই, হাড়গোড় ভাঙা দেহ নিয়ে পচে মরতে যেতে হবে জেলখানার কালো কুঠুরিতে। অথবা ঘটে যাবে এর চেয়ে মর্মান্তিক ভয়াবহ বিভৎস সেই ঘটনা। আপনি বা আমি কেউই আর ধরাধামে রইলাম না। কথায় বলে পাবলিকের মার দুনিয়ার বার। যে পাবলিকের পিছনে একটা সুসংগঠিত রাজনৈতিক দল আছে, যে দল শাসন ক্ষমতায় তারা না পারে এমন কোনো কাজ নেই। একথা আপনার চেয়ে বেশি আর কে জানে? শত হলেও চল্লিশ বছর আছেন ওই দলে।
একজন কমুনিস্ট পার্টির কর্মীর দলের প্রতি থাকতে হবে অন্ধআনুগত্য, আদর্শের প্রতি অবিচল আস্থা নেতৃত্বের প্রতি দ্বিধাহীন বিশ্বস্ততা। পার্টির প্রত্যেকটা নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে। পার্টির স্বার্থকে স্থান দিতে হবে ব্যক্তি স্বার্থের ঊর্ধ্বে। এসব কথা বহুবার বহুজনের মুখে শুনেছি। তাহলে আজ কেন আপনি পার্টির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধতা করে গুপ্ত ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে দলের মহিলা শাখার আর্থিক ক্ষতি করতে বদ্ধপরিকর?কি করেছে পার্টি? আপনি একা বহু বছর ধরে যে সর্বসাধারণের পুকুরে মাছ চাষ করতেন সেটা সমিতির মাধ্যমে অনেক ক’জন মহিলাকে মৎস পালনের জন্য দিয়ে দিয়েছে। অনেকগুলো পুকুর আপনার, তার মধ্যে একটা বেদখল হয়ে যাওয়ায় এত বছরের আনুগত্য ভুলে অন্তর্ঘাতে নেমে পড়লেন, এটা ঠিক আদর্শবান কমুনিস্ট পার্টির কর্মীর যথার্থ পরিচয় নয়।
