কতক্ষণ এভাবে এখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম জানি না। হঠাৎ আমার কাঁধে একটা মৃদু টোকা পড়ল। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি ঠিক আমার পিছনে এসে দাঁড়িয়ে পড়েছে রাইফেল হাতে একজন পুলিশ। বহুদিন পালিয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছি এখন আর পালাবার কোন পথ নেই। এবার আর কী! হয় ফাঁসি নয় দীপান্তর। মা বাবা ভাইবোন কারও সাথে দেখা হবে না আর কোনদিন। সেই দুঃখে ভয়ে কেঁদে ফেললাম আমি।
পুলিশ লোকটা আমার কান্নায় বিব্রত হয়ে জিজ্ঞাসা করে কাঁদছিস কেন! কী হয়েছে? তার কথায় আমি আশ্চর্য হই। গোলাপ যেমন জানে না কেমন তার গন্ধ পুলিশ তেমনই জানে না তারা কী জিনিস। যাকে পুলিশে ধরে তার কদবার কোন দরকার পড়ে না। চোখ ফেটে আপনা আপনি জল বের হয়ে আসে। আমি তো বাচ্চা, এখনও সতের পার হইনি এই রকম বিপদের সময় বড়বড় লোকের চোখের জলে বুক ভেসে যাবে।
পুলিশ লোকটা আবার জানতে চায়–এখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন! হারিয়ে গেছিস বুঝি! কঁদিস না, তোর বাড়ি কোথায়? আমরা পাঠিয়ে দেব। চুপ কর।
আমার মনের জোর এবার খানিকটা ফিরে আসে। যে ভাবে লোকটা কথা বলছে, মনে হচ্ছে সে আমাকে ধরে নিয়ে যাবে। পুলিশ হলেও লোকটা ভাল লোক। এমন ভাল মানুষের কাছে মিথ্যা কথা বলতে নেই। ওতে পাপ হয়। যা থাকে ভাগ্যে এর কাছে সত্যি কথাই বলব। কী আর হবে, হয় ধরে নিয়ে যাবে, না হয় যাবে না।
আমি শুনেছি ভারতীয়–বিশেষ করে বাঙালী লেখকদের মধ্যে লেখক কম দার্শনিক গুণ বেশি। যার হাতে কলম, কমবেশি সবাই দার্শনিক। যেহেতু এখন আমার হাতে কলম, নীরস এই গদ্য রচনা থেকে সরে গিয়ে একটু দার্শনিক আলোচনা সেরে নিতে হবে। এখন কথা হচ্ছে, সত্য জিনিসটা কী? সত্য সেটাই যা আমার কাঙ্খিত, অভীষ্ট ফল লাভের সহায়ক। এই জন্য কবি বলে গেছেন–সেই সত্য যা তুমি রচিবে। তবে খেয়াল রাখতে হবে, সতর্ক থাকতে হবে, যেন জনগণ মিথ্যা বলে তাকে দুয়ো না দিতে পারে। পৃথিবীর যত মহান সাহিত্যকৃতি তার কোনটা সত্যি? সবেতেই ঝুড়ি ঝুড়ি মিথ্যার সমাহার। তবে ওই–এমনভাবে পরিবেশন করা হয়েছে যে সত্যের চেয়ে বড় সত্য হয়ে গেছে। কার ঘাড়ে কটা মাথা আছে বলুক দেখি রাম কৃষ্ণ কাল্পনিক চরিত্র। “রামকৃষ্ণ” কোন অবতার ফবতার নয়, আমাদের মতোই মানুষ।
সত্য, একমাত্র সত্য এটাই যে, সত্য কোন অটল বিষয়বস্তু নয়। স্থান ভেদে কাল ভেদে পাত্র ভেদে প্রয়োজন বোধে তার আকার আকৃতি বদলে যায়, সংকোচন সম্প্রসারণ ঘটে। প্রয়োজন বোধে সিরাজউদুল্লা হয়ে যায় মহান দেশপ্রেমিক, প্রয়োজন বোধে নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোসকে বানানো হয় বিশ্বাসঘাতক, দেশদ্রোহী।
এখন আমি বিশেষ প্রয়োজনে সময় উপযোগী একটি সত্যের বিনির্মাণ করি। বাবু গো মোরা যাদবপুরে কলোনিতে থাহি। ছোটবেলায় মোর মায় মইরা গ্যাছে। হেই লইগ্যা মোর বাপে ফির এট্যা বিয়া করছে। হেই মায় মোরে দুই চক্ষে দেখতে পারে না। দুই বেলা ধইরা ধইরা মারে। প্যাট ভইরা খাইতেও দেয় না। হেই কারণে বাড়ি থেইকা চইল্যা আইছি। যেদিক দুই চক্ষু যায় চইল্যা যামু। কোন চা দোকানে হোটেলে কম করমু। বাড়ি আর যামু না।
এক মাতৃহারা দুঃখী বালকের করুণ জীবন কাহিনি শুনে দ্রবীভূত হয়ে পড়ে পুলিশ লোকটার মন। যদিও আমাদের দেশীয় আইনেঅকারণে পথে পথে ঘোরা, ফুটপাতে ঘুমানো একটা অপরাধ, তবুও কর্তব্য কর্মে ত্রুটি ঘটালেন তিনি। আমাকে ধরে জেলগারদে ঠুসে দিতে চাইলেন না। চাইলেন নিয়ে গিয়ে গরম ভাতের সামনে বসিয়ে দিতে।
বললেন, আমাদের মেসে কাজ করবি? তাহলে আমার সাথে চল। খাবি দাবি থাকবি। মাস গেলে কিছু মাইনেও পাবি।
বহুবার মানুষের মুখে শুনেছি, বাঘের ঘরে ঘোগের বাসা। এতদিন কথাটার মানে বুঝতে পারিনি। এবার বুঝলাম। আমি এক ফৌজদারি কেসের ফেরারি আসামি। যে কেস কখনো আপনা আপনি মরে যায় না। উকিল ধরে কোর্টে মামলা লড়ে মেরে ফেলতে হয়। নিয়মমত পার্ক সার্কাস থানায় আমার নামে একটা কেস থাকার কথা। কে জানে এখনও হয়ত পুলিশ সেই কেসের আসামিকে হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে। আর অমি–সেই অপরাধী এখন লুকিয়ে পড়লাম তাদের সবচেয়ে সুরক্ষিত–সব সন্দেহের ঊর্ধ্বের এক ঘাঁটির মধ্যে। শিবপুর পুলিশ লাইনের এক মেসের কর্মী হয়ে।
আমি দেখিনি তবে শুনেছি মানুষের মধ্যে নাকি দেবত্ব থাকে। আমার ধারণা মানুষের দেবতা হবার খুব একটা দরকার নেই, মানুষ হয়ে থাকলেই যথেষ্ট। যদি সেখান থেকে অধোগমন না ঘটে, অমানুষ না হয়। তখন মানুষ পশু থেকেও ইতর প্রাণী হয়ে যায়। পশুরা পায়ুকামী অগম্যাগমন ধর্ষণকারী প্রকৃতি বিরুদ্ধ কোন কাজ করে না। মানুষের সেই অবনমন নীচতা আমি যেন আমার ছোট্ট জীবনে অনেক বেশি দেখে ফেলেছিলাম। যা আমার সারা জীবনকে প্রভাবিত করেছে। মন মস্তিষ্কে ভরে দিয়েছে অবিশ্বাস অশ্রদ্ধার বিষ। কে যেন বলে গেছেন–মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ। আমি জীবনভর সেই মানুষকে খুঁজে বেড়িয়েছি যে আমার বিশ্বাসের মর্যাদা রাখতে সচেষ্ট।
এই পুলিশ লাইনের মেইন গেট থেকে কিছুটা ভিতরে ঢুকলে ডানদিকে একটা বড় মাঠ। এই মাঠে প্যারেড হয়। পনেরই আগস্ট মাঠের এক ধারে ওড়ে ত্রিবর্ণ রঞ্জিত পতাকা। ঠিক মাঠের ওপাশে পুলিশ ব্যারাক। এই ব্যারাকে থাকে এক বছর পঁয়ত্রিশের সেপাই। এমনিতে মানুষের সমাজে যে সব দোষ থাকে যে সব কারণে পুলিশ তাদের ধরে মারে পুলিশরাও তা থেকে মুক্ত নয়। তফাৎ শুধু এই যে, তারা প্রশাসনের পরোক্ষ প্রশ্রয় পেয়ে থাকে। সাধারণ চোর ডাকাত গুণ্ডা বদমাশ তা পায় না। তবে এই পুলিশকর্মীটির একটা বিশেষ দোষ বা অভ্যাস আছে, সেটা হল গঞ্জিকা সেবন।
