বুঝুক। আমি চাই সবাই বুঝুক। বুঝে কী করবে আমার! সে নিয়ে তোর ভাবতে হবে না। তুই শুধু কাজটা কর। পরে যা হবে আমি বুঝে নেব।
অনেকক্ষণ ধরে মনের সব ক্ষোভ উগরে দেন সেই পার্টির বিরুদ্ধে যাদের সঙ্গে উনি বহু বছর আছেন–এখন মহিলা সমিতি মারাচ্ছে–“ওরাও দু টাকা পাক”। কোথায় ছিল এই সব মহিলারা, যখন আমরা লড়াই করে পাটিটাকে ক্ষমতায় এনেছিলাম? গাছ পোতর সময় কাউকে পাওয়া যায়নি। এখন ফল খাওয়ার সময় সব হাজির। কত লোক তো প্রমোটারি, জমির দালালি, কনট্রাকটারি করে লাখ লাখ কামাচ্ছে। পারবে তাদের ভাগ থেকে মহিলা সমিতির জন্য কিছু আদায় করতে? মহিলাদের জন্য কেন এত দরদ বুঝিনা কী আর! সব বুঝি!
‘পরম উপকারি’ দত্তদার কাঁদো-কঁদো মুখ দেখে আর না বলতে পারি না। বিষ মাখানো মাটির পোটলা হাতে তুলে নিই। যে তার ক্ষতি করেছে আমি তার ক্ষতি করে দেব। আর সেটা দেওয়াই উচিত। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন-কৃতঘ্ন হয়ো না। এর চেয়ে বড় পাপ আর কিছু হয় না। আমি কী দত্তদার উপকার ভুলে যাব।
কিন্তু সাইকেল নিয়ে পথে আসতে আসতে মাথায় আসে অন্য এক ভাবনা যাকে অকৃতজ্ঞ বলে। হয়তো লেকটা ওরা জোর করে নেয়নি। নিয়েছে বুঝিয়ে সুঝিয়ে। দত্তদা তুমি তো শত শত পুকুর ঝিল নিয়ে রেখেছ, এই একটা ছেড়ে দাও। গোটা চল্লিশ মেয়ে বাঁচুক। তাই দিয়েছে। এখন এটাকেই গল্প বানাচ্ছে কেড়ে নিয়েছে। অস্ত্র বানাচ্ছে।
কেড়েই নিক বা নিজে ছেড়ে দিক কিছু ক্ষতি তার হয়েছে। তবে আরো বড় ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে আমার দিক থেকে। যে অন্যায় অত্যাচার আমার উপর বধির স্কুলে লোকজন চালাচ্ছে, যদি আমি ক্ষেপে গিয়ে স্কুল বিষয়ে যা জানি সেসব কোনো কাগজে লিখে দিই, সমূহ সর্বনাশ হয়ে যাবে। তখন সবার সব রাগ গিয়ে পড়বে দত্তের উপরে। কারণ সেই আমাকে এখানে ঢুকিয়েছে। কেউ কেউ তো এমনও সন্দেহ করতে পারে আমাকে দিয়ে সেই এসব করিয়েছে। তখন একটা লেক গেছে বাকিগুলোও আর থাকবে না।
তাহলে উপায়?
উপায় এটাই–যা সে এখন করাচ্ছে। আমার এখন মনে পড়ে যায়, রাইখস্ট্যাগের সেই গল্প। আমি যেই বিষের পোটলা নিয়ে রওনা দিয়েছি সেই দত্ত ফোন করে দিয়েছে তার আগেভাগে প্রস্তুত করে রাখা লোকজনকে–সে যাচ্ছে। তার সেই লোকজন লুকিয়ে পজিসন নিয়েছে লেকের চারদিকে। যেই আমি বিষ পোটলা জলে ছুঁড়ে ফেলব, সাথে সাথে ঝাঁপিয়ে পড়ে তারা আমাকে ধরে ফেলবে। আর তারপর গণধোলাই। পুকুরে বিষ দেওয়া একটা অমার্জনীয় অপরাধ। শত শত লোক চান করে এই লেকে। তখন তারা পিটিয়ে পিটিয়ে আমাকে মেরে ফেললেও ফেলতে পারে। কত লোক এভাবে মারা গেছে। জনগণ মহাশক্তিমান-এরা যা করুক, কোনো সাজা হয়। আঠারোজন সন্ন্যাসীকে জনগণ প্রকাশ্য দিবালোকে পুড়িয়ে মেরেছিল, কারো কিছু হয়নি।
একান্তই যদি আমাকে মেরে নাও ফেলে, হাড়গোড় ভেঙে পুলিশে দেবে। তখন আইন অনুসারে স্কুল আমাকে সাসপেন্ড করে দেবে। তারপর কেস লড়ে যদি নির্দোষ প্রমাণ হই তবে পুনঃ বহাল হতে পারব। না পারলে গেল। যে ঘৃণ্য অপরাধে অপরাধী তার কোনো কথাই আর লোকে বিশ্বাস করবে না। এইসব ভাবনা, মাথায় চেপে বসার ফলে আমার সাইকেল আর লেক মুখো হতে পারলনা।এ গলি সে গলি ঘুরে পৌঁছে গেল নিজের বাড়ি ক্ষুদিরাবাদে। প্রায় ঘন্টাখানেক পরে আবার একটা ফোন এল আমার মোবাইলে
কী রে, তুই কোথায়?
বলি–আমি বাড়িতে এসে গেছি।
ওটা ফেলিস নি?
ফেলেছি তো। ইয়ুথ ক্লাবের পিছন থেকে একেবারে মাঝখানে। বুজ বুজ করে ওটা ডুবে গেল দেখে আমি বাড়ি এসেছি। দেখবেন সকালের মধ্যে সব মাছ মরে ভেসে উঠবে
পরের দিন বেলা আটটা নাগাদ আবার ফোন এল ক্রোধ আর কঁচা কাঁচা খিস্তি সহকারে। বলি আমি আমাকে অকারণে গালাগালি দিচ্ছেন। আপনি যে দিব্যি নিতে বলবেন, তাই নিয়ে বলব ওটা আমি ফেলেছি। তবে মাছ যদি না মরে আমি কী করব! আপনি একটু বিষের দোকানে খোঁজ নিয়ে দেখেন–নকল মাল দেয়নি তো!
জবাবে আবার খিস্তি।
কয়েকদিন পরে ২৮.৮.০৭ তারিখে রাত ১০টায় একটা চিঠি লিখি তার নামে। সেটা ফেলে আসি তার ডাক বাক্সে। দত্তদার সাথে সব সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়।
‘শ্রদ্ধেয় দত্তদা,
আপনার সাথে আমার এক সুদীর্ঘ কালের পরিচয়। মত পথের কোন মিল কোনদিনই ছিল। তবু গোঁজামিল দিয়ে সেই ১৯৭১ থেকে এই ২০০৭ পর্যন্ত চালিয়ে আসা গেল। এবার মনে হচ্ছে আমাদের ছাড়াছাড়ি হবার সময় এসে গেছে। এই প্রায় বৃদ্ধ বয়েসে আর নিজের সঙ্গে নিজের প্রতারণা পোষায় না। এখন আপনার এবং আমার নিজের স্বার্থেই আলাদা হয়ে যে যার পথে হেঁটে যাবার সময় এসে গেছে। এতকাল আপনার যে আদর্শবাদী রাজনৈতিক কর্মীর ছবিটা আমি বুকে লালন করতাম তা এক নিমিষে ভেঙে চুরে খান খান হয়ে গেছে। সেদিন আমি আপনার মনের যে কুৎসিত কদাকার রূপটা দেখলাম, তারপর আর আপনাকে সাধারণের চেয়ে অন্য কিছু ভাবতে পারছি না। সেই লোভ সেই ঈর্ষা হিংসা স্বার্থপরতা সেই প্রতিশোধপরায়ণতা, যা কোন মার্কসবাদীর পক্ষে একেবারে বেমানান। এরপর আর আপনার সাথে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে মনের সায় পাচ্ছি না।
আমি একজন লেখক। এটাই আমার একমাত্র পরিচয়। সারা দেশ আমাকে লেখক বলেই চেনে জানে সম্মান দেয়। এই সম্মান আমার বহু শ্রমে ঘামে চোখের জলে বুকের রক্তে অর্জন করা সম্পদ। আমি এই সম্মান নিয়ে বেঁচে আছি এই সম্মান নিয়েই মরতে চাই। এর উপর কোনো কালি পড়ুক আমি তা কখনো চাইতে পারবো না। কিন্তু আপনার কাছে এ সবের কোনো মূল্যই নেই। সেই কবে আমি রিক্সা চালাতাম, মদ খেতাম, মারপিট করতাম আপনার ধারণায় আমি আজো সেই গুণ্ডাই আছি! তাই আমাকে দিয়ে সেই কাজ করাতে চাইছিলেন, যা একটা ঘৃণ্য সামাজিক অপরাধ। ভারতীয় দণ্ডবিধিতে যার শাস্তি জেল এবং জরিমানা দুটোই। আপনি ভুলে গিয়েছিলেন আমার বর্তমান অবস্থা অবস্থান এবং মানসিকতার কথা। সাতখানা উপন্যাস আছে আমার প্রায় একশো গল্প। কম পক্ষে দশবার টিভিতে দেখিয়েছে আমাকে। আনন্দবাজার সহ পাঁচটা প্রথম শ্রেণির পত্রিকায় আমার কথা লেখা হয়েছে। সে সব আপনার মনে কোনো দাগ কাটেনি। আপনি ভুলে গিয়েছিলেন যে রত্নাকর বাল্মিকী হবার সাধনারত, সে আর যাই করুক কোনদিন ফেলে আসা পথের দিকে ফিরবে না। আগাবে সামনেই।
