এরপর আমি আমার কর্মস্থলের অবস্থার কথা জানিয়ে স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির কাছে একখানা চিঠি দিয়ে রাখি। জানি কিছু হবে না, তবুও। কিছু হয়নি।
আমি একখানা মোবাইল কিনেছি। বাড়ি আমার অনেক দূরে–পথও দুর্গম। এক পশলা বৃষ্টি হলে এক হাঁটু কাদা। ওই পথে ট্রাক চলে বলে বড় বড় গর্ত হয়ে যায় বর্ষাকালে। দরকার পড়লে বন্ধুরা যেতে পারে না। স্কুলে এলে সহজে আমাকে ডেকে দেয় না। ফোন করলে বলে সে এখন কাজে আছে। আসতে পারবে না। তাই নিতে হল মোবাইল। সরল বিশ্বাসে স্কুলের সবাইকে নম্বর দিয়ে ছিলাম। তখন বুঝতে পারিনি কী ভুলটা করে ফেললাম। মোবাইলটা যে যম যন্ত্রণার কারণ হয়ে যাবে, কে তা জানত। আসতে আরম্ভ করল প্রায় তিরিশ বত্রিশটা মোবাইল, তিরিশ বত্রিশটা ল্যান্ড ফোন থেকেমিস্, হুমকি, ধমকি, অকথ্য গালাগালি। আমার মাকে পর্যন্ত ধর্ষণের গালাগালি দেওয়া হয়।
আমার তখন খানিকটা নামটাম হয়ে গেছে, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ডেকে নিয়ে যায় লোকে। অনুষ্ঠান চলাকালেও মোবাইলে কাঁচা কাঁচা খিস্তি ছুটে আসে। আমি তাদের অনুরোধ করি এখন রেহাই দাও, মঞ্চে আছি, একটা অনুষ্ঠানে, ওদিক থেকে ভেসে আসে কী বালের অনুষ্ঠান রে গাণ্ডু! একবার এক সম্মেলনে যোগ দিতে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছি, ট্রেনে পা দেবার পর এল একটা ফোন–যাচ্ছিস? যাঃ এটাই তোর শেষ যাত্রা। আমি যাচ্ছি তোর বাড়ি! খুব স্বাভাবিক কারণেই এক ক্ষিপ্ত তিক্ত বিষাক্ত মন নিয়ে পৌঁছেছিলাম দিল্লি। চারদিন ছিলাম ওখানে চারদিনই মনের উপর চেপে বসেছিল এক নিদারুণ ক্রোধ।
ফলে, যখন দিল্লির এক নামি পত্রিকা, কথাদেশ, যার সারা ভারতে পাঠক–তারা আমার সাক্ষাৎকার নিতে এল সিপিএম সম্বন্ধে একটাও ভালো কথা বলতে পারলাম না। সব বিষ উগরে দিলাম পত্রিকার পাতায়। ২০০৮-এর সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, এই দুই সংখ্যায় প্রকাশিত হয় আমার বক্তব্য। এতে আমার ‘রীবাজ’ গল্পের হিন্দি অনুবাদও থাকে।
খোঁজ নিয়ে দেখেছি, এইসব ফোন যে সব মোবাইল থেকে আসে, তারা সব কোন না কোনভাবে এই স্কুলের সাথে যুক্ত। মজার ব্যাপার এতে এমন কিছু মাস্টারও আছে যারা চাকরিতে ঢুকেছে ২০০৮ সালে। যারা অনেকে আমার নামও জানেনা। অথচ তাদের মধ্যে কী অদ্ভুদ বোঝাঁপড়া। সবাই মিলে এক সাথে লড়ছে। এ এক সর্বাত্মক লড়াই। এক মাস্টার বাইক নিয়ে ঘুরে ঘুরে সন্ধ্যা থেকে রাত গভীর পর্যন্ত বুথ থেকে ফোন করে গাল দিতে থাকে।
আমি নালিশ করে কোন লাভ হবে না। তবু একখানা দরখাস্ত লিখি টিচার ইনচার্জের কাছে। অন্তত একটা অভিযোগ তো লিখিত থাক।
.
কথায় বলে বাঘ পঙ্গু হয়ে গেলেও হালুম ভোলে না। দত্তদা কোমর ভেঙে শুয়ে আছে বিছানায়, ডাক্তার কোমরে একটা প্লাস্টার মেরে দিয়েছে, বেশি নড়াচড়া, সিঁড়ি দিয়ে নামা বারণ, বিছানায় শুয়ে শুয়ে সে বুদ্ধি ভাজছে, দাঁতের ফাঁকে ঢুকে পড়া মাছের কাটা কোন কৌশলে তুলে ফেলা যায়।
।একদিন একটা ফোন এল আমার মোবাইলে–একটু আয়, খুব দরকার। তাই যেতে হল তার বাড়ি। আমাকে দেখে দত্ত তার বউকে বললেন-মদনকে এককাপ চা দাও। এক গেলাস ফ্রিজের জলও দিও। যা গরম!
জল-চা খাবার পর বলেন তিনি, বল মদন, আমি তোর উপকার করেছি কিনা? বাংলা ছেড়ে কোথায় কোন্ জঙ্গলে গিয়ে পড়েছিলি। বল ছিলিনা? সেখান থেকে ফিরিয়ে এনেছি। যেমন হোক, একটা চাকরি দিয়েছি। কাজের জায়গায় কিছু সমস্যা আছে। সে আর কোথায় না থাকে। তবে মোটামুটি তো ভালোই আছিস। আর কিছু না হোক একটা বাড়ি করেছিস। এখন যদি রিক্সাও চালিয়ে খাস, আগের চেয়ে ভালোই থাকবি। বল থাকবি না? যদি তুই মনে করিস এই সব কিছু আমার জন্য হয়েছে, তাহলে তোকে আমার জন্য একটা কাজ করতে হবে। কিছু না। কিছুনা, এমন কিছু কঠিন কাজ না তোর পক্ষে। আমি জানি তুই এটা পারবি। জীবনে কত সাহসের কাজ করেছিস, আর সামান্য এইটা পারবি না। বল করবি?
কী কাজ?
যে খাটে তিনি শোয় হাত বাড়িয়ে তার স্কুল থেকে একটা পোটলা বের করলেন। এখন দুপুর। পথঘাট একেবারে ফাঁকা। সাইকেল চালিয়ে সন্তোষপুর লেকের সামনে দিয়ে যাবি। যেতে যেতে ছুঁড়ে এটা লোকের জালে ফেলে দিবি। ব্যাস এইটুকু।
কী আছে এতে?
দত্ত দেওয়ালে ঠেক দিয়ে একটু সোজা হলেন–দেখ মদন, তুই তো জানিস, আমি কোনো চাকরি বাকরি করি না, এই একটু কটা পুকুরে মাছ চাষ করি। এতেই আমার পেট চলে। এখন সেই পেটের উপর লাথি মেরে দিয়েছে রে।
কে!
আবার কে! যাদের জন্য সারা জীবনটা বরবাদ করে দিয়েছি সেই পার্টি। এখন বুঝতে পারছি, তুই যা বলতি–ঠিকই বলতি। একেবারে দয়ামায়াহীন জহ্রদ। জানিস, ওই লেকটায় আমি সেই সাতাত্তর সাল থেকে মাছ চাষ করি। এবারও আশি হাজার টাকার মাছ ছেড়েছি। সেই লেকটা ওরা কেড়ে নিয়ে মহিলা সমিতিকে দিয়ে দিয়েছে। একবার আমার কথা ভাবল না। এখন লেকের পাড় দিয়ে গেলে আমার কান্না পায়। আমার লেক আমার টাকা আমার মাছ, খাবে ওরা। এ কী সহ্য হয়। বল সহ্য হয়?
একটু থেমে আবার বলেন দত্ত–সব মাছ মেরে দেব। আমার কোমর না ভেঙে গেলে তোকে বলতাম না। তুই আমার এই উপকারটা কর।
বলি–আমি লেকে বিষ দিই, কিংবা অন্য কেউ, দোষ তো আপনার উপরই আসবে। সবাই তো বুঝে যাবে যে আপনার কাজ এটা।ওরা লেক নিয়ে নিয়েছে বলে আপনি মাছ মেরে দিয়েছেন।
